বিপ্লবের সময় নারীরা পেয়েছিলো এক ধরনের নৈরাজ্যমূলক মুক্তি। কিন্তু সমাজ যখন আবার সংগঠিত হয়, নারী নতুনভাবে আবদ্ধ হয় কঠোর দাসত্ববন্ধনে। নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে ফ্রান্স এগিয়ে ছিলোঅন্যান্য দেশ থেকে; কিন্তু আধুনিক ফরাশি নারীর দুর্ভাগ্য এই যে তার মর্যাদা স্থির হয় এক সামরিক একনায়কত্বের কালে; নেপলিয়নি বিধি, তার ভাগ্যকে এক শতাব্দীর জন্যে বিধিবদ্ধ করে, তার মুক্তিকে বিপুলভাবে শ্লথ করে দেয়। সব সামরিক ব্যক্তির মতো নেপলিয়ন নারীর মধ্যে দেখতে পছন্দ করতে একটি মা; কিন্তু একটি বুর্জোয়া বিপ্লবের উত্তরাধিকারীরূপে সে এমন লোক ছিলো না যে বিপর্যস্ত করবে সমাজের সংস্থিতি, এবং মাকে দেবে স্ত্রীর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব। সে পিতৃত্ব খোঁজা নিষিদ্ধ করে; অবিবাহিত মা ও অবৈধ সন্তানের ওপর চাপিয়ে দেয় কঠোর শর্ত। তবে বিবাহিত নারী নিজে কোনো মর্যাদা পায় নি মা হিশেবে; সামন্ততান্ত্রিক অসঙ্গতিকে দেয়া হয় স্থায়িত্ব। বালিকা ও স্ত্রীকে বঞ্চিত করা হয় নাগরিক অধিকার থেকে, যার ফলে তার পক্ষে সম্ভব হয় না আইনব্যবসা ও অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করা। তবে কুমারী নারী, চির-আইবুড়ো, ভোগ করতো সমস্ত নাগরিক অধিকার, কিন্তু বিয়েতে বজায় থাকতো সে-পুরোনো পরনির্ভরতা। স্ত্রী বাধ্য থাকতো স্বামীর অনুগত থাকতে; ব্যভিচারের অপরাধে স্বামী তাকে একলা ঘরে বন্দী করে রাখতে পারতো এবং বিবাহবিচ্ছেদ ঘটাতে পারতো; যদি ব্যভিচারের কাজের সময় স্বামী ধরতে পারতো স্ত্রীকে, খুন করতো স্ত্রীকে, আইনের চোখে সে ক্ষমার্হ হতো; আর স্বামী যদি বাড়িতে নিয়ে আসতো রক্ষিতা, তাহলে তার হতো সামান্য দণ্ড; এবং এ-ঘটনার জন্যেই শুধু স্ত্রী স্বামীর কাছে থেকে পেতে পারতো বিবাহবিচ্ছেদ। স্ত্রীর দেহ ও সম্পদ ছিলো কঠোর বৈবাহিক নিয়ন্ত্রণের অধীন।
উনিশ শতকে আইনশাস্ত্র চাপিয়ে দেয় ওই বিধির কঠোর প্রয়োগ। ১৮২৬-এ লুপ্ত হয় বিবাহবিচ্ছেদ, এবং ১৮৮৪-র আগে আর পুনপ্রবর্তিত হয় নি; তখনও এটা ছিলো কঠিন। ঘোষণা করা হয় যে নারী তৈরি হয়েছে পরিবারের জন্যে, রাজনীতির জন্যে নয়; গৃহস্থালির জন্যে, সামাজিক কাজের জন্যে নয়। অগাস্ত কোঁৎ ঘোষণা করেন বিশেষভাবে মানবপ্রজাতিতে, শারীরিক ও নৈতিকভাবে, নারী ও পুরুষের মধ্যে রয়েছে মৌল পার্থক্য, যা তাদের করে তুলেছে গভীরভাবে ভিন্ন। নারীত্ব ছিলো এক ধরনের ‘প্রলম্বিত শৈশব’, যা তাকে পৃথক করে তুলেছে ‘জাতির আদর্শরূপ থেকে’ এবং তার মনকে করেছে দুর্বল। তিনি গৃহের বাইরে নারীর শ্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেন। নৈতিকতা ও প্রেমে নারীকে মনে করা যেতে পারে শ্রেষ্ঠতর; কিন্তু পুরুষ করতো কাজ, যখন নারী আর্থিক বা রাজনীতিক অধিকারহীন হয়ে থাকতো বাড়িতে।
বালজাক আরো নৈরাশ্যজনক ভাষায় প্রকাশ করেছেন একই বিশ্বাস। ফিজিয়লজি দি মারিয়াজ-এ তিনি লিখেছেন : ‘পুরুষের হৃদয়কে স্পন্দিত করাই নারীর নিয়তি ও একমাত্র গৌরব… সে এক অস্থাবর সম্পত্তি এবং ঠিকভাবে বললে সে পুরুষের পাশে এক গৌণ জিনিশ’। এখানে তিনি আঠারো শতকের অনুমোদন ও এ-সময়ের ভীতিকর প্রগতিশীল চিন্তাভাবনার বিরুদ্ধে কথা বলছেন নারীবিরোধী মধ্যবিত্ত শ্ৰেণীটির পক্ষে। বালজাক দেখিয়েছেন প্রেমহীন বুর্জোয়া বিয়ে স্বাভাবিকভাবেই এগোয় ব্যভিচারের দিকে, এবং তিনি স্বামীদের পরামর্শ দিয়েছেন শক্তহাতে বল্গা ধরে রাখতে, স্ত্রীদের শিক্ষা ও সংস্কৃতি না দিতে, তাদের যতোখানি সম্ভব অসুন্দর রাখতে। মধ্যবিত্ত শ্ৰেণীটি নারীদের রান্নাঘরে ও বাড়িতে বন্দী করে রেখে, তাদের আচরণের ওপর সতর্ক চোখ রেখে, তাদের পুরোপুরি নির্ভরশীল করে রেখে মেনে চলেছে এ-কর্মসূচি। ক্ষতিপূরণ হিশেবে তাদের দেয়া হতো সম্মান এবং তাদের সঙ্গে করা হতো চরম ভদ্র ব্যবহার। ‘বিবাহিতা নারী এক দাসী, যাকে বসিয়ে রাখতে হবে সিংহাসনে’, বলেছেন বালজাক। অধিকাংশ বুর্জোয়ানারী গ্রহণ করেছিলো এ-কারুকার্যমণ্ডিত বন্দীত্ব; আর অল্পসংখ্যক যারা প্রতিবাদ করেছিলেন, তাঁদের কথা শোনা হয় নি। বার্নার্ড শ বলেছেন মানুষকে শেকলমুক্ত করার থেকে শৃঙ্খলিত করা সহজ, যদি শেকল হয় লাভজনক। মধ্যবিত্ত নারী আঁকড়ে ধরে রেখেছিলো তার শেকল, কেননা সে আঁকড়ে ধরে রেখেছিলো তার শ্ৰেণীর সুযোগসুবিধা। পুরুষের হাত থেকে মুক্ত হয়ে নিজের জীবিকার জন্যে কাজ করতে হতোতাকে; সে শ্রমজীবী নারীর সাথে কোনা সংহতি বোধ করে নি, এবং তার বিশ্বাস ছিলো বুর্জোয়া নারীর মুক্তির অর্থ হচ্ছে তার শ্রেণীর বিনাশ।
তবে ইতিহাসের অগ্রগতি এসব একগুঁয়ে প্রতিরোধে থেমে থাকে নি; যন্ত্রের আগমন ধ্বংস করে ভূসম্পত্তিশালীদের এবং নারীদের সাথে শ্রমজীবীদের মুক্তিকেও ত্বরান্বিত করে। সব ধরনের সমাজতন্ত্র, পরিবার থেকে নারীদের জোর করে ছিনিয়ে নিয়ে, প্রশস্ত করে নারীর মুক্তি। প্লাতো স্বপ্ন দেখেছিলেন এক ধরনের সংঘব্যবস্থার এবং তাদের দিতে চেয়েছিলেন এমন স্বায়ত্তশাসন, যা উপভোগ করতো স্পার্টার নারীরা। সাৎ-সিমো, ফুরিয়ে, ও কাবের ইউটোপীয় সমাজতন্ত্রের সাথে জন্ম নেয় ‘মুক্তনারী’র ইউটোপিয়া; বিলুপ্ত করা হয় শ্রমিক ও নারীর দাসত্ব, কেননা নারীরাও পুরুষের মতো মানুষ। দুর্ভাগ্যক্রমে এ-যৌক্তিক ভাবনা সাৎ-সিমোবাদী ধারায় প্রাধান্য লাভ করে নি। ফুরিয়ে, উদাহরণস্বরূপ, গোলমাল পাকিয়ে তোলেন নারীমুক্তি ও মাংসের পুনর্বাসনের মধ্যে, তিনি দাবি করেন যে প্রতিটি মানুষকে সাড়া দিতে হবে তার কামনার ডাকে এবং বিয়ের স্থান নেবে প্রেম; তিনি নারীকে মানুষ হিশেবে গণ্য করে দেখেছেন শুধু তার কামমূলক ভূমিকা। কাবে নারীপুরুষের সম্পূর্ণ সাম্যের প্রতিশ্রুতি দেন, কিন্তু তিনি নারীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণে বাধা দেন। অন্যরা নারীমুক্তি না চেয়ে দাবি করেন নারীদের সুশিক্ষা। নারী যে এক পুনর্জীবনদাত্রী শক্তি, এ-ধারণা টিকে ছিলো উনিশ শতক ভরে এবং আবার দেখা দেয় ভিক্তর উগোতে। নারীপক্ষীয়দের অযোগ্যতার ফলে নারীর আন্দোলন হারিয়ে ফেলে তার সুনাম। বিভিন্ন সংঘ, সাময়িকী, প্রতিনিধিদল, ‘ব্লুমারবাদ’-এর মতো আন্দোলনগুলো–সবই হয়ে ওঠে হাস্যাস্পদ। তখনকার সবচেয়েমেধাবী নারী মাদাম দ্য স্তেল ও জর্জ সাঁ নিজেদের স্বাধীনতার জন্যে লড়াই করে দূরে থাকেন এসব আন্দোলন থেকে। তবে উনিশ শতকের সংস্কার আন্দোলন সাধারণভাবে ছিলো নারীবাদের পক্ষে, কেননা এটা চেয়েছিলো সাম্যের মধ্যে সুবিচার। প্রধো ছিলো এক অসাধারণ ব্যতিক্রম। সে নারীদের নিকৃষ্টতা দেখাতে চেয়ে ভঙ্গ করে নারীবাদ ও সমাজতন্ত্রের মধ্যে মৈত্রি, সতীনারীকে ঠেলে দেয় গৃহে, ও পুরুষনির্ভরতায়। সে বেছে নিতে বলে ‘গৃহিণীকে অথবা বেশ্যা’কে। তবে সব নারীবিরোধীর মতোই পুরুষের দাসী ও দর্পণ ‘প্রকৃত নারী’র প্রতি সে নিবেদন করে অতি আকুল প্রার্থনাগীতি। তবে এ-গভীর ভক্তি সত্ত্বেও সে ব্যর্থ হয়নিজের স্ত্রীকে সুখী করতে : মাদাম প্রধোর পত্রাবলি এক দীর্ঘ বিলাপ।
