নারীদের সাফল্যই তাদের বিরুদ্ধে জাগিয়ে তোলে নতুন আক্রমণ : প্রেসিওজ নামের আক্রান্ত নারীরা জনমতকে বিরূপ করে তোলেন; প্রেসিওজ রিদিকিল ও ফাম সভাঁতেদের করতালি দিয়ে সমর্থন জানানো হতো, যদিও মলিয়ের নারীদের শত্রু ছিলেন না : তিনি জোর করে বিয়ে দেয়াকে কঠোরভাবে আক্রমণ করেন, দাবি করেন তরুণীর হৃদয়ানুভূতির স্বাধীনতা এবং স্ত্রীর মর্যাদা ও স্বাধীনতা। বোসে প্রচারণা চালাতেন নারীদের বিরুদ্ধে, বোইলো লেখেন প্রহসন। পোলাঁ দ্য ল বার, ওই সময়ের প্রধান নারীবাদী, ১৬৭৩-এ প্রকাশ করেন দ্য লেগালিতে দে দো সেক্স। পুরুষেরা, তিনি মনে করেন, তাদের বিপুল শক্তিকে ব্যবহার করে নিজেদের লিঙ্গকে সুবিধা দেয়ার জন্যে, এবং নারী অভ্যাসবশত সায় দেয় তাদের অধীনতার প্রতি। তারা কখনো সুযোগ পায় নি, স্বাধীনতাও নয় শিক্ষাও নয়। তাই তাদের অতীতের কাজ দিয়ে তাদের বিচার করা যাবে না, তিনি যুক্তি দেন, এবং কিছুই নির্দেশ করে না যে তারা পুরুষের থেকে নিকৃষ্ট। তিনি নারীর জন্যে দাবি করেন প্রকৃত শিক্ষা।
এ-বিষয়েও দু-ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিলো আঠারো শতক। কিছু লেখক প্রমাণ করার চেষ্টা করেন নারীদের আত্মা অমর নয়। রুশো নারীদের বলি দেন স্বামী ও মাতৃত্বের কাছে, এভাবে তিনি কথা বলেন মধ্যবিত্তের পক্ষে। ‘নারীর সমস্ত শিক্ষা হতে হবে পুরুষাপেক্ষী,’ তিনি বলেন; ‘… নারীকে তৈরি করা হয়েছিলো পুরুষের অধীন হওয়ার জন্যে এবং তার অবিচার সহ্য করার জন্যে’। আঠারো শতকের গণতান্ত্রিক ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী ভাবাদর্শ অবশ্য ছিলোনারীর প্রতি অনুকূল; অধিকাংশ দার্শনিকের কাছেই মানুষ বলে মনে হতো নারীকে, যারা শক্তিশালী লিঙ্গের অন্তর্ভুক্তদের সমতুল্য। ভলতেয়ার নারীর ভাগ্যের অবিচারকে নিন্দা করেছেন। দিদরো মনে করতেন নারীর নিকৃষ্টতার বেশির ভাগই সমাজের তৈরি। হেলভেতিউ দেখান যে নারীর শিক্ষার উদ্ভটত্বই সৃষ্টি করে নারীর নিকৃষ্টতা। তবে মার্সিয়ে হচ্ছেন সেই একক পুরুষ, যিনি তাঁর তাবলো দ্য পারিতে ক্ষুব্ধ বোধ করেছেন শ্রমজীবী নারীর দুর্দশায় এবং নারীশ্রম সম্পর্কে তুলেছেন মৌলিক প্রশ্ন। নারীকে পুরুষের সমান শিক্ষা দেয়া হলে নারী হবে পুরুষের সমতুল্য, এটা বিবেচনা করে কঁদরসে চেয়েছেন নারীরা প্রবেশ করুক রাজনীতিতে। ‘আইন দ্বারা নারীকে যতো বেশি দাসত্বে বন্দী করা হয়েছে,’ তিনি বলেন, ‘ততো বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে তাদের সাম্রাজ্য…’
ফরাশি বিপ্লব থেকে : চাকুরি ও ভোট
প্রথম খণ্ড । ভাগ ২ – ইতিহাস । পরিচ্ছেদ ৫
এটা প্রত্যাশা করা খুবই স্বাভাবিক ছিলো যে বিপ্লব বদলে দেবে নারীর ভাগ্য। কিন্তু এটি তেমন কিছুই করে নি। মধ্যবিত্তের বিপ্লব শ্রদ্ধাশীল ছিলো মধ্যবিত্তের সংস্থাগুলো ও মূল্যবোধের প্রতি, এবং এটা সম্পন্ন হয়েছিলো প্রায়-পুরোপুরিই পুরুষদের দ্বারা। এ-সত্যটির ওপর জোর দেয়া দরকার যে প্রাচীনব্যবস্থা ভরে শ্রমজীবী শ্ৰেণীগুলোর নারীরাই স্ত্রীলিঙ্গদের মধ্যে উপভোগ করেছে সবচেয়ে বেশি স্বাধীনতা। তারা ব্যবসা চালাতে পারতো এবং স্বাধীনভাবে কাজ করার সব আইনগত অধিকার তাদের ছিলো। তাদের বস্তুগত স্বাধীনতা তাদের অধিকার দিতে বিপুল স্বাধীন আচরণের : জনগণের নারী বাইরে যেতে পারতো, যেতে পারতো সরাইখানায়, পুরুষদের মতো ইচ্ছেমতো সম্ভোগ করতে পারতো নিজেদের দেহ; তারা ছিলো স্বামীদের সহচর ও সমান। লৈঙ্গিক স্তরে নয়, তারা পীড়ন ভোগ করতো আর্থনীতিক স্তরে। পল্লীতে চাষীনারীরা খামারের কাজে বেশ বড়ো অংশ নিতো; তাদের গণ্য করা হতো ভৃত্য বলে; অনেক সময় তারা স্বামী ও পুত্রদের সাথে বসে খেতে পেতো না, যদিও খাটতো তাদের থেকে বেশি, এবং তাদের অবসাদের সঙ্গে যুক্ত হতো মাতৃত্বের বোঝা। তবে প্রাচীন কৃষিসমাজের মতোই পুরুষের কাছে তারা দরকারি ছিলো বলে মর্যাদা পেতো স্বামীর কাছে; ঘরে তাদের ছিলো প্রবল কর্তৃত্ব। তবে সাধারণ মানুষেরা বিপ্লবে নেতৃত্ব দেয় নি এবং তার ফলও ভোগ করে নি।
মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নারীদের কথা বলতে গেলে, তাদের কিছু প্রবল উৎসাহে কাজ করেছেন মুক্তির পক্ষে, যেমন মাদাম রোলা এবং লুসিল দেসমুলি। এঁদের মধ্যে একজন ঘটনাক্রমের ওপর ফেলেছিলেন গভীর প্রভাব, তিনি শার্লৎ কোর্দা, যখন তিনি আততায়িত করেন মারাৎকে। নারীদের কিছু বিক্ষোভও প্রদর্শিত হয়েছিলো, অলিম্প দ্য গজে ১৭৮৯-এ প্রস্তাব করেছিলেন ‘নারীর অধিকার ঘোষণা’, যেটি সমতুল্য ছিলো ‘মানবাধিকার ঘোষণা’র, যাতে তিনি পুরুষের সমস্ত সুযোগসুবিধা লোপের দাবি করেন; এবং অবিলম্বে শেষ হন বধ্যমঞ্চে। তখন নানা ক্ষীণায়ু সাময়িকী বেরোয়, এবং কিছু নারী চালান রাজনীতিক কর্মকাণ্ডের নিস্ফল প্রয়াস।
১৭৯০-এ উত্তরাধিকার লাভে বয়োজ্যষ্ঠ পুরুষের বিশেষ অধিকার লোপ পায়; এক্ষেত্রে ছেলেমেয়েরা সমান হয়ে ওঠে। ১৭৯২-এ গৃহীত হয় বিবাহবিচ্ছেদ আইন; এতে শিথিল হয় বৈবাহিক দাসত্ব। তবে এগুলো ছিলো তুচ্ছ বিজয়। মধ্যবিত্ত নারীরা পরিবারে এতো খাপ খেয়ে গিয়েছিলো যে তারা নিজেদের মধ্যে লিঙ্গ হিশেবে কোনো সংহতি বোধ করে নি; তারা অধিকারের দাবি আরোপ করার মতো কোনো স্বতন্ত্রজাত ছিলো না : আর্থনীতিকভাবে তারা যাপন করতে পরগাছার অস্তিত্ব। আর্থিক ক্ষমতা যখন আসে শ্রমিকদের হাতে, তখন শ্রমজীবী নারীদের পক্ষে সম্ভব হয় এমন সব অধিকার ও সুবিধা আদায় করে নেয়া, যা কখনো সম্ভব হয় নি ওই পরগাছা নারীদের, অভিজাত বা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর, পক্ষে অর্জন করা।
