পুরুষেরা পরস্পরের সাথে পাল্লা দিয়ে ঘোষণা করে যে প্রেম হচ্ছে নারীর পরম সিদ্ধি। ‘যে-নারী ভালোবাসে, নারী হিশেবে সে হয়ে ওঠে আরো নারীধর্মী,’ বলেছেন নিটশে, এবং বালজাক বলেছেন : ‘উৎকৃষ্ট পুরুষের জীবন হচ্ছে খ্যাতি, নারীর জীবন হচ্ছে প্রেম। নারী তখনই সমতুল্য হয়ে ওঠে পুরুষের, যখন সে তার জীবনকে করে তোলে এক বিরতিহীন অর্ঘ্য, যেমন পুরুষের জীবন এক বিরতিহীন কর্ম’। কিন্তু এতে আছে এক নিষ্ঠুর প্রতারণা, কেননা নারী যা দান করে, পুরুষ তা কোনোক্রমেই গ্রহণের জন্যে ব্যগ্র নয়। যেদিন নারীর পক্ষে তার দুর্বলতায় নয় বরং তার শক্তিতে ভালোবাসা সম্ভব হবে, নিজের থেকে পলায়ন নয় বরং নিজেকে লাভ করা সম্ভব হবে, নিজেকে অধঃপতিত নয় বরং নিজেকে জ্ঞাপন করা সম্ভব হবে–সেদিনই পুরুষের। মতো তার জন্যে প্রেম হয়েউঠবে জীবনের এক উৎস এবং তা আর মারাত্মক বিপদ হয়ে থাকবে না। তার আগে প্রেম হচ্ছে নারীর ওপর চেপে থাকা এক ভয়ঙ্কর মর্মস্পর্শী অভিশাপ, যে-নারী বন্দী হয়ে আছে এক নারীর জগতে, যে বিকলাঙ্গ নারী, যে পর্যাপ্ত নয় নিজের জন্যে।
অতীন্দ্রিয়বাদী
দ্বিতীয় খণ্ড । ভাগ ৬ –যাথার্থ্য প্রতিপাদন। পরিচ্ছেদ ৩
প্রেমকে নারীর জন্যে নির্ধারণ করা হয়েছে তার পরম বৃত্তিরূপে, এবং যখন সে এটা চালিত করে একটি পুরুষের দিকে, তখন সে পুরুষটির মধ্যে খোঁজে বিধাতাকে; তবে পরিস্থিতির কারণে সে যদি বঞ্চিত হয় মানবিক প্রেম থেকে, যদি সে হয় ব্যর্থ বা খুঁতখুঁতে, তাহলে সে বিধাতাকে আরাধনা করতে পারে বিধাতার স্বরূপেই। একথা সত্য, অনেক পুরুষও ছিলো, যারা এ-শিখায় জ্বলেছে, তবে তারা বিরল এবং তাদের ঐকান্তিকতা অতিশয় পরিশীলিত মননশীল ঘঁচের; আর সেখানে যে-নারীরা নিজেদের উৎসর্গ করে ঐশী বিবাহের সুখের কাছে, তারা বিপুলসংখ্যক এবং তাদের অভিজ্ঞতা বিশেষভাবেই আবেগী প্রকৃতির। নারী নতজানু হয়ে বেঁচে থাকতে অভ্যস্ত; সাধারণত সে আশা করে তার পরিত্রাণ নেমে আসবে স্বর্গ থেকে, সেখানে পুরুষ অধিষ্ঠিত সিংহাসনে। তারাও মেঘ দিয়ে পরিবেষ্টিত; তাদের শারীরিক উপস্থিতির যবনিকার অন্তরাল থেকে প্রকাশ পায় তাদের রাজকীয় অবয়ব। প্রিয়তমটি কম-বেশি সব সময়ই থাকে অনুপস্থিত; সে দুর্বোধ্য সংকেতের মাধ্যমে যোগাযোগ করে তার পুজোরীর সাথে: নারী তার প্রিয়তমের হৃদয়কে জানে শুধু বিশ্বাসে; নারীর কাছে তাকে যতো বেশি শ্রেষ্ঠ মনে হয়, তার আচরণকে ততো বেশি মনে হয় দুর্ভেদ্য। আমরা দেখেছি কামবাতিকগ্রস্ততায় এ-বিশ্বাস প্রতিরোধ করে সব স্ববিরোধকে। তার পাশে উপস্থিতি বোধের জন্যে নারীর স্পর্শের দরকার পড়ে না, দেখারও দরকার পড়ে না। সে হোক চিকিৎসক, পুরোহিত, বা হোক বিধাতা, নারী অনুভব করবে একই ধরনের প্রশ্নাতীত নিশ্চয়তা, পরিচারিকা হিশেবে সে তার হৃদয়ে গ্রহণ করবে সে-প্রেম, যা উর্ধ্বলোক থেকে বন্যার মতো বয়ে আসবে। পরস্পরমিশ্রিত হয়ে যায় মানবিক প্রেম ও স্বর্গীয় প্রেম, এ-কারণে নয় যে পরেরটি আগেরটির এক শোধিত রূপ, বরং এজন্যে যে প্রথমটি হচ্ছে এক পরমের দিকে, ধ্রুবর দিকে যাত্রা। উভয় ক্ষেত্রেই এটা প্রণয়িনী নারীর অনিশ্চিত অস্তিত্ব থেকে পরিত্রাণ লাভের ব্যাপার, এটা ঘটে সমগ্রের সাথে তার মিলনের মাধ্যমে, যা মূর্ত হয়ে আছে এক পরম পুরুষের মধ্যে।
এ-দ্ব্যর্থতা দর্শনীয় অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাধিগ্রস্ত বা স্বাভাবিকে–যাতে প্রেমিকের ওপর আরোপ করা হয় দেবত্ব, বা বিধাতাকে দেয়া হয়মানবিক বৈশিষ্ট্য।
আমরা এখানে বিবেচনা করছি একটি ব্যাধিগ্রস্তকে। তবে অনেক ভক্তের মধ্যেই আমরা দেখতে পাই এমন তালগোল পাকিয়ে তোলা হয়েছে পুরুষ ও বিধাতার মধ্যে যে তার জট খোলা অসম্ভব। বিশেষ করে স্বীকারোক্তিগ্রহণকারীটি অধিকার করে থাকে পৃথিবী ও স্বর্গের মাঝামাঝি একটি দ্ব্যর্থবোধক স্থান। যখন অনুতাপকারিণী খুলে ধরে তার আত্মা, তখন স্বীকারোক্তিগ্রহণকারীটি মানবিক কানেই তা শোনে, তবে তার স্থিরদৃষ্টি নারীটিকে ঢেকে দেয় এক অতিপ্রাকৃত আলোতে; সে বিধাতার পুরুষ, সে মানুষের অবয়বে উপস্থিত বিধাতা। মাদাম গুয়ো ফাদার ল্য কঁবের সাথে তাঁর সাক্ষাৎকারের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে : ‘মনে হলো যেনো আত্মার গভীর আভ্যন্তর পথ বেয়ে তার থেকে আমার দিকে আসছে ঐশ্বরিক করুণার শক্তি এবং আমার থেকে তার দিকে ফিরে যাচ্ছে এমনভাবে যেনো সে বোধ করছে একই প্রভাব’। ওই সন্ন্যাসীর মধ্যস্থতার কাজ ছিলো মাদাম শুয়োর দীর্ঘকালব্যাপী আত্মার বন্ধ্যাত্ব নিরাময় করা এবং তাঁর আত্মাকে নবঐকান্তিকতায় প্রজ্জ্বলিত করা। তিনি ওই সন্ন্যাসীর সঙ্গে থেকেছেন তার অতীন্দ্রিয়তার মহাপর্ব ভরে। এবং তিনি ঘোষণা করেছেন : ‘এটা শুধু একটা সম্পূর্ণ ঐক্যই ছিলো না; আমি তাকে বিধাতার থেকে পৃথক করতে পারি নি’। একথা বলা হবে অতিসরলীকরণ যে তিনি আসলে প্রেমে পড়েছিলেন একটি পুরুষের এবং ভান করেছিলেন বিধাতাকে ভালোবাসার; তিনি পুরুষটিকে ভালোবাসতেন, কেননা শুয়োর চোখে পুরুষটি ছিলো পুরুষটির থেকে ভিন্ন কেউ। ফার্দিয়েরের রোগিণীর মতোই শুয়ে যা অস্পষ্টভাবে লাভ করতে চেয়েছিলেন, তা হচ্ছে মূল্যবোেধর পরম উৎসধারা। এটাই প্রকৃতপক্ষে যে-কোনো অতীন্দ্রিয়বাদীর লক্ষ্য। নিঃসঙ্গ আকাশের দিকে তার উড়ালের শুরুতে কখনো কখনো পুরুষ মধ্যস্থতাকারী তার উপকারে আসে, তবে পুরুষটি অপরিহার্য নয়। ডান থেকে বাস্তবতাকে, যাদু থেকে কর্মকে, কাল্পনিক থেকে বস্তুনিষ্ঠতাকে সুস্পষ্টভাবে পৃথক করতে না পেরে নারী অনুপস্থিতকে নিজের শরীরে বাস্তবায়িত করার জন্যে থাকে বিশেষভাবে উনুখ। অতীন্দ্রিয়তাবাদ ও কামবাতিকগ্রস্ততাকে কখনো কখনো অভিন্ন করে দেখা হয়, তবে এ-দেখাটা অনেক কম সন্দেহজনক ব্যাপার। কামবাতিকগ্রস্ত নারী বোধ করে সে মূল্যবান হয়ে ওঠে একটি সার্বভৌম সত্তাকে ভালোবাসার মধ্য দিয়ে; পুরুষটি উদ্যোগ গ্রহণ করে কামসম্পর্কে, পুরুষটি যতোটা ভালোবাসা পায় সে ভালোবাসে তার থেকে বেশি; সে তার আবেগ প্রকাশ করে দৃষ্টিগ্রাহ্য তবে গোপন সংকেতের মাধ্যমে। এসবই দেখা যায়অতীন্দ্রিয়বাদীদের মধ্যে।
