তবে এ-মহিমামণ্ডিত পরম সুখ কদাচিৎ স্থায়ী হয়। কোনো পুরুষই আসলে বিধাতা নয়। অতীন্দ্রিয়বাদী নারী ঐশী অনুপস্থিতির সঙ্গে যে-সম্পর্ক পাতায়, তা। নির্ভর করে একলা তারই অনুভূতির উত্তাপের ওপর; কিন্তু দেবত্বে অধিষ্ঠিত পুরুষটি, যে বিধাতা নয়, উপস্থিত। এবং এ-ঘটনা থেকেই উৎপন্ন হয় প্রণয়িনী নারীর নিদারুণ যন্ত্রণা। তার চরম সাধারণ নিয়তির সারকথা প্রকাশ পেয়েছে জুলি দ্য লেসপিনাসের বিখ্যাত উক্তিতে : ‘সর্বদা, আমার প্রিয় বন্ধু, আমি তোমাকে ভালোবাসি, আমি কষ্ট পাই এবং আমি তোমার অপেক্ষায় থাকি’। এটা সত্য, পুরুষের কাছেও প্রেমের সঙ্গে জড়িত থাকে কষ্ট; তবে তাদের যন্ত্রণাগুলো স্বল্পকালস্থায়ী বা খুব তীব্র নয়। মাদাম রেকমিয়ের জন্যে মরে যেতে চেয়েছিলেন বেঞ্জামিন কনস্ট্যান্ট : তিনি সেরে। উঠেছিলেন এক বারো মাসেই। তেঁদাল বহু বছর আক্ষেপ করেছিলেন মেতিলদের জন্যে, তবে এটা এমন এক আক্ষেপ, যা তাঁর জীবনকে ধ্বংস না করে সুরভিত করে তুলেছিলো। আর সেখানে নারী, অপ্রয়োজনীয়রূপে নিজের ভূমিকা গ্রহণ করে, একটা সামগ্রিক পরনির্ভরতা স্বীকার করে নিয়ে, তার জীবনকে করে তোলে নারকীয়। প্রতিটি প্রণয়িনী নারী নিজেকে দেখতে পায় হ্যান্স অ্যান্ডারসেনের ছোট্ট মৎস্যকন্যার মধ্যে, যে প্রেমে পড়ে নারীর পায়ের সঙ্গে বিনিময় করে নিয়েছিলো তার মাছের লেজ এবং তারপর দেখতে পেয়েছিলো সে হাঁটছে সুচ ও জ্বলন্ত কয়লার ওপর। একথা সত্য নয় যে প্রেমাস্পদ পুরুষটি চূড়ান্তরূপে অত্যাবশ্যক, আকস্মিকতা ও পরিস্থিতির ওপরে, এবং নারীটি তার কাছে আবশ্যক নয়; আসলে পুরুষটি এমন অবস্থানে নেই যে সে যাথার্থ প্রতিপাদন করবে সে-নারীসত্তাটির, যে উৎসর্গিত হয়েছে তার পুজোয়, এবং সে নারীটি দিয়ে আবিষ্ট হওয়াতে সে নিজেকে সম্মত করতে পারে না।
পতিত দেবতা পুরুষ নয় : সে একটা প্রবঞ্চক; সে সত্যিসত্যিই এই রাজা, যে গ্রহণ করছে স্তুতি, এটা প্রমাণ করা ছাড়া প্রেমিকের আর কোনো বিকল্প নেই–বা নিজেকে একটা জবরদখলকারী বলে তাকে স্বীকারোক্তি করতে হবে। যদি সে আর আরাধ্য না হয়, তাহলে তাকে অবশ্যই পায়ে মাড়াতে হবে। সে তার প্রেমিকের ললাটে পরিয়ে দিয়েছে যে-মহিমার জ্যোতিচক্র, তার জন্যেই প্রণয়িনী নারী প্রেমিকের জন্যে নিষিদ্ধ করে যে-কোনো চারিত্রিক ত্রুটি; সে প্রেমিকের যে-মূর্তি তৈরি করেছে, প্রেমিক তা রক্ষা করতে না পারলে সে হতাশ ও বিরক্ত হয়। যদি প্রেমিক ক্লান্তিবোধ করে বা অসতর্ক হয়, যদি তার অসময়ে ক্ষুধা পায় ও তৃষ্ণা লাগে, যদি সে কোনো একটা ভুল করে বা স্ববিরোধিতা করে, তাহলে নারী দাবি করে যে সে আর সে নেই এবং একেই সে দুঃখের একটা কারণে পরিণত করে। এ-পরোক্ষ পথে সে এতোটা যায় যে প্রেমিকের প্রতিটি উদ্যোগ, যা সে সমর্থন করে না, তার জন্যে সে তিরষ্কার করে তার প্রেমিককে; সে বিচারকের বিচার করে, এবং প্রেমিক যে তার প্রভু থাকতে চাইবে, তার সে-স্বাধীনতা সে অস্বীকার করে। প্রেমিকে উপস্থিতির থেকে অনুপস্থিতিতেই অনেক সময় তার পুজোয় পাওয়া যায় বেশি পরিতৃপ্তি; আমরা যেমন দেখেছি, বহু নারী নিজেদের নিবেদন করে মৃত বা অন্য কোনোভাবে অগম্য বীরদের প্রতি, যাতে কখনোই দৈহিকভাবে তাদের মুখোমুখি হতে না হয়, কেননা রক্তমাংসের পুরুষ মারাত্মকভাবে তাদের স্বপ্নের বিপরীত। এ কারণেই জন্মেছে এসব সুখস্বপ্নভঙ্গজাত উক্তি : ‘মোহন রাজকুমারকে বিশ্বাস কোরো না। পুরুষেরা নিতান্তই দীনহীন জীব’, এবং এমন আরো অনেক। তাদের বামন মনে হতো না যদি না তাদের দৈত্য হতে বলা হতো।
প্রথম দিকে প্রণয়িনী নারী উল্লাস বোধ করে তার প্রেমিকের কামনা পরিপূর্ণরূপে চরিতার্থ করে; পরে সেই বিখ্যাত দমকল কর্মীর মতো, যে তার পেশার প্রতি প্রেমে সর্বত্র আগুন লাগিয়েছিলো–সে নিজেকে নিযুক্ত করে এ-কামনা জাগিয়ে তোলার কাজে, যাতে সে তা চরিতার্থ করতে পারে। এ-উদ্যোগে সফল না হলে সে নিজেকে এতো অপমানিত ও অপদার্থ মনে করে যে তার প্রেমিক যে-উষ্ণ আবেগ বোধ করে, তার ভান করে। প্রেমিককে মুগ্ধ করার সুনিশ্চিততম উপায়টি সে পেয়েছে নিজেকে একটি ক্রীতদাসী বানিয়ে। আমরা এখানে দেখতে পাই প্রেমের আরেক প্রতারণামূলক কাজ, যা বহু পুরুষ–উদাহরণস্বরূপ, লরেন্স ও মতেরল–ক্ষুব্ধভাবে অনাবৃত করে দেখিয়েছেন : এটা আসে দানের রূপ ধরে, যদিও আসলে এটা এক স্বৈরাচার। নারীর ওই অতিশয়মহৎ সংরাগ কীভাবে পুরুষকে ঘিরে শেকল জড়ায়, তা আদফএ তিক্ত ভাষায় বর্ণনা করেছেন বেঞ্জামিন কনস্ট্যান্ট। ‘সে তার ত্যাগস্বীকারগুলোর আগে সব কিছু খুঁটিয়ে দেখে নি, কেননা সে ব্যগ্র ছিলো আমাকে ওগুলো গ্রহণে বাধ্য করতে,’ এলিওনোর সম্পর্কে নিষ্ঠুরভাবে বলেছেন তিনি।
গ্রহণ আসলে একটা বাধ্যবাধকতা, যা প্রেমিকের জন্যে এমন একটি শর্ত, যাতে সে যে একজন দাতা তেমন মনে হওয়ারও সুযোগ থাকে না; নারী চায় কৃতজ্ঞতার সঙ্গে প্রেমিক গ্রহণ করবে সে-বোঝা, যার চাপে সে ভেঙেচুরে ফেলে প্রেমিককে। এবং তার স্বৈরাচার চির-অতৃপ্ত। প্রণয়ী পুরুষ স্বৈরাচারপরায়ণ, তবে সে যা চায়, তা পেয়ে গেলে সে তৃপ্তিবোধ করে; আর সেখানে নারীর অত্যধিক দাবিপূর্ণ অনুরক্তির কোনো সীমাপরিসীমা নেই। যে-প্রেমিকের আস্থা আছে তার দয়িতার ওপর, দয়িতা যদি অনুপস্থিত থাকে, তার কাছে থেকে দূরে কোথাও কাজে নিয়োজিত থাকে, তাহলে সে অসন্তোষ বোধ করে না; দয়িতা তারই আছে এ-বোধে নিশ্চিত থেকে সে একটা বস্তুর মালিক হওয়ার থেকে একটি স্বাধীন সত্তার মালিক হতে বেশি পছন্দ করে। নারীর কাছে, এর বিপরীতে, তার প্রেমিকের অনুপস্থিতি সব সময়ই একটা পীড়ন; প্রেমিক একটি চোখ, একজন বিচারক, আর যখনই সে প্রেমিকাকে ছাড়া আর কিছুর দিকে তাকায়, সে হতাশ করে তার প্রেমিকাকে; যা কিছু সে দেখে, তার থেকেই সে প্রেমিকাকে বঞ্চিত করে; যখন সে দূরে থাকে প্রেমিকার থেকে, প্রেমিকাটি একই সঙ্গে অধিকারবঞ্চিত হয় নিজের ও বিশ্বের; এমনকি যখন তার পাশে বসে প্রেমিক পড়ে বা লেখে, তখনও সে প্রেমিকাকে ত্যাগ করছে, তার সাথে বিশ্বাসঘাকতা করছে। সে প্রেমিকের ঘুমকেও ঘৃণা করে। কিন্তু বদলেয়ার দয়ালু হয়ে উঠেছেন তার নারীকে ঘুমন্ত দেখে : ‘তোমার সুন্দর চোখ দুটি ক্লান্ত, আমার নিঃস্ব প্রিয়তমা’; এবং প্রুস্ত মুগ্ধ হয়েছেন আলবার্তিনকে নিদ্রিত দেখে। বিষয়টি এই যে পুরুষের ঈর্ষা হচ্ছে নিতান্ত একান্তভাবে অধিকারের ইচ্ছা; প্রিয়তমা নারী, নিদ্রিত অবস্থায় যে ফিরিয়ে আনে শৈশবের নিরস্ত্র সারল্য, কারো অধিকারে নয়; ওই নিশ্চয়তাই যথেষ্ট। কিন্তু দেবতার, প্রভুর, উচিত নয় সীমাবদ্ধতার ঘুমের কাছে নিজেকে সমর্পণ করা; নারী প্রেমিকের সীমাতিক্ৰমণতাকে দেখে বৈরী দৃষ্টিতে; সে তীব্রভাবে ঘৃণা করে এ-দেহের পাশব জড়তাকে, যা আর তার থাকে না, থাকে নিজের, পরিত্যক্ত থাকে এমন এক আকস্মিকতায়যার মূল্য হচ্ছে তার আকস্মিকতা।
