তারপর অগ্রগতি ঘটে খুব ধীরে; তবে আর্থিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নারীরা ইউরোপের নারীদের থেকে অনেক বেশি সাফল্য লাভ করে। ১৯২০-এ নারীর ভোটাধিকার দেশের আইনে পরিণত হয়।
লাতিন দেশগুলো, প্রাচ্যদেশগুলোর মতো, আইন দিয়ে যতোটা অধীনে রাখে। নারীদের তারচেয়ে বেশি রাখে প্রথার কঠোরতা দিয়ে। ইতালিতে ফ্যাশিবাদ যথারীতি বাধা দিয়েছে নারীবাদের অগ্রগতিতে। গির্জার সাথে মৈত্রি চেয়ে, পরিবারকে যেমন ছিলো তেমন রেখে, নারীদাসত্বের ধারা বজায় রেখে ফ্যাশিবাদী ইতালি নারীকে বন্দী করে দ্বিগুণ দাসত্বে : শাসক কর্তৃপক্ষের কাছে এবং তার স্বামীর কাছে। জর্মনিতে ঘটনাক্রম ছিলো খুবই ভিন্ন। হিপেল নামক এক ছাত্র ১৭৯০-এ জোরে ছুঁড়ে দিয়েছিলো প্রথম নারীবাদী ইশতেহার, এবং উনিশ শতকের শুরুতে বিকশিত হতে থাকে এক ধরনের ভাবালুতাপূর্ণ নারীবাদ, যা স্বভাবে ছিলো জর্জ সার নারীবাদের সগোত্র। ১৮৪৮-এ প্রথম জন নারীবাদী নারী লুইজা ওটো জাতীয়বাদের চরিত্র সংস্কারে নারীর অংশগ্রহণের অধিকার দাবি করেন এবং ১৮৬৫তে স্থাপন করেন নারীসংঘ। জর্মন সমাজতন্ত্রবাদীরা অনুকূলে ছিলো নারীবাদের, এবং ১৮৯২-এ দলের নেতাদের মধ্যে ছিলেন ক্লারা জেটকিন। নারীরা ১৯১৪তে যুদ্ধে অংশ নেয়; এবং জর্মনির পরাজয়ের পর নারীরা পায় ভোটাধিকার এবং সক্রিয়হয় রাজনীতিতে। রোজা লুক্সেমবার্গ স্পার্টাকাস সংঘে লড়াই করেন এবং আততায়িত হন ১৯১৯-এ। অধিকাংশ জর্মন নারী সমর্থন করে শৃঙ্খলার দলকে; অনেকে রাইসস্টাগেও আসন গ্রহণ করেন। এ-মুক্তনারীদের ওপর হিটলার নতুনভাবে চাপিয়ে দেয় নেপলিয়নি আদর্শ : কাইস, কির্স, কিন্টার–রান্নাঘর, গির্জা, শিশু। এবং সে ঘোষণা করে যে ‘নারীর উপস্থিতি রাইসস্টাগকে অপমানিত করবে’। নাটশিবাদ ছিলো ক্যাথলিকবিরোধী ও বুর্জোয়াবিরোধী, তাই এটা মাতৃত্বকে দেয় এক সুবিধাপ্রাপ্ত স্থান, অবিবাহিত মাদের ও অবৈধ সন্তানদের বিশেষ নিরাপত্তা দিয়ে এটা নারীকে বিয়ের বন্ধন থেকে অনেকটা বের করে আনে। স্পার্টায় যেমন, এখানে নারী কোনো বিশেষ পুরুষের ওপর নির্ভরশীল না থেকে নির্ভরশীল ছিলো রাষ্ট্রের ওপর; এটা তাকে পুঁজিবাদী সমাজের মধ্যবিত্ত নারীর থেকে বেশি স্বাধীনতা দিয়েছিলো।
সোভিয়েত রাশিয়ায় নারীবাদী আন্দোলন লাভ করেছে ব্যাপকতম অগ্রগতি। উনিশ শতকের শেষভাগে এটা দেখা দেয় শিক্ষার্থী বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে, এমনকি তখনই তারা জড়িত ছিলো হিংস্র বিপ্লবাত্মক কর্মকাণ্ডের সাথে। রুশ-জাপান যুদ্ধের সময় অনেক কাজে নারীরা দখল করে পুরুষের স্থান এবং সাম্যের জন্যে সংঘবদ্ধ দাবি জানায়। ১৯০৫-এর পর তারা অংশ নেয় রাজনীতিক ধর্মঘটে, সৃষ্টি করে অবরোধ; এবং বিপ্লবের কিছু দিন আগে ১৯১৭তে তারা পিটার্সবার্গে প্রদর্শন করে এক গণবিক্ষোভ, দাবি করে রুটি, শান্তি, ও তাদের পুরুষদের প্রত্যাবর্তন। অক্টোবর অভ্যুত্থানে এবং পরে, আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে, তারা পালন করে এক বড় ভূমিকা। মার্ক্সীয় ধারার প্রতি বিশ্বস্ত থেকে লেনিন শ্রমিকের মুক্তির সাথে যুক্ত করেন নারীর মুক্তিকে; তিনি তাদের দেন রাজনীতিক ও আর্থনীতিক সাম্য।
নারীর মর্যাদা বিষয়ক জাতিসংঘ কমিশন সম্প্রতি এক বৈঠকে সব দেশে দু-লিঙ্গের সাম্যকে স্বীকৃতি দেয়ার দাবি জানিয়েছে, এবং এটি এ-আইনি ধারাকে বাস্তব রূপ দেয়ার জন্যে গ্রহণ করেছে কয়েকটি প্রস্তাব। তাই মনে হতে পারে যে খেলায় জিৎ হয়ে গেছে। ভবিষ্যৎ আরো গভীর গভীরতরভাবে নারীদের অঙ্গীভূত করবে আমাদের একদা পুংলৈঙ্গিক সমাজে।
এ-ইতিহাসের দিকে সাধারণভাবে তাকালে আমরা দেখতে পাই এর থেকে বেরিয়ে আসছে কয়েকটি সিদ্ধান্ত। সবার আগে আছে এটি : নারীর সম্পূর্ণ ইতিহাস পুরুষের তৈরি। ঠিক যেমন আমেরিকায়কোনো নিগ্রো সমস্যা নেই, বরং আছে এক শাদা সমস্যা; ঠিক যেমন ‘ইহুদিবিদ্বেষ ইহুদির সমস্যা নয়; এটা আমাদের সমস্যা’; ঠিক তেমনি নারী সমস্যা সব সময়ই ছিলো একটি পুরুষের সমস্যা। আমরা দেখেছি শুরু থেকেই কেননা পুরুষের শারীরিক শক্তির সাথে ছিলো নৈতিক শক্তি; তারা সৃষ্টি করেছে মূল্যবোধ, লোকাচার, ধর্ম; ওই সাম্রাজ্য নিয়ে নারী কখনো পুরুষের সাথে বিবাদ করে নি। কয়েকজন বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি–সাফো, ক্রিস্তিন দ্য পিসা, মেরি ওলস্টোনক্রাফট, অলিপ দ্য গজে–তাদের নিয়তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন, এবং কখনো কখনো গণবিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়েছে; তবে রোমান মাতৃরা সফল হয় নি ওপ্পিয়ান আইনের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হয়ে, অ্যাংলো-স্যাক্সন ভোটাধিকার দাবিকারীরাও চাপ দিয়ে সফল হয় নি, যতোদিন না পুরুষকে বাধ্য করা হয়েছে নতি স্বীকারে। পুরুষ সব সময়ই নিজ হাতে ধরে রেখেছে নারীর ভাগ্য; এবং এটা কী হওয়া উচিত তা ঠিক করেছে পুরুষ, তবে তা নারীর স্বার্থে করে নি, করেছে নিজেদের পরিকল্পনা, ভীতি, ও প্রয়োজন অনুসারে। যখন তারা দেবী মহামাতাকে ভক্তি করেছে, তারা তা করেছে প্রকৃতিকে ভয় করেছে বলে; যখন ব্রোঞ্জের হাতিয়ার আবিষ্কারের ফলে তারা দৃপ্তভাবে প্রকৃতির মুখোমুখি দাঁড়ায়, তারা প্রতিষ্ঠা করে পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা; তারপর পরিবার ও রাষ্ট্রের বিরোধ স্থির করে দেয়নারীর মর্যাদা; খ্রিস্টানের ঈশ্বর, বিশ্ব, ও নিজ দেহের প্রতি তার মনোভাব প্রতিফলিত হয় নারীর পরিস্থিতিতে, যা সে নির্ধারিত করে নারীর জন্যে; মধ্যযুগে যাকে বলা হতো ‘নারী নিয়ে ঝগড়া’, সেটা ছিলোযাজকশ্রেণী ও সাধারণ পুরুষের মধ্যে বিবাহ ও কৌমার্য নিয়ে ঝগড়া : সম্পত্তির ব্যক্তিমালিকানা অনুসারে যে-সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়, তা বিবাহিত নারীর জন্যে নিয়োগ করে অভিভাবক, এবং আজ পুরুষের অর্জিত প্রযুক্তিগত বিবর্তন মুক্ত করেছে নারীকে। পুরুষের নীতিবোধের রূপান্তরের ফলেই জন্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পরিবারের আকার কমানো সম্ভব হয়েছে, এবং নারী আংশিক মুক্ত হয়েছে মাতৃত্বের দাসত্ব থেকে। নারীবাদ কখনই কোনো স্বায়ত্তশাসিত আন্দোলন ছিলো না : অংশত এটা ছিলো রাজনীতিবিদদের হাতের এক হাতিয়ার, অংশত ছিলো একটি অন্তপ্রপঞ্চ, যা প্রতিফলিত করে গভীর সামাজিক নাটককে। নারী কখনো কোনো পৃথক জাত সৃষ্টি করে নি, সত্য কথা বলতে কী লিঙ্গ অনুসারে তারা ঐতিহাসিক ভূমিকা পালনের কথাও ভাবে নি। অধিকাংশ নারী কোনো কর্মোদ্যোগ গ্রহণের বদলে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়েছে নিজেদের; আরা যারা এটা বদলে দিতে চেয়েছেন, তাঁরা নিজেদের বিশেষ অদ্ভুত অবস্থার মধ্যে বন্দী থেকে একে জয়ী করতে চান নি, বরং এর থেকে ওপরে উঠতে চেয়েছেন। যখন তারা বিশ্বের কর্মকাণ্ডে ঢুকেছেন, তারা তা করেছেন পুরুষের সাথে খাপ খাইয়ে, পুরুষের প্রেক্ষাপটে।
