এ-সত্যটি উজ্জ্বলভাবে স্পষ্ট সে-এলাকায়, যেখানে নারী সবচেয়ে সফল হয়েছে নিজেদের দৃঢ়ভাবে জ্ঞাপন করতে–অর্থাৎ, সংস্কৃতির এলাকায়। তাদের ভাগ্য গভীরভাবে জড়িয়ে আছে সাহিত্য ও শিল্পকলার ভাগ্যের সাথে; প্রাচীন জর্মনদের মধ্যে দৈবজ্ঞা ও যাজিকার ভূমিকা ছিলো একান্তভাবে নারীর যোগ্য কাজ। ইতালীয় রেনেসাঁসের কালে বিকশিত হয়েছিলো যে-প্রণয়মূলক অতীন্দ্রিয়তাবাদ, মানবতাবাদী ঔৎসুক্য, সৌন্দর্যম্পৃহা, সতেরো শতকের পরিমার্জিতি, আঠারো শতকের প্রগতিশীল আদর্শবাদ–সবগুলোই বিভিন্ন রূপে নারীত্বকে করেছে পরমায়িত। এভাবে নারী হয়ে ওঠে কবিতার ধ্রুবতারা, শিল্পকলার বিষয়বস্তু; অবসর তাকে সুযোগ দেয় চেতনার আনন্দের কাছে আত্মোৎসর্গ করতে; লেখকের প্রেরণা, সমালোচক, ও পাঠকগোষ্ঠি, সে হয়ে ওঠে তার প্রতিপক্ষ; নারীই মাঝেমাঝে সংবেদনশীলতার কোনো একটি রীতিকে প্রধান করে তোলে, তৈরি করে এমন নীতি, যা তৃপ্ত করে পুরুষচিত্তকে, এবং এভাবে সে হস্তক্ষেপ করে নিজের নিয়তির ওপর নারীর শিক্ষা ছিলো বৃহদংশে নারীর এক বিজয়। তবে বুদ্ধিজীবী নারীদের যৌথ ভূমিকা যতোই গুরুত্বপূর্ণ হোক-না-কেনো, তাদের ব্যক্তিগত অবদান সাধারণভাবে হয়েছে কম মূল্যবান। যে কিছু সৃষ্টি করতে চায় নতুনভাবে, তার জন্যে বিশ্বের প্রান্তদেশে বাস করাটা অনুকূল অবস্থান নয়: এখানে আবার, বিদ্যমান অবস্থা থেকে উঠে আসার জন্যে, প্রথম দরকার অবস্থার মাঝে গভীরভাবে মূল প্রোথিত করা। যাদের সম্মিলিতভাবে রাখা হয়েছে নিকৃষ্ট পরিস্থিতিতে সে-মানব গোষ্ঠির মধ্যে থেকে ব্যক্তিগত সাফল্য অর্জন প্রায় অসম্ভব। মারি বাশকির্তসেভ জানতে চেয়েছিলেন, ‘একজন কোথায় যেতে পারে, স্কার্ট পরে?’ স্তেদাল বলেছিলেন : ‘সব প্রতিভা, যারা জন্মেছেন নারী হয়ে, নষ্ট হয়েছেন জনগণের কল্যাণে’। সত্য বলতে কী, কেউ প্রতিভা হয়ে জন্মায় না : প্রতিভা হয়ে ওঠে; আজ পর্যন্ত নারীর পরিস্থিতি এই হয়ে ওঠাকে করে রেখেছে বাস্তবিকভাবে অসম্ভব।
নারীর ইতিহাস থেকে নারীমুক্তিবিরোধীরা বের করেন করেন দুটি পরস্পরবিরোধী যুক্তি : (১) নারী কখনো মহৎ কিছু সৃষ্টি করে নি; এবং (২) নারীর পরিস্থিতি মহৎ নারী ব্যক্তিত্বের বিকাশে কখনো বাধা দেয় নি। এ-মন্তব্য দুটিতে রয়েছে প্রতারণা; সুবিধাপ্রাপ্ত গুটিকয়েকের সাফল্য সম্মিলিত মানের নিম্নায়নের সাথে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করে না বা তাকে অব্যাহতি দেয় না; এবং এ-সাফল্য যে এতো দুর্লভ ও সীমাবদ্ধ, তা-ই নির্ভুলভাবে প্রমাণ করে যে পরিস্থিতি ছিলো তাদের প্রতিকূলে। ক্রিস্তিন দ্য পিসা, পোলি দ্য লা বার, কদরসে, জন স্টুয়ার্ট মিল,-এবং স্তেদাল যেমন মনে করেছেন, নারী সুযোগ পায় নি কোনোএলাকায়ই। এ-কারণেই আজকাল অসংখ্য নারী দাবি করে নতুন মর্যাদা; এবারও তারা দাবি করে না যে তাদের গৌরব দিতে হবে নারীত্বের জন্যে; তারা চায় তাদের মধ্যে, যেমন সমগ্র মানবমণ্ডলিতে, সীমাবদ্ধতার ওপর আধিপত্য করবে সীমাতিক্ৰমণতা; তারা চায় অবশেষে তাদের দিতে হবে বিমূর্ত অধিকার ও সম্ভবপরতা, যা একযোগে না মিললে মুক্তি হয়ে ওঠে একটা পরিহাস।
এ-বাসনা পূর্ণ হওয়ার পথে। কিন্তু যে-সময়ে আছি আমরা, সেটা এক ক্রান্তিকাল; এ-বিশ্ব, যা সব সময়ই ছিলো পুরুষের অধিকারে, আজো আছে তাদেরই অধিকারে; আজো টিকে আছে পিতৃতান্ত্রিক সভ্যতার সংস্থা ও মূল্যবোধগুলোর বড়ো অংশ। সবখানে নারীকে সবগুলো বিমূর্ত অধিকার সম্পূর্ণরূপে দেয়া হয় নি : সুইজারল্যান্ডে এখনো তারা ভোট দিতে পারে না; ফ্রান্সে ১৯৪২-এর আইন আজো শীর্ণরূপে রক্ষা করে স্বামীর সুযোগসুবিধা। বিমূর্ত অধিকার, আমি একটু আগেই বলেছি, কখনোই নারীকে পৃথিবীর ওপর নিশ্চিত অধিকার দিতে সমর্থ হয় নি : আজো দু-লিঙ্গের মধ্যে সত্যিকার সাম্য বিরাজ করে না।
প্রথমত, বিয়ের বোঝার ভার পুরুষের থেকে নারীর ওপর অনেক বেশি। আমরা লক্ষ্য করেছি যে স্বীকৃত বা গুপ্ত জন্মনিয়ন্ত্রণের ফলে মাতৃত্বের কাছে দাসত্ব কমেছে; তবে এটা সর্বত্র ছড়ায় নি। গর্ভপাত যেহেতু সরকারিভাবে নিষিদ্ধ, তাই অনেক নারী তত্ত্বাবধানহীন গর্ভপাত করে নেয় স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বা বিধ্বস্ত হয় অসংখ্য গর্ভধারণে। গৃহকর্মের মতো সন্তান লালনপালনের কাজও প্রায় সবটাই করে নারী। বিশেষ করে ফ্রান্সে নারীমুক্তিবিরোধী ঐতিহ্য আজো এতো নাছোড়বান্দা যে পুরুষেরা আজো মনে করে নারীর কাজে সাহায্য করে তারা নিজেদের নিচে নামিয়ে দিচ্ছে। এর ফল হচ্ছে পারিবারিক জীবনের সাথে কর্মজীবনের সামঞ্জস্য স্থাপন পুরুষের থেকে নারীর পক্ষে অনেক কঠিন। সমাজ যখন দাবি করে এ-প্রয়াস, তখন নারীর জীবন হয়ে ওঠে তার স্বামীর জীবনের থেকে অনেক কষ্টকর।
যে-সত্য নারীর বাস্তবিক অবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে, তা হচ্ছে অস্পষ্ট রূপরেখা নিয়ে দেখা দিচ্ছে যে-নতুন সভ্যতা, তার ভেতরে একগুঁয়েভাবে অতিশয় পুরোনো ঐতিহ্যের টিকে থাকা। এটাই সে-জিনিশ, যাকে ভুল বোঝে চটজলদি দর্শকেরা, যারা মনে করে নারীকে এখন দেয়া হচ্ছে যে-সব সম্ভাবনা, নারী তার উপযুক্ত নয়, অথবা আবার তারা, যারা এসব সম্ভাবনার মধ্যে দেখতে পায় শুধু ভয়ঙ্কর প্রলোভন। সত্য হচ্ছে নারীর পরিস্থিতি হয়ে পড়েছে ভারসাম্যহীন, এবং এ-কারণে তার সাথে খাপ খাওয়ানো নারীর পক্ষে খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে। আমরা নারীর জন্যে উন্মুক্ত করে দিয়েছি কলকারখানা, কর্মস্থল, অনুষদ, কিন্তু আমরা আজো বিশ্বাস করে চলছি যে বিয়েই নারীর জন্যে সবচেয়ে সম্মানজনক পেশা। যেমন আদিম সভ্যতাগুলোতে, আনন্দে নারী যে-সব কাজ করে, সে-কাজগুলোর জন্যে কমবেশি প্রত্যক্ষভাবে পারিশ্রমিক পাওয়ার অধিকার তার আছে। শুধু সোভিয়েত ইউনিয়ন ছাড়া, অন্তত রাষ্ট্রীয় ভাবাদর্শ অনুসারে, সবখানেই আধুনিক নারীকে অনুমতি দেয়া হয় তার দেহকে শোষণের পুঁজি হিশেবে গণ্য করতে। বেশ্যাবৃত্তি সহ্য করা হয়, বীরপুঙ্গবতাকে উৎসাহিত করা হয়। এবং বিবাহিত নারীকে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে এটা দেখতে যে স্বামী তার ভরণপোষণ করছে কি না; এর সাথে তাকে দেয়া হয়েছে অবিবাহিত নারীর থেকে বেশি সামাজিক মর্যাদা। লোকাচার অবিবাহিত পুরুষকে কামচরিতার্থ করতে যতোটা সম্মতি দেয় তার সামান্য দেয় না অবিবাহিত নারীকে; বিশেষভাবে তার জন্যে মাতৃত্ব বাস্তবিকভাবে নিষিদ্ধ অবিবাহিত মাতা থাকে এক কেলেঙ্কারির বস্তুরূপে। কীভাবে সিন্ডেরেলার কিংবদন্তি হারাবে তার সব বৈধতা? আজো সব কিছুই তরুণীকে কঠিন ও অনিশ্চিত বিজয়ের চেষ্টার থেকে উৎসাহিত করে কোনো সুদর্শন রাজকুমারের কাছে থেকে সৌভাগ্য ও সুখ লাভ করতে। বিশেষ করে সে আশা করতে পারে ওই রাজকুমারের বদৌলতে সে উন্নতি লাভ করবে নিজের বর্ণের থেকে উচ্চবর্ণে, সারাজীবনের শ্রম দিয়েও সে কিনতে পারবে না যে-অলৌকিক ব্যাপারকে। তবে এ-আশা এক চরম অশুভ, কেননা এটা খণ্ডিত করে তার শক্তি ও তার স্বার্থকে, এ-বিভাজনই সম্ভবত নারীর প্রধানতম প্রতিবন্ধকতা। পিতামাতারা আজো কন্যাদের তাদের বিকাশের জন্যে বড়ো না করে বড়ো করে বিয়ের জন্যে; তারা এর মাঝে এতো বেশি সুবিধা দেখতে পায় যে তারা নিজেরাই এটা চাইতে থাকে; এর ফল হচ্ছে তারা সাধারণত হয় কম প্রশিক্ষিত, ভাইদের থেকে তাদের ভিত্তি হয় কম দৃঢ়, তারা তাদের পেশায় মন দেয় অনেক কম। এভাবে তারা নিজেদের নষ্ট করে, থেকে যায় নিম্ন স্তরে, হয় নিকৃষ্ট; এবং গড়ে ওঠে দুষ্টচক্র : পেশাগত নিকৃষ্টতা তাদের ভেতরে বাড়িয়ে তোলে একটি স্বামী লাভের আকাঙ্খা।
