নারীর এক মৌলিক সমস্যা হচ্ছে প্রজননগত ভূমিকার সাথে তার উৎপাদনশীল শ্রমের সামঞ্জস্যবিধান। ইতিহাসের সূচনা থেকে যে-মৌল সত্য গৃহকর্মে নিযুক্ত করে শেষ করে দিয়েছে নারীকে এবং তাকে বাধা দিয়েছে বিশ্বকে বদলে দেয়ার কাজে অংশ নিতে, সেটা হচ্ছে প্রজননগত ভূমিকার কাছে তার দাসত্ব। স্ত্রীপশুদের আছে একটা জৈবিক ও ঋতুগত স্পন্দ, যা তাদের রক্ষা করে শক্তি ক্ষয় থেকে; কিন্তু নারী, বয়ঃসন্ধি থেকে ঋতুবিরতি পর্যন্ত, কতোবার গর্ভবতী হবে তার কোনো সীমা ঠিক করে দেয় নি প্রকৃতি। কোনো কোনো সভ্যতা বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধ করে, এবং কথিত আছে যে কিছু ভারতি গোত্রে রীতি আছে দুটি প্রসবের মধ্যে অন্তত দু-বছরের জন্যে নারীদের বিশ্রাম দেয়ার; তবে সাধারণভাবে বহু শতাব্দী ধরে নারীর উর্বরতা থেকেছে অনিয়ন্ত্রিত। প্রাচীন কাল থেকেই অস্তিত্ব আছে জন্মনিরোধকের, যা সাধারণত গ্রহণ করে নারীরা : বিষোপচার, ভেষজ নিবেশ্য, যোনিপটি; তবে ওগুলো থেকে গেছে বেশ্যা ও চিকিৎসকদের গুপ্তকথা। সম্ভবত এসব গুপ্তকথা অবক্ষয়ের কালের রোমের নারীদের জানা ছিলো, যাদের বন্ধ্যাত্ব ছিলোব্যঙ্গলেখকদের আক্রমণের লক্ষ্য। তবে মধ্যযুগের ইউরোপে অজানা ছিলো জন্মনিরোধক; আঠারো শতক পর্যন্ত ওগুলোর একটি টুকরোও পাওয়া যায় নি। ওই সময়ে নারীর জীবন ছিলো অব্যাহত গর্ভের পর গর্ভ; এমনকি সহজ সতীত্বের নারীরাও তাদের অবাধ প্রেমের মূল্য শোধ করতো ঘনঘন গর্ভধারণ করে।
কোনো কোনো পর্বে মানুষ জনসংখ্যা কমানোর তীব্র প্রয়োজন বোধ করেছে; তবে একই সময়ে রাষ্ট্র ভয় পেয়েছে দুর্বল হয়ে যাওয়ার। সংকট ও দুর্যোগের সময় হয়তো জন্মহার কমিয়েছে দেরিতে বিয়েরমাধ্যমে, তবে সাধারণ নিয়ম থেকেছে অল্প বয়সে বিয়ে করা এবং নারীর পক্ষে যতো বেশি সন্তান উৎপাদন সম্ভব ততো সন্তান উৎপাদন; শিশুমৃত্যুই শুধু হ্রাস করতো জীবিত সন্তানের সংখ্যা। সতেরো শতকেই আবে দ্য পির প্রতিবাদ করেছিলেন নারীদের ‘প্রেমে পেটফোলা রোগ’-এ দণ্ডিত করার বিরুদ্ধে; এবং মাদাম দ্য সেভিএ তাঁর কন্যাকে উপদেশ দিয়েছিলেন ঘনঘন গর্ভবতী না হওয়ার। তবে আঠারো শতকে ফ্রান্সে বিকশিত হয় মালথাসীয়বাদ। প্রথমে উচ্চবিত্ত শ্রেণীগুলো, তারপর সাধারণ জনগণ পিতামাতার অবস্থানুসারে সন্তানের সংখ্যা কমানোকে যুক্তিসঙ্গত বলে মনে করে, এবং শুরু হয় জন্মনিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া। প্রথমে বহিরপাত রীতি ছড়িয়ে পড়ে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে, তারপর গ্রামবাসী ও শ্রমিকদের মধ্যে। ফ্রান্সে নিষিদ্ধ ছিলো জন্মনিয়ন্ত্রণমূলক প্রচারণা ও যোনিপটি ও এধরনের অন্যান্য জিনিশ বিক্রি; তবে বেশ ব্যাপকভাবেই চলতো ‘জন্মনিয়ন্ত্রণ’।
গর্ভপাত কোথাও আইনে সরকারিভাবে অনুমোদিত ছিলো না। রোমান আইন ভ্রূণজীবনের জন্যে কোনো বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে নি; এ-আইন প্রসব্যকে মায়ের শরীরের অংশ বলেই গণ্য করতো, মানুষ হিশেবে নয়। অবক্ষয়ের কালে গর্ভপাত এক স্বাভাবিক প্রচল হয়ে উঠেছিলো। যদি স্বামীর ইচ্ছের বিরুদ্ধে গর্ভপাত ঘটাতো স্ত্রী, সে স্ত্রীকে শাস্তি দিতো, তবে ওটা তার অবাধ্যতার অপরাধের জন্যে। সমগ্র প্রাচ্যদেশীয় ও গ্রেকো-রোমান সভ্যতায় গর্ভপাত অনুমোদিত ছিলো।
খ্রিস্টধর্ম ভ্রূণকে একটি আত্মা দিয়ে নৈতিক বিপ্লব ঘটায়; এর পর থেকে গর্ভপাত হয়ে ওঠে ভ্রূণের বিরুদ্ধে অপরাধ। সেইন্ট অগাস্টিনের মতে, ‘যে-নারী তার পক্ষে যতোগুলো সন্তান জন্ম দেয়া সম্ভব ততোগুলো সন্তান জন্ম দেয় না, সে ততোগুলো হত্যাকাণ্ডের অপরাধে অপরাধী, ঠিক তেমনই অপরাধী সে-নারী, যে গর্ভধারণের পর আহত করে নিজেকে’। যাজকীয় আইন বিকশিত হয় ধীরেধীরে, তারা অন্তহীন আলোচনা করে এ-প্রশ্ন নিয়ে যে আসলে ঠিক কখন আত্মা প্রবেশ করে ভ্রূণের দেহে। সেইন্ট টমাস ও অন্যরা ঠিক করেন পুরুষের বেলা আত্মা ঢোকে চল্লিশ দিনের দিন আর মেয়ের বেলা ঢোকে আশি দিনের দিন। মধ্যযুগে গর্ভপাতের জন্যে নানা মাত্রার অপরাধ নির্দিষ্ট হয় গর্ভপাতের সময় ও কারণ অনুসারে : ‘যে-গরিব নারী প্রতিপালন করতে পারবে না বলে শিশু ধ্বংস করে এবং যার লাম্পট্যের অপরাধ লুকোনো ছাড়া আর কোনো উদ্দেশ্য নেই, তাদের মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে,’ প্রায়শ্চিত্ত পুস্তক বলেছে একথা। উনিশ শতকে গর্ভপাত হত্যাকাণ্ড এ-ধারণা লোপ পায়; একে গণ্য করা হয় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ বলে। ক্যাথলিক গির্জা তাঁর কঠোরতা হ্রাস করে নি; ১৯১৭তে গির্জা গর্ভপাতে জড়িত সবাইকে ধর্ম থেকে বহিষ্কার করার বিধান দেয়। পোপ এই সম্প্রতিও ঘোষণা করেছেন যে মায়ের জীবন ও শিশুর জীবনের মধ্যে উৎসর্গ করতে হবে আগেরটিকে : অবশ্য মায়ের যেহেতু অপ্সুদীক্ষা হয়েছে, সে স্বর্গে প্রবেশাধিকার পেতে পারে। কিন্তু মজার কথা যে নরক কখনো এসব হিশেব করে না। আর ভ্রূণ অনন্তকাল কাটাতে থাকবে লিম্বোতে। গর্ভপাত সরকারিভাবে স্বীকৃত হয়েছিলো শুধু অল্পকালের জন্যে : জর্মানিতে নাটশিবাদের আগে, এবং ১৯৩৬-এর আগে রাশিয়ায়। কিন্তু ধর্ম ও আইস সত্ত্বেও সব দেশেই এটা অধিকার করে আছে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান।
নারীর অবস্থার বিবর্তন ব্যাখ্যা করতে হবে দুটি কারণের একযোগে কাজ হিশেবে : উৎপাদনশীল শ্রমে অংশগ্রহণ ও প্রজননের দাসত্ব থেকে মুক্তিলাভ। এঙ্গেলস যেমন আগেই বুঝতে পেরেছিলেন, রূপান্তরিত করে দিতে হবে নারীর সামাজিক ও রাজনীতিক মর্যাদা। নারীবাদী আন্দোলন, ফ্রান্সে যার রূপরেখা তুলে ধরেছিলেন কদরসে, ইংল্যান্ডে মেরি ওলস্টোনক্র্যাফট তার ভিন্ডিকেশন অফ দি রাইটস অফ ওম্যান-এ, এবং উনিশ শতকের শুরুতে যা আবার শুরু করেছিলেন সাৎ-সিমোবাদীরা, তা কোনো সুস্পষ্ট ফল লাভ করতে ব্যর্থ হয়, কেননা তার অভাব ছিলো বাস্তব ভিত্তির। কিন্তু এখন, যখন নারীরা স্থান নিয়েছে কলকারখানায় এবং বেরিয়ে এসেছে ঘর থেকে, তখন তাদের দাবি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে শুরু করেছে। উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বিষয়সম্পত্তির মাধ্যমেই নারী শক্তভাবে বাঁধা ছিলো স্বামীর সঙ্গে; বিষয়সম্পত্তি অতীতের ব্যাপার হয়ে ওঠায় স্বামী-স্ত্রী শুধুই স্থাপিত হয় পাশাপাশি; এমনকি সন্তানেরাও তাদের ততোটা শক্তভাবে বেঁধে রাখতে পারে না যেমন বেঁধে রাখতে সম্পত্তির স্বার্থ। এভাবে ব্যক্তি মুক্তি পায়দল থেকে।
