যে-শ্ৰেণীগুলোর মধ্যে নারী কিছুটা আর্থিক স্বাধীনতা ভোগ করেছে এবং অংশ নিয়েছে উৎপাদনে, সেগুলো ছিলো শোষিত শ্রেণী, এবং নারীশ্রমিক বেশি দাসত্বে বন্দী হয়েছিলো পুরুষ শ্রমিকদের থেকে। শাসক শ্রেণীগুলোর মধ্যে নারী ছিলো পরগাছা এবং এজন্যে অধীনে ছিলো পুরুষের বিধিবিধানের। উভয় ক্ষেত্রেই নারীর পক্ষে কোনো কর্মোদ্যোগ গ্রহণ ছিলো বাস্তবিকভাবে অসম্ভব। আইন আর লোকাচার অনেক সময় সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিলো না, এবং এ-দুয়ের মধ্যে এমনভাবে স্থাপিত হতো ভারসাম্য যে নারী কখনোই বস্তুগতভাবে মুক্ত থাকতো না। প্রাচীন রোমান প্রজাতন্ত্রে আর্থিক অবস্থা মাতৃদের দিয়েছিলো বস্তুগত ক্ষমতা, কিন্তু তাদের কোনো আইনগত স্বাধীনতা ছিলো না। কৃষিসভ্যতায় ও নিম্ন ব্যবসায়ী মধ্যবিত্ত শ্রেণীতেও নারীর অবস্থা ছিলো অনেক সময় একই রকম : গৃহিণী, গৃহের দাসী, কিন্তু সামাজিকভাবে অপ্রাপ্তবয়স্ক।বিপরীতভাবে, সামাজিক বিপর্যয়ের পর্বগুলোতে নারী পেয়েছে মুক্তি, কিন্তু পুরুষের অনুগত দাসী না হওয়ায় সে হারিয়েছে তার ফিফ; সে পেয়েছে শুধু এক নেতিবাচক স্বাধীনতা, যা প্রকাশ পেয়েছে স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষতিকর আমোদপ্রমোদে। একটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে সমাজে বিবাহিত নারীর একটি স্থান ছিলো, কিন্তু তার কোনো অধিকার ছিলো না; কিন্তু অবিবাহিত নারীর, সতী হোক বা বেশ্যা হোক, ছিলোপুরুষের মতো সব আইনগত অধিকার, তবে এ-শতাব্দী পর্যন্ত তারা ছিলো সামাজিক জীবন থেকে বর্জিত।
আইনগত অধিকার ও সামাজিক প্রথার এ-বিরোধ থেকে, আরো অনেক কিছুর সাথে, দেখা দিয়েছে এ-অসঙ্গতিটি : অবাধ যৌনপ্রেম আইনে নিষিদ্ধ নয়, কিন্তু ব্যভিচার অপরাধ; কিন্তু যে-তরুণী ‘ভুল পথ’-এ গেছে,তাকে অনেক সময়ই নিন্দিত করা হয়, কিন্তু স্ত্রীর অসদাচরণকে দেয়া হয় প্রশ্রয়; এবং এজন্যে সতেরো শতক থেকে আমাদের কাল পর্যন্ত অনেক তরুণী বিইয়ে করেছে শুধু অবাধে প্রেমিক নেয়ার জন্যে। যে-সব নারী পুরুষের সমতুল্য সাফল্য অর্জন করেছেন, তাঁরা উন্নীত হয়েছেন সব ধরনের লৈঙ্গিক বৈষম্যের উর্ধে অবস্থিত সামাজিক সংস্থাগুলোর শক্তি দিয়ে। রাণী ইসাবেলা, রাণী এলিজাবেথ, মহান ক্যাথেরিন পুরুষও ছিলেন না নারীও ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন সার্বভৌম শাসক। ধর্মও ঘটায় একই ধরনের রূপান্তর : সিয়েনার ক্যাথেরিন, সেইন্ট তেরেসা তাঁদের শারীরবৃত্তিক বিবেচনা পেরিয়ে ছিলেন সন্ত আত্মা।
বোঝা যায় অন্য নারীরা যে বিশ্বে গভীর ছাপ ফেলতে পারে না, তার কারণ তারা তাদের পরিস্থিতির সাথে শক্তভাবে বাঁধা। তারা নঞর্থক ও পরোক্ষভাবে ছাড়া কোনো কিছুতেই হাত দিতে পরে না। জুডিথ, শার্লট কর্দি, ফেরা জাসুলিস ছিলেন আততায়ী; ফ্রদোসরা ছিলেন ষড়যন্ত্রকারী; বিপ্লবের সময়, কমিউনের কালে নারীরা পুরুষের সাথে লড়াই করেছে প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। অধিকারহীন, ক্ষমতাহীন মুক্তির বিরুদ্ধে প্রত্যাখ্যানে ও বিপ্লবে অংশ নিতে দেয়া হয়েছে নারীদের, কিন্তু নিষিদ্ধ করা হয়েছে সদর্থক গঠনমূলক কাজে; বেশি হলে পরোক্ষ পথে তারা পুরুষের কাজে অংশ নিয়ে সফল হতে পেরেছে। আম্পাসিয়া, মাদাম দ্য মতেনো, রাজকন্যা দেস উরসি ছিলেন উপদেষ্টা, যাদের কথা গুরুত্বের সাথে শোনা হতো। তবে যদি এমন কেউ থাকতো, যে তাদের কথা শুনতে চাইতো। নারীরা যুদ্ধ বাধানোর উশকানি দিতে পেরেছে, যুদ্ধের কৌশল প্রস্তাব করতে পারে নি; তারা তখনই নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে রাজনীতি যখন রাজনীতি নেমে গেছে যড়যন্ত্রের স্তরে; বিশ্বের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ কখনোই নারীর হাতে আসে নি; তারা কৌশল বা অর্থব্যবস্থার ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারে নি, তারা রাষ্ট্র ভাঙে নি গড়ে নি, তারা নতুন বিশ্ব আবিষ্কার করে নি। তাদের মধ্য দিয়ে ঘটেছে কিছু ঘটনার সূত্রপাত, তবে তাতে নারীরা ছিলো অজুহাত, সংঘটক নয়। লুক্ৰেতিয়ার আত্মহত্যার ছিলো শুধু প্রতীকী মূল্য। শহিদত্ব খোলা শোষিতের জন্যে; খ্রিস্টানদের পীড়নের কালে, সামাজিক বা জাতীয় পরাজয়ের প্রভাতে, নারীরা সাক্ষ্য দেয়ার এ-কাজটি করেছে; কিন্তু কখনোই কোনো শহিদ বিশ্বের মুখমণ্ডল বদলে দেয় নি। এমনকি নারী যখন কিছু শুরু করেছে এবং প্রদর্শন করেছে বিক্ষোভ, এসব কার্যক্রম তখনই গুরুত্ব লাভ করেছে যখন কোনো পুরুষের সিদ্ধান্ত তা সম্প্রসারিত করেছে। হ্যারিয়েট বিশার স্টোকে ঘিরে সমবেত নারীরা দাসপ্রথার বিরুদ্ধে সৃষ্টি করেছে তীব্র জনমত; তবে বিচ্ছিন্নতাবাদী যুদ্ধের সত্যিকার কারণগুলো ভাবালুতাধর্মী ছিলো না। ১৯১৭ অব্দের ৮ মার্চের ‘নারীদিবস’ হয়তো রুশবিপ্লবকে ত্বরান্বিত করেছে। তবে ওটা ছিলো একটি সংকেত মাত্র।
অধিকাংশ নারী বীরাঙ্গনারাই অস্বাভাবিক : সাহসিকারা ও আদিতমারা যতোটা উল্লেখযোগ্য তাদের কাজের গুরুত্বের জন্যে, তার চেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য তাদের নিয়তির অনন্যতার জন্যে। তাই আমরা যদি জোয়ান অফ আর্ক, মাদাম রোলা, ফ্লোরা লিস্তানকে তুলনা করি রিশলো, দাঁতো, লেনিনের সাথে, দেখতে পাই যে তাঁদের মহত্ত্ব প্রধানত আত্মগত : তারা ঐতিহাসিক সংঘটক নন, তার দৃষ্টান্তমূলক মানবমূর্তি। মহাপুরুষ উঠে আসেন জনগণ থেকে এবং পরিস্থিতি তাকে চালিয়ে নেয় সামনের দিকে; নারী জনমণ্ডলি থাকে ইতিহাসের প্রান্তদেশে এবং পরিস্থিতি প্রতিটি নারীর জন্যে প্রতিবন্ধক, স্প্রিংবোর্ড নয়। বিশ্বের মুখমণ্ডল বদলানোর জন্যে প্রথম দরকার সেখানে দৃঢ়ভাবে নোঙর পাতা; কিন্তু যে-নারীদের শেকড় সমাজে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত, তারা সমাজের অধীনস্থ; কোনো ঐশী শক্তি দিয়ে কর্মে প্রবর্তিত না হলে সেখানেই তারা নিজেদের দেখাতে পেরেছেন পুরুষের সমান বলে–উচ্চাভিলাষী নারী ও বীরাঙ্গনা হয়ে ওঠে অদ্ভুত দানব। যখন থেকে নারীরা পৃথিবীতে স্বস্তি বোধ করতে শুরু করেছে, তখন থেকেই শুধু আমরা দেখত পাচ্ছি রোজা লুক্সেমবার্গ, মাদাম কুরির মতো নারীর আবির্ভাব। তাঁরা দীপ্তভাবে দেখিয়েছেন যে নারীর নিকৃষ্টতা নারীকে ঐতিহাসিকভাবে তুচ্ছ করে তোলে নি বরং তাদের ঐতিহাসিক তুচ্ছতাই তাদের করেছে নিকৃষ্ট।
