এ-প্রক্রিয়াটি বিশেষভাবে লক্ষণীয় আমেরিকায়, যেখানে জয়ী হয়েছে আধুনিক পুঁজিবাদ : বিবাহবিচ্ছেদ বাড়তে থাকে এবং স্বামীস্ত্রীরা সাময়িক সহচরের বেশি কিছু থাকে না। ফ্রান্সে এ-বিবর্তন শ্লথগতিতে ঘটতে বাধ্য হয়, কেননা এখানে পল্লীর জনগণ এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার এবং নেপলিয়নি বিধি বিবাহিত নারীকে রেখেছে অন্যের কর্তৃত্বে। ১৮৮৪তে পুনপ্রবর্তিত হয় বিবাহবিচ্ছেদ; স্ত্রী বিবাহবিচ্ছেদ পেতে পারতোযদি স্বামী ব্যভিচার করতো। তবে দণ্ডশাস্ত্রে রক্ষিত হয় লিঙ্গভিন্নতা : ব্যভিচার ছিলো আইনত অপরাধ, যদি করে স্ত্রী। ১৯০৭-এ দেয়া হয় ন্যাসরক্ষকের কিছুটা ক্ষমতা, যা পুরোপুরি দেয়া হয় ১৯১৭তে। ১৯১২তে অনুমোদিত হয় স্বাভাবিক পিতৃত্ব নির্ণয়ের অধিকার। ১৯৩৮ ও ১৯৪২-এ সংশোধিত হয় বিবাহিত স্ত্রীর মর্যাদা : আনুগত্যের কর্তব্য বাতিল করা হয়, যদিও পিতাই থাকে পরিবারের প্রধান। সে-ই ঠিক করে। বাসস্থান, যদি যথেষ্ট কারণ থাকে তাহলে স্ত্রী তার পছন্দের বিরোধিতা করতে পারে। তার আইনগত ক্ষমতা বাড়ানো হয়; কিন্তু এ-গোলমেলে বিবৃতিতে : ‘বিবাহিত স্ত্রীর সমস্ত আইনগত ক্ষমতা রয়েছে। শুধু বিয়ের চুক্তি ও আইনানুসারেই এসব ক্ষমতা খর্ব করা সম্ভব,’ এ-ধারার শেষাংশ প্রথমাংশের বিরোধী। স্বামীস্ত্রীর সাম্য তখনও অর্জিত হয় নি।
বলতে পারি ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, ও যুক্তরাষ্ট্রে রাজনীতিক অধিকার সহজে অর্জিত হয় নি। ১৮৬৭ অব্দে জন স্টুয়ার্ট মিল ইংরেজি সংসদে নারীদের ভোটাধিকারের পক্ষে প্রথম বক্তৃতা করেন, এটাই নারীরভোটাধিকারের পক্ষে প্রথম সরকারিভাবে প্রদত্ত বক্তৃতা। তাঁর লেখায় তিনি পরিবারে ও সমাজেষীপুরুষের সাম্যের জন্যে প্রবলভাবে দাবি জানান। ‘আমি নিশ্চিত যে-সামাজিক ব্যবস্থা আইনের দ্বারা এক লিঙ্গকে অধীন করে আরেক লিঙ্গের, সেটা সহজাতভাবেই খারাপ এবং সেটা মানুষের প্রগতির বিরুদ্ধে একটা বড়ো বাধা; আমি নিশ্চিত ওগুলো স্থান ছেড়ে দেবে বিশুদ্ধ সাম্যের জন্যে’। তাঁর অনুসরণে মিসেম ফসেটের নেতৃত্বে ইংরেজ নারীরা নিজেদের রাজনীতিকভাবে সংগঠিত করে, ফরাশি নারীরা জড়ো হয় মারিয়া দারাইসেঁর পেছনে, যিনি ১৮৬৮ থেকে ১৮৭১ র মধ্যে একরাশ সম্মেলনে আলোচনা করেন নারীর অবস্থা। লিয়ো রিশিয়ে, যিনি ছিলেন নারীবাদের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা, ১৮৬৯-এ প্রকাশ করেন ‘নারীর অধিকার’, এবং ১৮৭৮-এ এ-সম্পর্কে আয়োজন করেন আন্তর্জাতিক মহাসম্মেলনের। তখনও নারীদের ভোটাধিকারের প্রশ্নটি তোলা হয় নি, নারীরা নাগরিক অধিকার দাবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখে নিজেদের। তিরিশ বছর ধরে ফ্রান্সে ও ইংল্যান্ডে এ-আন্দোলন থেকেছে খুবই ভীরু। স্থাপিত হয়েছে অসংখ্য সংঘ, কিন্তু অর্জন হয়েছে সামান্যই, কেননা লিঙ্গ হিশেবে নারীদের ছিলো সংহতির অভাব।
ভোটাধিকার পেতে ফরাশি নারীদের অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৯৪৫ পর্যন্ত।
নিউজিল্যান্ড নারীদের পূর্ণ অধিকার দেয় ১৮৯৩-এ; অস্ট্রেলিয়া ১৯০৮-এ। ইংল্যান্ড ও আমেরিকায় ভোটাধিকার লাভ ছিলো খুবই কঠিন। ভিক্টোরীয় ইংল্যান্ড নারীদের বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিলো গৃহের ভেতরে; জেন অস্টিন লেখার জন্যে গোপনে লুকিয়ে রেখেছিলেন নিজেকে; বিজ্ঞানীরা ঘোষণা করেছিলেন নারীরা ‘এক উপপ্রজাতি, যাদের কাজ হচ্ছে প্রসব করা’। সেখানে ১৯০৩ পর্যন্ত নারীবাদ ছিলো ভীরু, যখন প্যাংখারস্ট পরিবার লন্ডনে স্থাপন করে নারীদের সামাজিক ও রাজনীতিক সংঘ, এবং নারীবাদী আন্দোলন ধরে এক অনন্য ও উগ্র রূপ। ইতিহাসে এই প্রথম নারীদের দেখা যায় নারী হিশেবে কর্মোদ্যোগ গ্রহণ করতে। ১৯১২তে গৃহীত হয় আরো হিংস্র কৌশল : তারা বাড়িতে আগুন লাগায়, চিত্রকলা নষ্ট করে, পায়ে পিষে লণ্ডভণ্ড করে ফুলের কেয়ারি, পুলিশের দিকে পাথর ছোড়ে, বারবার প্রতিনিধিদল পাঠিয়েঅ্যাসকুইথ ও স্যার অ্যাডওয়ার্ড গ্রেকে ঘিরে ফেলে, জনসভার বক্তৃতায় ব্যাঘাত ঘটায়। মাঝখানে ঘটে মহাযুদ্ধ। ১৯১৮ অব্দে ইংরেজ নারীরা পায় নিয়ন্ত্রিত ভোটাধিকার, এবং ১৯২৮এ অনিয়ন্ত্রিত ভোটাধিকার। তাদের সাফল্য অনেকাংশে সম্ভব হয়েছিলো যুদ্ধের সময় দায়িত্ব পালনের ফলে।
শুরু থেকেই আমেরিকার নারীরা অনেক বেশি মুক্ত ছিলো ইউরোপীয় বোনদের থেকে। উনিশ শতকের শুরুতে পুরুষদের সঙ্গে নারীদের করতে হয়েছিলো নতুন দেশে বসতি স্থাপনের কঠোর কাজ; পুরুষের পাশে থেকে তারা লড়াই করেছে; পুরুষের থেকে সংখ্যায় তারা ছিলো অনেক কম, এবং এটা তাদের খুব মূল্যবান করে তুলেছিলো। তবে ক্রমশ তাদের অবস্থা হয়ে ওঠে তাদের পুরোনো বিশ্বের নারীদের মতোই; তাদের খুব ভক্তি করা হতো এবং তারা পরিবারে ছিলো কর্তৃত্বশীল, তবে সামাজিক কর্তৃত্ব পুরোপুরিই ছিলো পুরুষের হাতে। ১৮৩০ এর দিকে কিছু নারী রাজনীতিক অধিকার দাবি করতে থাকে; এবং তারা প্রচারাভিযান চালাতে থাকে নিগ্রোদের পক্ষে। কুয়েকারনেত্রী লুক্রেশিয়া মোট স্থাপন করেন আমেরিকান নারীমুক্তি সংঘ, এবং ১৮৪০-এর এক সম্মেলনে ঘোষণা করেন কুয়েকার-অনুপ্রাণিত এক ইশতেহার, যা ঠিক করে দেয় আমেরিকার সব নারীমুক্তি আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য। ‘পুরুষ ও নারীকে সমানভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে, স্রষ্টা তাদের ভূষিত করেছে কতিপয় হস্তান্তরঅযোগ্য অধিকারে.. সরকার স্থাপিত হয়েছে শুধু এসব অধিকার রক্ষা করার জন্যে… পুরুষ বিবাহিত নারীকে এক নাগরিক শবে পরিণত করেছে… সে জোর করে নিজে অধিকার করেছে জিহোভার সমস্ত অধিকার, দাবি করেছে যে নারীর জন্যে এক পৃথক এলাকা বরাদ্দ করা তার অধিকার’। তিন বছর পরে হ্যারিয়েট বিশার স্টো লেখেন আংকেল টমস কেবিন, যা নিগ্রোদের পক্ষে গড়ে তোলে জনমত। এমার্সন ও লিংকন নারীমুক্তি আন্দোলন সমর্থন করেন। গৃহযুদ্ধের পর নারীবাদীরা নিষ্ফলভাবে দাবি করেন যে-সংশোধনী নিগ্রোদের ভোটাধিকার দিয়েছে সেটা যেনো নারীদেরও ভোটাধিকার দেয়; দ্ব্যর্থকতার সুযোগ নিয়ে সুজ্যান বি অ্যান্থনি ও তার চোদ্দোজন সঙ্গী রস্টারে ভোট দেন; তাঁকে একশো ডলার দণ্ডিত করা হয়। ১৮৬৯-এ তিনি প্রতিষ্ঠা করেন নারী ভোটাধিকারের জন্যে জাতীয় সংঘ; এবং একই বছরে ওইমিংগে নারীদের ভোটাধিকার দেয়া হয়। ১৮৯৩-এ ভোটাধিকার দেয়া হয়কোলোরাডোতে, তারপর ১৮৯৬-এ আইডাহো ও ইউটাতে।
