আজকাল সবাই একমত যে কামবাতিকগ্রস্ততা দেখা দিতে পারে প্লাতোয়ীরূপে বা যৌনরূপে। এটা ঠিক, বিধাতার প্রতি অতীন্দ্রিয়বাদীর আবেগানুভূতিতে শরীর পালন করতে পারে ছোটো বা বড়ো ভূমিকা। নারীর ভাবোচ্ছ্বাস বিকশিত হয় পার্থিব প্রেমিকার ভাবোচ্ছাসের ছাঁচ ভিত্তি করেই। খ্রিস্ট তার বাহুবন্ধনে ধরে আছেন সেইন্ট ফ্রান্সিসকে, যখন এমন একটি মূর্তির ধ্যান করছিলেন ফোলিগনোর অ্যাঞ্জেলা, তখন খ্রিস্ট অ্যাঞ্জেলাকে বলেন : ‘এভাবেই তোমাকে আমি আলিঙ্গনে বাঁধবো, এবং এর থেকেও অনেক বেশি, যা মচক্ষে দেখা যাবে না… আমি কখনো তোমাকে ত্যাগ। করবো না যদি তুমি আমাকে ভালোবাসো’। মাদাম গুয়ো লিখেছেন : ‘প্রেম আমাকেমুহূর্তের জন্যেও বিশ্রাম দেয় না। আমি তাকে বলি : “হে আমার প্রিয়তম, যথেষ্ট হয়েছে, আমাকে মুক্তি দাও।”… আমি চাই সে-প্রেম, যা অনির্বচনীয় শিহরণ পাঠায় আত্মার ভেতর দিয়ে, সে-প্রেম যা আমাকে মূৰ্ছিত করে … হে বিধাতা, আমি যা অনুভব করছি, তুমি যদি তা অনুভব করতে দিতে চরম কামপরায়ণ নারীদের, তাহলে অবিলম্বে তারা তাদের মিথ্যে সুখ ছেড়ে দিতে এ-প্রকৃত সুখ উপভোগের জন্যে’।
ধার্মিকভাবে কখনো কখনো মনে করা হয় যে ভাষার দীনতাই অতীন্দ্রিয়বাদীকে বাধ্য করে এ-কামপরায়ণ শব্দভাণ্ডার থেকে ধার করতে; কিন্তু তার অধিকারে আছে মাত্র একটি শরীরও; তাই সে পার্থিব প্রেম থেকে শুধু শব্দ ধার করে না, ধার করে শারীরিক প্রবণতাও; কোনো পুরুষের কাছে নিজেকে দান করার সময় সে যে-আচরণ করে, বিধাতাকে দেয়ার জন্যেও তার আছে একই আচরণ। তবে এটা কিছুতেই তার আবেগানুভূতির মূল্য হ্রাস করে না। ফোলিগনোর অ্যাঞ্জেলা যখন তার হৃদয়ের অবস্থা অনুসারে একবার হয়ে ওঠেন ‘মলিন ও কৃশ’, আবার ‘সুডৌল ও রক্তিমাভ’, যখন তিনি এমন তপ্ত অশ্রুপাত করতে থাকেন যে তার ওপর ঠাণ্ডা জল ঢালতে হয়, যেমন আমাদের বলেছেন তার এক জীবনীকার, যখন তিনি অবলুষ্ঠিত হতেন ভূমিতে, তাঁর এ-প্রপঞ্চগুলোকে আদৌ বিশুদ্ধভাবে ‘আধ্যাত্মিক’ বলে গণ্য করতে পারি না; তবে এগুলোকে যদি শুধু তার অতিরিক্ত ‘আবেগপরায়ণতা’র সাহায্যে ব্যাখ্যা করতে যাই, তাহলে আমাদের সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে আফিমচারার ‘নিদ্রাকর গুণ’-এর কাছে দেহ কখনোই বিষয়ীর অভিজ্ঞতার কারণ নয়, কেননা কর্তা নিজেই থাকে তার কর্ম বৈশিষ্ট্যে : কর্তা তার অস্তিত্বের ঐক্যের মধ্যে যাপন করে তার প্রবণতা।
অতীন্দ্রিয়বাদীদের শত্রু ও মিত্র উভয় পক্ষই মনে করে সেইন্ট তেরেসার পরমমাল্লাসমত্ততাগুলোকে কামধমী বলে গণ্য করা হলে তাঁকে নামিয়ে দেয়া হয় মূৰ্ছারোগগ্রস্তের স্তরে। তবে মূৰ্ছারোগগ্রস্তকে যা অধঃপতিত করে, তা এ নয় যে তার শরীর সক্রিয়ভাবে প্রকাশ করে তার আবিষ্টগুলো, বরং এ-ব্যাপার যে সে আবিষ্ট, তার স্বাধীনতা সম্মােহিত ও অকার্যকর। ভারতীয় কোনো ফকির যে-নিয়ন্ত্রণ অর্জন করে তার শরীরের ওপর, তা তাকে তার দেহের দাস করে তোলে না; দৈহিক অনুকৃতি কোনো প্রকৃতিস্থ, সুস্থ চৈতন্যের প্রাণাবেগের উপাদান হতে পারে। সেইন্ট তেরেসার রচনাবলি কোনো সন্দেহের অবকাশ রাখে না, এবং এগুলো যাথার্থ প্রতিপাদন করে বার্নিনির মূর্তিটির, যাতে আমরা দেখতে পাই সন্তটি মূতি হচ্ছেন। পরম ইন্দ্রিয়সুখকরতার আতিশয্যে। তাঁর আবেগকে যদি সরলভাবে ‘কামের পরিশোধন’ হিশেবে ব্যাখ্যা করা হয়, তাহলেও তাতে কম ভুল হয় না; প্রথমে থাকে কোনো অব্যক্ত কামনা, যা পরে রূপ ধারণ করে ঐশী প্রেমের। প্রেমপরায়ণা নিজে প্রথমে এমন কোনো বহীন বাসনার শিকার থাকে না, যা পরে নিবদ্ধ হয় একটি বিশেষ পুরুষের প্রতি প্রেমিকের উপস্থিতিই তার ভেতরে জাগিয়ে তোলে বাসনা, যা সরাসরি ধাবিত হয় প্রেমিকের দিকে। একইভাবে, সেইন্ট তেরেসা একটিমাত্র প্রক্রিয়ায় মিলিত হতে চান বিধাতার সাথে এবং ওই মিলন যাপন করেন তার শরীরের মধ্যে; তিনি তার স্নায়ু ও হরমোনরাশির দাসী নন : প্রশংসা করতেই হয় তার বিশ্বাসের তীব্রতাকে, যা বিদ্ধ করে তার দেহের অন্তরঙ্গতম অঞ্চলগুলোকে।
ঐশী প্রেমে নারী খোঁজে তা-ই, প্রেমপরায়ণা যা খোঁজে একটি পুরুষের মধ্যে : তার আত্মরতির উন্নয়ন; তার ওপর মনোযোগ দিয়ে, কামনার সাথে নিবদ্ধ হয়ে আছে সার্বভৌম স্থিরদৃষ্টিটি, এটা এক অলৌকিক দৈববর। তাঁর প্রথম জীবন ভরে, কিশোরী ও তরুণী রূপে, মাদাম গুয়ো প্রেম ও অনুরাগ লাভের বাসনায় সব সময়ই পেয়েছেন নিদারুণ যন্ত্রণা। একজন আধুনিক প্রোটেস্ট্যান্ট অতীন্দ্রিয়বাদী মাদমোয়াজেল ভি লিখেছেন : ‘আমার প্রতি কেউই বিশেষ আগ্রহ পোষণ করে না বা আমার ভেতরে কী ঘটে চলছে, তার প্রতি সহানুভূতিপরায়ণ নয়, এর থেকে আর কিছুই আমাকে বেশি। অসুখী করে না’। সৎ-বভ মাদাম ক্রুদেনের সম্পর্কে লিখতে গিয়ে বলেছেন যে তিনি কল্পনা করতেন বিধাতা তাঁকে নিয়ে নিরন্তর ব্যাপৃত, এমন হতো যে প্রেমিকের সাথে তীব্র সংকটের মুহূর্তগুলোতে তিনি যন্ত্রণায়আর্তনাদ করে উঠতেন : ‘বিধাতা আমার, আমি কী যে সুখী! আমার সুখের আতিশয্যের জন্যে তোমার কাছে ক্ষমা চাই’। আমরা বুঝতে পারি এটা কতোটা নেশাকর হয়ে ওঠে আত্মরতিবতীর জন্যে, যখন সারা আকাশ হয়ে ওঠে তার দর্পণ; তার দেবত্বপ্রাপ্ত প্রতিবিম্ব হয়ে ওঠে বিধাতার নিজের মতোই অনন্ত, এবং এটা কখনো বিবর্ণ হবে না।
