এসব তাত্ত্বিক বিতর্ক ঘটনাক্রমের ওপর কোনো প্রভাব ফেলে নি : এগুলো বরং যা ঘটছিলো, এগুলো ছিলো তার দ্বিধাগ্রস্ত প্রতিফলন। নারীরা পুনরুদ্ধার করে এমন এক আর্থিক গুরুত্ব, যা তারা হারিয়েফেলেছিলো প্রাগৈতিহাস কাল থেকে, কেননা তারা মুক্তি পায় চুলো থেকে এবং কারখানায় উৎপাদনের ক্ষেত্রে পায় একটি নতুন ভূমিকা। যন্ত্রই সম্ভব করে তোলে এ-অভ্যুত্থানকে, কেননা অনেকাংশেই লোপ পায়নারী ও পুরুষ শ্রমিকদের শারীরিক বলের পার্থক্য। কলকারখানার দ্রুত বৃদ্ধির ফলে দরকার পড়ে অনেক বড়ো শ্রমশক্তি, যা শুধু পুরুষের পক্ষে যোগানো সম্ভব হয় নি, তাই দরকার হয়ে পড়ে নারীদের সহযোগিতা। এটাই ছিলো উনিশ শতকের মহাবিপ্লব, যা রূপান্তরিত করে দেয় নারীদের ভাগ্য, এবং তাদের জন্য সূচনা করে এক নতুন যুগের। মার্ক্স ও এঙ্গেলস পরিমাপ করেন এর সম্পূর্ণ বিস্তারটি, এবং তারা সর্বহারার মুক্তির মধ্যে দেখতে পান নারীর মুক্তি। আসলে, ‘নারীও শ্রমিকদের এখানেই মিল : তারা উভয়ই নির্যাতিত’, বলেছেন বেবেল। এবং প্রাযুক্তিক বিবর্তনের ফলে তাদের শ্ৰম যে-গুরুত্ব পাবে, তাতে উভয়েই নির্যাতন থেকে মুক্তি পাবে একই সাথে। এঙ্গেলস দেখিয়েছেন যে নারীর ভাগ্য শক্তভাবে বাঁধা ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তির সাথে; একটি বিপর্যয় মাতৃধারার স্থানে বসিয়েছিলো পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে এবং নারীকে বেঁধে ফেলেছিলো উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বিষয়সম্পত্তির দাসত্বে। তবে শিল্পবিপ্লব ছিলো ওই অধিকারহানির বিপ্রতীপমূর্তি এবং যা নিয়ে যায় নারীমুক্তির দিকে।
উনিশ শতকের শুরুতে নারীদের লজ্জাকরভাবে শোষণ করা হয়েছে পুরুষ শ্রমিকদের তুলনায়। ঘরে নারীশ্রমকে ইংরেজেরা বলতো ‘ঘর্মায়ণ পদ্ধতি’; নিরন্তর শ্রম সত্ত্বেও নারীশ্রমিকেরা তাদের অভাব মেটানোর মতো আয় করতে পারতো না। জুলে সিমো তাঁর লইউভরিয়েতে এবং এমনকি রক্ষণশীল লিয়োয়-বয়লো ১৮৭৩-এ প্রকাশিত তাঁর ল্য ত্রাভেল দে ফেমে ও ১৯-এ, নিন্দা করেছেন এ-হীন পীড়নের; পরেরজন বলেছেন যে ফ্রান্সের দু-লক্ষেরও বেশি নারীশ্রমিক দিনে পঞ্চাশ সাঁতিমের থেকেও কম আয় করে। মালিকেরা অনেক সময় পুরুষদের থেকে বেশি পছন্দ করতো নারীদের। ‘তারা কম মজুরিতে বেশি কাজ করে’। এ-নিরাশাজনক সূত্র আলোকিত করে তোলে নারীশ্রমের নাটকটিকে। কেননা শ্রমের মধ্য দিয়েই মানুষ হিশেবে নারী জয় করেছে তার মর্যাদা; তবে এটা ছিলো একটা অতি কষ্টার্জিত ও প্রলম্বিত বিজয়।
সুতো কাটা ও কাপড় বোনার কাজ করতে হতো শোচনীয় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। ব্লকু লিখেছেন, ‘লায়নে ফিতার কারখানায় নারীদের কাজ করতে হয় অনেকটা দোয়ালে ঝুলে থেকে, যখন তারা উভয় পা ও হাত দিয়ে কাজ করে’। ১৮৩১-এ রেশম শ্রমিকেরা গ্রীষ্মকালে কাজ করতো ভোর তিনটে থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত, শীতকালে কাজ করতে ভোর পাঁচটা থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত, দৈনিক সতেরো ঘন্টা; ‘এমনকারখানায় যা অধিকাংশ সময়ই হতো অস্বাস্থ্যকর, যেখানে কখনো সূর্যালোক ঢুকতো না,’ বলেছেন নৰ্বার ত্রুকি।
তাছাড়া, পুরুষ শ্রমিকের বিশেষ সুবিধা আদায় করে নিতে তরুণী শ্রমিক মেয়েদের ওপর। অনেক সময় নারীরা কারখানায় কাজের সাথে খামারের কাজও করতো। তারা শোষিত হতো পীড়াদায়কভাবে। ডাস কাপিটাল-এর এক টীকায় মার্ক্স বর্ণনা করেছেন এটা : ‘উৎপাদনকারী, মিঃ ই., আমাকে জানিয়েছেন তিনি তার তাঁতকলে শুধু নারীদেরই নিয়োগ করেন, তিনি অগ্রাধিকার দেন বিবাহিত নারীদের, আবার তাদের মধ্যে সে-নারীদের, বাড়িতে যাদের ভরণপোষণের জন্যে আছে পরিবার, কেননা তারা অবিবাহিতদের থেকে বেশি মনোযোগী আর বশমানা; এবং পরিবারের ভরণপোষণের জন্যে তারা তাদের শক্তির শেষকণাটি ক্ষয় করে কাজ করে’। জি দারভিল লিখেছেন : ‘পোষাপ্রাণী বা ভারবাহী পশু : এই হচ্ছে আজকাল নারী। যখন সে কাজ করে না তখন তার প্রতিপালন করে পুরুষ আর সে এখনও প্রতিপালিত হয়পুরুষ দিয়ে যখন সে কাজ করতে করতে মারা যাচ্ছে’। তাদের এ অবস্থার আংশিক কারণ হচ্ছে নারীরা প্রথমে বুঝতে পানি কীভাবে আত্মরক্ষা করতে হয় এবং নিজেদের সংগঠিত করতে হয় সংঘে।
১৮৮৯-৯৩ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায় যে ফ্রান্সে নারীশ্রমিকেরা দৈনিক মজুরি হিশেবে পেতে পুরুষের মজুরির অর্ধেক। ১৯০৮-এর এক অনুসন্ধান অনুসারে ঘণ্টাপ্রতি শ্রমিকদের সর্বোচ্চ মজুরি বিশ সাতিমের বেশি হতো না এবং কখনো কখনো কমে দাঁড়াতে পাঁচ সাতিম; তাই এভাবে শোষিত কোনো নারীর পক্ষে ভিক্ষা করা বা কোনো রক্ষক ছাড়া বেঁচে থাকা সম্ভব হতো না। ১৯১৮তে আমেরিকায়একজন নারীশ্রমিক পেতো পুরুষ শ্রমিকের অর্ধেক মজুরি। এ-সময়ে জর্মন কয়লাখনিতে একজন নারীশ্রমিক সমপরিমাণ কয়লা খোঁড়ার জন্যে মজুরি পেতো একজন পুরুষ শ্রমিকের থেকে শতকরা পঁচিশ ভাগ কম। ১৯১১ থেকে ১৯৪৩-এর মধ্যে ফ্রান্সে নারীশ্রমিকদের মজুরি পুরুষ শ্রমিকদের থেকে অনেক বেশি দ্রুত বাড়ানো হয়, তারপরও তাদের মজুরি থাকে অনেক কম।
কম মজুরি নিতো বলে নারীশ্রমিকদের পছন্দ করতে নিয়োগদাতারা, আর এটাই জাগাতো পুরুষ শ্রমিকদের বিরোধিতা। বেবেল ও এঙ্গেলস যেমন দাবি করেছেন তেমন কোনো অব্যবহিত সংহতি ছিলো না সর্বহারার স্বার্থের সাথে নারীর স্বার্থের। একই সমস্যা দেখা দেয় যুক্তরাষ্ট্রে নিগ্রো শ্রমিকদের ক্ষেত্রে। শোষণকারীরা সাধারণত অস্ত্র হিশেবে তাদের নিজেদের শ্রেণীরই বিরুদ্ধে ব্যবহার করে সমাজের সবচেয়ে শোষিত সংখ্যালঘুদের; তাই তাদের শ্রেণীর কাছে প্রথমে সংখ্যালঘুদের মনে হয় শত্রু; কালো ও শাদাদের স্বার্থ, নারীশ্রমিক ও পুরুষ শ্রমিকদের স্বার্থ, পরস্পরের বিরোধী না হয়ে যে লাভ করতে পারে সংহতি, এর জন্যে দরকার পরিস্থিতিকে অনেক বেশি গভীরভাবে অনুধাবন করা। এটা সহজবোধ্য যে পুরুষ শ্রমিকেরা প্রথমে এই হ্রাসমূল্যে ছাড়া প্রতিযোগিতার মধ্যে দেখেছিলো এক প্রচণ্ড বিপদ, তাই তারা দেখিয়েছিলো এর বিরুদ্ধে শত্রুতা। শুধু যখন নারীরা শ্রমিক সংগঠনে সুসংহত হয়েছে, তখনই শুধু তারা রক্ষা করতে পেরেছে নিজেদের স্বার্থ এবং সমগ্র শ্রমিক শ্রেণীর জন্যে বিপজ্জনক হওয়া থেকে বিরত করতে পেরেছে নিজেদের।
