অধিকাংশ নারী অতীন্দ্রিয়বাদী বিধাতার কাছে নিজেদের অক্রিয়ভাবে সমর্পণ করে তৃপ্ত হয় না; তারা তাদের দেহ বিনাশ করে সক্রিয়ভাবে নিশ্চিহ্ন করতে চায় নিজেদের। সন্দেহ নেই, সন্ন্যাসী ও পুরোহিতেরা চর্চা করেছে কৃচ্ছব্রতের, তবে যেউন্মত্ত ক্রোধে নারী অবজ্ঞা করে তার দেহকে, তা ধারণ করে বিশেষ ও উৎকট রূপ। তার দেহের প্রতি নারীর মনোভাবের দ্ব্যর্থতার কথা আমরা উল্লেখ করেছি : অবমাননা ও দুঃখভোগের মাধ্যমে সে একে রূপান্তরিত করে একটি শ্রদ্ধা ও গৌরবের বস্তুতে। সম্ভোগের বস্তুরূপে প্রেমিকের কাছে এটি দান করে সে হয়ে ওঠে একটি মন্দির, একটি প্রতিমা; প্রসবের যন্ত্রণায় ছিন্নভিন্ন হয়ে সে সৃষ্টি করে বীরদের। অতীন্দ্রিয়বাদী তার দেহকে পীড়ন করে এর ওপর তার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে; এটিকে শোচনীয় করে তুলে সে এটিকে উন্নীত করে পরিত্রাণের হাতিয়ারের স্তরে। কোনোকোনো সন্ত যে-আতিশয্য করেছেন, তা ব্যাখ্যা করতে হবে এভাবেই। ফোলিগনোর সেইন্ট অ্যাঞ্জেলা আমাদের বলেছেন যে-জলে তিনি কিছুক্ষণ আগে ধুয়েছেন কুষ্ঠরোগীর হাতপা, সে-জল তিনি পান করেছেন আনন্দে :
এ-পানীয় আমাদের এখন সুমিষ্টতায় প্লাবিত করে যে বাড়ি ফেরা পর্যন্ত ওই আনন্দ অনুসরণ করে আমাদের। এতো সুখে আগে কখনো আমি পান করি নি। আমার গলায় আটকে গিয়েছিলো কুষ্ঠরোগীর ঘায়ের এক টুকরো আঁশটে চামড়া। ওটি থেকে মুক্তি পাওয়ার বদলে আমি চেষ্টা করি ওটি গিলে ফেলতে এবং আমি সমর্থ হই। আমার মনে হয় যেনো আমি এই মাত্র অংশ নিয়েছি খ্রিস্টের শেষ ভোজ উপলক্ষে অনুষ্ঠানে। আমাকে প্লাবিত করে যে-উল্লাস, তা আমি কখনো প্রকাশ করতে সমর্থ হবো না।
পরমোল্লাসমত্ততা, স্বপ্নবিভাব, বিধাতার সাথে আলাপ–এ-আন্তর অভিজ্ঞতাই কিছু নারীর জন্যে যথেষ্ট। অন্যরা চাপ বোধ করে তাদের কাজের মাধ্যমে এটা বিশ্বকে জানানোর। কর্ম ও ধ্যানের সম্পর্ক ধারণ করে দুটি ভিন্ন রূপ। সেইন্ট ক্যাথেরিন, সেইন্ট তেরেসা, জোয়ান অফ আর্কের মতো কর্মযোগী নারীরা আছেন, যারা ভালোভাবেই জানেন তাদের মনে আছে কী লক্ষ্য এবং তারা তা অর্জনের চমৎকার উপায়ও উদ্ভাবন করেন।
স্বাধীন নারী
দ্বিতীয় খণ্ড । ভাগ ৭ –মুক্তির অভিমুখে। পরিচ্ছেদ ১
ফরাশি আইন অনুসারে, আনুগত্য আর স্ত্রীর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না, এবং প্রতিটি নারী নাগরিকের আছে ভোটাধিকার; কিন্তু এসব নাগরিক অধিকার রয়ে যায় তাত্ত্বিক, যত দিন না এগুলোর সাথে যুক্ত হয় আর্থনীতিক স্বাধীনতা। পুরুষ ভরণপোষণ করে যে-নারীর স্ত্রী বা বারবনিতা ভোটাধিকার পেয়েছে বলেই সে পুরুষের অধীনতা থেকে মুক্ত, এমন নয়; সামাজিক রীতিনীতি আগের থেকে এখন কম বাধা সৃষ্টি করলেও নেতিবাচক স্বাধীনতা নারীর পরিস্থিতিকে গভীরভাবে পরিবর্তিত করে নি; সে এখনো বাঁধা পড়ে আছে তার দাসত্বের অবস্থায়। নারী-পুরুষকে পৃথক করে রেখেছে যে-দূরত্ব, অর্থকর চাকুরির মাধ্যমেই–নারী সে-দূরত্বের অধিকাংশ পেরিয়ে এসেছে; এবং বাস্তবে এ ছাড়া আর কিছুই নারীর মুক্তির নিশ্চয়তা দিতে পারে না। যখন সে আর পরজীবী নয়, তখন ভেঙে পড়ে তার পরনির্ভরতা ভিত্তি করে গড়ে ওঠা সংশ্রয়; তার ও বিশ্বের মাঝে আর কোনো পুরুষ মধ্যস্থতাকারীর দরকার পড়ে না।
দাসী হিশেবে তার ওপর চেপে আছে যে-অভিশাপ, আমরা দেখেছি, তার কারণ হচ্ছে তাকে কিছু করতে দেয়া হয় না; তাই সে আত্মরতি, প্রেম, বা ধর্মের মাধ্যমে নাছোড়বান্দার মতো লেগে থাকে তার জীবনকে সার্থক করার ব্যর্থ প্রয়াসে। যখন সে হয় উৎপাদনশীল, সক্রিয়, তখন সে পুনরুদ্ধার করে তার সীমাতিক্ৰমণতা; তার কর্মোদ্যোগের মাধ্যমে সে সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করে কর্তা হিশেবে তার মর্যাদা; সে যে-সব লক্ষ্যে কাজ করে, সে অধিকারী হয় যে-অর্থ ও অধিকারের, তা দিয়ে সে তার দায়িত্বরের পরীক্ষানিরীক্ষা করে ও গুরুত্ব বোঝে। বহু নারী এসব সুবিধা সম্পর্কে। সচেতন, এমনকি খুবই সামান্য অবস্থানে আছে যারা, তারাও বোঝে। এক হোটেলের পাথুরে মেঝে মাজতে মাজতে এক ঠিকা-ঝিকে আমি বলতে শুনেছি : ‘আমি কখনো কারো কাছে কিছু চাই নি; আমি নিজেই নিজের সব কিছু করেছি’। একজন রকফেলারের মতোই সে গর্বিত ছিলো নিজের স্বাবলম্বিতা সম্পর্কে। তবে এটা মনে করা ঠিক হবে না যে ভোটাধিকার ও একটি চাকুরিই হচ্ছে সম্পূর্ণ মুক্তি : কাজ করা, আজ, মুক্তি নয়। নারীর অবস্থার বদলের ফলে সামাজিক সংগঠনের বিশেষ পরিবর্তন ঘটে নি; এ-বিশ্ব সব সময়ই ছিলো পুরুষের অধিকারে, পুরুষ একে যে-রূপ দিয়েছে এটি এখনো আছে সে-রূপেই।
যে-সব ব্যাপার নারীর শ্রমের বিষয়টিকে জটিল করে তোলে, সেগুলোর কথা ভুলে গেলে চলবে না। একজন গুরুত্বপূর্ণ ও সুবিবেচক নারী রেনল কারখানাগুলোর নারীদের সম্পর্কে সম্প্রতি একটি পর্যেষণা সম্পন্ন করেছেন; তিনি বিবৃত করেছেন যে কারখানায় কাজের থেকে বাড়িতে থাকতেই তারা বেশি পছন্দ করতো। সন্দেহ নেই যে তারা আর্থনীতিক স্বাধীনতা লাভ করে শুধু একটি শ্রেণীর সদস্য হিশেবে, যেটি আর্থনীতিকভাবে নির্যাতিত; এবং, অন্য দিকে, কারখানায় তাদের কাজ গৃহস্থালির ভার থেকে তাদের মুক্তি দেয় না। অধিকাংশ নারীই মুক্তি পায় না প্রথাগত নারীর জগত থেকে; বস্তুগতভাবে পুরুষের সমান হওয়ার জন্যে তাদের যে-সহায়তা পাওয়া দরকার, তা তারা সমাজের কাছে থেকেও পায় না তাদের স্বামীদের কাছে থেকেও পায় না। শুধু সে-সব নারী, যাদের আছে রাজনীতিক বিশ্বাস, যারা সংঘে জঙ্গি কর্মকাণ্ড গ্রহণ করে, যাদের বিশ্বাস আছে তাদের ভবিষ্যতের ওপর, তারাই শুধু সে-প্রাত্যহিক শ্রমকে দিতে পারে একটা নৈতিক অর্থ, যে-শ্রমে ধন্যবাদও মেলে না। কিন্তু অবকাশহীন, একটা প্রথাগত বশবর্তিতার উত্তরাধিকারী হয়ে, নারীরা সবেমাত্র একটা রাজনীতিক ও সামাজিক বোধের বিকাশ ঘটাতে শুরু করেছে। এবং তাদের কাজের বিনিময়ে তাদের যে-নৈতিক ও সামাজিক সুবিধা ন্যায়সঙ্গতভাবে প্রাপ্য, তা না পেয়ে তারা নিরুৎসাহে নতি স্বীকার করছে এর চাপের কাছে।
