পনেরো শতকের শুরু থেকে উনিশ শতক পর্যন্ত নারীর আইনগত মর্যাদা থাকে অপরিবর্তিত, তবে সুবিধাভোগী শ্ৰেণীগুলোতে তার বাস্তব পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে। লিঙ্গ নির্বিশেষে শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের বিকাশের জন্যে ইতালীয় রেনেসাঁস ছিলো একটি ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদী অনুকূল পর্ব। নারীরা হয় ক্ষমতাশালী রাজ্ঞী, সামরিক যোদ্ধা, এবং নেত্রী, শিল্পী, লেখক, ও সুরস্রষ্টা। এ-নারীদের অধিকাংশই চেতনা, রীতিনীতি, ও অর্থসম্পদে ছিলেন স্বাধীন অভিজাত গণিকা, এবং তাদের অপরাধ ও প্রমত্ত আনন্দোৎসবগুলো পরিণত হয়েছে কিংবদন্তিতে। পরের শতাব্দীগুলোতে যে-নারীরা মুক্ত থাকতে পেরেছিলেন ওই সময়ের কঠোর সাধারণ নৈতিকতা থেকে, মর্যাদা ও ধন অনুসারে তারা ভোগ করেন একই স্বাধীনতা। ক্যাথেরিন দ্য মেদিচি, এলিজাবেথ, ইসাবেলা প্রমুখ রাণী এবং তেরেসা ও ক্যাথেরিনের মতো সন্তরা দেখিয়েছিলেন অনুকূল পরিস্থিতিতে নারীরা কী অর্জন করতে পারে; তবে এঁদের ছাড়া নারীদের ইতিবাচক অর্জন ছিলো খুবই কম, কেননা ষোড়শ শতক ভরেও তাদের দেয়া হয় নি শিক্ষা ও অন্যান্য সুযোগসুবিধা।
সতেরো শতকে অবকাশপ্রাপ্ত নারীরা নিজেদের নিয়োগ করেন শিল্পসাহিত্য চর্চায়, উচ্চ সামাজিক স্তরে সংস্কৃতির বিকাশ ঘটতে থাকে বলে তাঁরা সালগুলোতে পালন করতে থাকেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ফ্রান্সে মাদাম দ্য রবিলে, মাদাম দ্য সেভিয়ে, ও অন্যান্য বিপুল খ্যাতিলাভ করেন, এবং অন্যত্র রাণী ক্রিস্তিন, দ্য শুরমান, ও অন্যান্য ছিলেন সমান বিখ্যাত। এসব গুণ ও মর্যাদার ভেতর দিয়ে উচ্চ শ্রেণীর বা খ্যাতিমান নারীরা ঢুকতে শুরু করেন পুরুষের জগতে, শেষে মাদাম দ্য মাইয়তেনর মধ্যে দেখতে পাই সে-পরিস্থিতিতে এ কুশলী নারীর পক্ষে দৃশ্যের আড়ালে থেকে কতোটা প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব। এবং আরো কিছু ব্যক্তিত্ব বাইরের জগতে খ্যাতি লাভ করে মুক্তি পেয়েছিলেন বুর্জোয়া পীড়ন থেকে; দেখা দেয় তখন পর্যন্ত অজ্ঞাত একটি প্রজাতি : অভিনেত্রী। মিঞ্চে প্রথম নারী দেখা গিয়েছিলো ১৫৪৫-এ। এমনকি সতেরো শতকের শুরুতেও অধিকাংশ অভিনেত্রীই ছিলেন অভিনেতাদের স্ত্রী, কিন্তু পরে তারা কর্ম ও ব্যক্তিগত জীবনে স্বাধীন হয়ে ওঠেন। নিনো দ্য লেক্ল ছিলেন অভিজাত গণিকার পরম প্রতিমূর্তি, যিনি তাঁর স্বাধীনতা ও মুক্তিকে নিয়েগিয়েছিলেন চূড়ান্তে, যা অনুমোদিত ছিলো না নারীদের জন্যে।
আঠারো শতকে বাড়তে থাকে নারীস্বাধীনতা। লোকাচার তখনও ছিলো কঠোর : বালিকারা পেতো সামান্য শিক্ষা; তার সাথে কথা না বলেই তাকে বিয়ে দিয়ে দেয়া হতো বা পাঠিয়ে দেয়া হতো সন্ন্যাসিনীদের মঠে। উঠতি মধ্যবিত্তশ্রেণীটি স্ত্রীদের ওপর চাপিয়ে দেয় কড়া নৈতিকতা। তবে বিশ্বরমণীরা যাপন করতে অত্যন্ত কামময় জীবন, এবং উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণীটি সংক্রামিত হয়েছিলো এসব উদাহরণ দিয়ে; সন্ন্যাসিনীদের মঠ বা গৃহ কিছুই আর দমন করতে পারতো না নারীদের। আবারও, এসব স্বাধীনতার বড়ো অংশই ছিলো বিমূর্ত ও নঞর্থক : বিনোদন খোঁজার বেশি কিছু ছিলো না। তবে বুদ্ধিমান ও উচ্চাভিলাষীরা সুযোগ সৃষ্টি করে নিয়েছিলেন। সাল অর্জন করে নতুন গৌরব; নারীরা লেখকদের দিতেন নিরাপত্তা ও প্রেরণা, সৃষ্টি করতেন তাদের পাঠক; তারা পড়তেন দর্শন ও বিজ্ঞান, এবং পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নবিজ্ঞানের জন্যে স্থাপন করেন গবেষণাগার। রাজনীতিতে মাদাম দ্য পপাদর ও মাদাম দু বার-এর নাম দুটি নির্দেশ করে নারীর ক্ষমতা : তাঁরাই আসলে চালাতেন রাষ্ট্র। অভিনেত্রীরা ও নাগরালি করা নারীরা উপভোগ করতেন বিপুল খ্যাতি। এভাবে প্রাচীন ব্যবস্থা জুড়ে যে-নারীরা কিছু করতে চাইতেন, তাঁদের জন্যে সাংস্কৃতিক মণ্ডলই ছিলো সবচেয়ে সুগম্য। তবে তাঁদের কেউই দান্তে বা শেক্সপিয়রের উচ্চতায় পৌছোন নি, এর কারণ তাঁদের পরিস্থিতির সাধারণ নিম্নতা। এ রুম অফ ওয়ান্স অৌন-এ ভার্জিনিয়া উম্ফ শেক্সপিয়রের এক কল্পিত বোনের তুচ্ছ ও নিয়ন্ত্রিত জীবনের সাথে তুলনা করেছেন শেক্সপিয়রের শিক্ষা ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার জীবনের। মাত্র আঠারো শতকে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর এক নারী, মিসেস আফ্রা বেন, একজন বিধবা, পুরুষের মতো লিখে অর্জন করেন জীবিকা। অন্যরা অনুসরণ করেন তার উদাহরণ, তবে এমনকি উনিশ শতকেও তাঁদের অনেকে লুকিয়ে থাকতে বাধ্য হতেন। তাদের এমনকি ‘একটি নিজের ঘরও’ ছিলো না; অর্থাৎ তাঁদের ছিলো না সে-বস্তুগত স্বাধীনতা, যা আন্তর মুক্তির অন্যতম আবশ্যক শর্ত। ভার্জিনিয়া উম্ফ বলেছেন ইংল্যান্ডে নারী লেখকেরা সব সময়ই জাগিয়েছেন শত্রুতা।
সামাজিক ও মননশীল জীবনের মৈত্রির ফলে ফ্রান্সে অবস্থা ছিলো কিছুটা অনুকূল; তবে, সাধারণভাবে, জনমত ছিলো ‘নীলমুজোদের’ প্রতি বিরূপ রেনেসাঁস থেকেই উচ্চবংশীয় ও বুদ্ধিমান নারীরা, এরাসমুস ও অন্যান্য পুরুষের সঙ্গে, নারীদের পক্ষে লিখে এসেছেন। নারীর শত্রুরা অবশ্য চুপ ছিলো না। তারা আবার জাগিয়ে তোলে মধ্যযুগের পুরোনো যুক্তিগুলো, এবং প্রকাশ করে বর্ণমালা, যার প্রতিটি অক্ষরে নির্দেশ করা হয় নারীর একেকটি দোষ। নারীদের মূঢ়তাকে আক্রমণ করার জন্যে দেখা দেয় এক ধরনের লম্পট সাহিত্য–কাবিনে সাতিরিক ইত্যাদি। আর ধার্মিকেরা নারীদের অবজ্ঞা করার জন্যে উদ্ধৃত করতে থাকে সেইন্ট পলকে, গির্জার পিতাদের ও ধর্মযাজকদের।
