এ-স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্যে প্রথমে নারী যা চায়, তা হচ্ছে সে সেবা করতে চায় কেননা প্রেমিকের দাবিদাওয়া মেটাতে গিয়ে নারী অনুভব করে যে সে প্রয়োজনীয়; সে সুসংহতি লাভ করবে প্রেমিকের অস্তিত্বের মধ্যে, সে অংশীদার হবে তার প্রেমিকের বিশেষ মূল্যের, তার যাথার্থ্য প্রতিপন্ন হবে। অ্যাঞ্জেলাস সিলেসিউসের মতে এমনকি অতীন্দ্রিয়বাদীরাও বিশ্বাস করে যে বিধাতার মানুষ দরকার; নইলে তারা যে নিজেদের দান করছে, তা বৃথা হয়ে যাবে। পুরুষ যতো দাবি জানাতে থাকে, নারী ততো সন্তোষ বোধ করে। ভিক্তর উগো জুলিয়েত দ্রোর ওপর চাপিয়ে দিয়েছিলেন যে-নিঃসঙ্গতা, তা যদিও ওই তরুণীর জন্যে দুর্বহ হয়ে উঠেছিলো, তবু মনে হয় যেনো তরুণীটি উগোকে মান্য করে সুখই পেতে : উনোনের পাশে থাকা হচ্ছে প্রভুর সুখের জনো কিছু করা। সে চেষ্টা করে উগোর কাছে সদর্থকভাবে প্রয়োজনীয় হয়ে উঠতে। সে উগার জন্যে পছন্দের খাবার তৈরি করে এবং গুছিয়ে রাখে ছোটো একটি বাসা, যেখানে উগো আরাম করতে পারে; সে উগোর কাপড়চোপড়ের যত্ন নেয়। ‘আমি চাই তুমি যতোটা পারো তোমার কাপড়চোপড় ছেড়ো’, উগগাকে সে লেখে, ‘এবং আমি নিজে সেগুলো শেলাই করতে ও ধুতে চাই’।
কোনো মহাসংরাগের প্রথম দিকের দিনগুলোতে নারীটি হয়ে ওঠে আগের থেকে সুশ্রী, অনেক বেশি রুচিশীল : ‘যখন আদেল আমার চুল বাঁধে, আমি তাকিয়ে থাকি আমার ললাটের দিকে, কেননা তুমি এটি ভালোবাসো’, লিখেছেন মাদাম দআগল। এই মুখ, এই দেহ, এই ঘর, এই আমি–সে এ-সবের জন্যে পেয়েছে একটি লক্ষ্য ও যাথার্থ্য প্রতিপাদন, সে এগুলোকে হৃদয়ে পোষণ করে এ-প্রিয় মানুষটির মধ্যস্থতায়, যে তাকে ভালোবাসে। কিন্তু কিছু পরে সে ত্যাগ করে সব ছলাকলা; যদি তার প্রেমিক চায়, তাহলে সে বদলে ফেলে সে-ভাবমূর্তি, প্রথম দিকে যা ছিলো প্রেমের থেকেও মূল্যবান; সে এতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে; সে যা, তার যা আছে, তার সব কিছুকে সে পরিণত করে প্রভুর প্রজায়; যাতে তার প্রেমিকের আগ্রহ নেই, সে ত্যাগ করে সেসব। প্রেমিকের প্রতি সে উৎসর্গ করে প্রতিটি হৃদস্পন্দন, তার প্রতিটি রক্তবিন্দু, তার অস্থির মজ্জা; এবং এটাই প্রকাশ পায় শহিদত্বলাভের স্বপ্নের মধ্যে : উৎপীড়ন বরণ। করেও, মৃত্যুবরণ করেও সে বাড়িয়ে দেবে তার দান, সে হয়ে উঠবে তার প্রেমিকের পদতলের ভূমি। প্রেমিকের কাছে যা কিছু অপ্রয়োজনীয়, সে পাগলের মতো ধ্বংস করে সে-সব। নিজেকে সে যে-দান হিশেবে দিয়েছে, তা সর্বান্তকরণে গৃহীত হলে কোনো মর্ষকাম দেখা দেয় না; এর সামান্যই দেখা যায়, উদাহরণ হিশেবে, জুলিয়েত দ্রোর মধ্যে। ভক্তির আতিশয্যে সে কখনো কখনো নতজানু হয়েছে কবির প্রতিকৃতির সামনে এবং যদি সে কখনো কোনো অপরাধ করে থাকে, তার জন্যে ক্ষমা ভিক্ষা করেছে; সে নিজের ওপর ক্রোধ বোধ করে নি।
যে-নারী পুরুষের খেয়ালখুশির কাছে নিজেকে সমর্পণ করে সুখ পায়, তার ওপর চালানো স্বৈরাচারের মধ্যে একটি সার্বভৌম স্বাধীন সত্তার সুস্পষ্ট কর্মের প্রতি সে। মুগ্ধতাও বোধ করে। উল্লেখ করা দরকার যে যদি কোনো কারণে প্রেমিকের মর্যাদা লোপ পায়, তাহলে তার ঘুষি ও যাচ্ঞাগুলো হয়ে ওঠে ঘৃণ্য; সেগুলো শুধু তখনই মহার্ঘ, যখন সেগুলো প্রকাশ করে প্রেমাস্পদের দেবত্ব। ওগুলো তা প্রকাশ করলে সে নিজেকে আরেকজনের স্বাধীন ক্রিয়ার শিকার বলে বোধ করে পায় মাদকতাপূর্ণ আনন্দ। আরেকজনের পরিবর্তনশীল ও কর্তৃত্বব্যঞ্জক ইচ্ছের মাধ্যমে নিজের যাথার্থ প্রতিপাদনকে একটি অস্তিত্বশীলের কাছে মনে হয় এক অতিশয় বিস্ময়বিহ্বলকর রোমাঞ্চকর কর্ম বলে; সব সময় একই চামড়ায় থাকা ক্লান্তিকর, এবং অন্ধ আনগত্যই মানুষের জ্ঞাত আমূল রূপান্তরের একমাত্র সুযোগ। তার প্রেমিকের ক্ষণকালীন স্বপ্ন, তার কর্তৃত্বপরায়ণ আদেশ অনুসারে নারী তাই হয়ে ওঠে ক্রীতদাসী, রাণী, পুষ্প, হরিণী, স্বচ্ছ রঙমিশ্রিত কাচের জানালা, খেয়ালি, দাসী, বারবনিতা, শিল্পদেবী, সহচরী, মা, বোন, সন্তান। যতো কাল সে বোঝে না যে সব সময়ই তার ঠোটে লেগে ছিলো। আনুগত্যের পরিবর্তনহীন স্বাদ, ততো কাল সে বিমুগ্ধচিত্তে নিজেকে সমর্পণ করে এসব রূপান্তরের কাছে। প্রেমের স্তরে, যেমন কামের স্তরে, এটা সুস্পষ্ট যে মর্ষকাম হচ্ছে সে-ঘুরপথগুলোর একটি, যে-পথে যায় অতৃপ্ত নারীরা, যারা হতাশ প্রেমে ও কামে এবং নিজের ওপর; তবে এটা সময়গাপযোগী দাবিত্যাগের স্বাভাবিক প্রবণতা নয়। মর্ষকাম অহংয়ের বিদ্যমানতাকে চিরস্থায়ী করে রাখে এক ক্ষতবিক্ষত ও অধঃপতিত অবস্থার মধ্যে প্রেম অপরিহার্য কর্তার অনুকূলে আনে আত্ম-বিস্মৃতি।
মানবিক প্রেমের পরম লক্ষ্য, অতীন্দ্রিয় প্রেমের মতোই, প্রিয়তমের সঙ্গে অভিন্নতাবোধ। প্রিয়তমের চৈতন্যে আছে মূল্যবোধের মানদণ্ড, বিশ্বের সত্য; তাই তার সেবা করাই যথেষ্ট নয়। প্রণয়িনী নারী প্রেমিকের চোখ দিয়ে দেখতে চেষ্টা করে; প্রেমিক যে-সব বই পড়ে সে পড়ে সে-বই, সে পছন্দ করে সে-সব ছবি ও সঙ্গীত, যা প্রেমিক পছন্দ করে; সে শুধু সে-সব ভূদৃশ্যের প্রতিই আগ্রহ বোধ করে যা সে দেখে প্রেমিকের সাথে, সে আগ্রহ বোধ করে সে-সব ভাবনাচিন্তার প্রতি যা আসে প্রেমিকের কাছে থেকে; সে গ্রহণ করে তার বন্ধুদের, তার শত্রুদের, তার মতামত; যখন সে। নিজেকে প্রশ্ন করে, তখন সে শুধু প্রেমিকের উত্তরটিই শুনতে চায়; সে নিশ্বাসে নিতে চায় সে–বায়ু, প্রেমিক যা এরই মাঝে নিশ্বাসে নিয়েছে; যে-সব ফল ও ফুল প্রেমিকের হাত দিয়ে আসে নি, তার কাছে সে-সবের কোনো স্বাদ ও সুগন্ধ নেই। তার। স্থানবোধও বিপর্যস্ত হয় : সে যেখানে আছে, তা আর বিশ্বের কেন্দ্র নয়, বরং তার প্রেমিক যেখানে আছে, সেটিই বিশ্বের কেন্দ্র; সব পথই তার প্রেমিকের গৃহমুখি এবং সেখান থেকে বেরিয়ে আসে সব পথ। সে ব্যবহার করে তার প্রেমিকের ভাষা, অনুকরণ করে তার অঙ্গভঙ্গি, আয়ত্ত করে তার বাতিক ও তার মুখের খিচুনি। ‘আমি হিথক্লিফ’, বলে উদারিং হাইটস-এর ক্যাথেরিন; এটাই সব প্রণয়িনী নারীর আর্তনাদ; সে তার প্রিয়তমের এক প্রতিমূর্তি, তার প্রতিফলন, তার ডবল : সে হচ্ছে সে (প্রেমিক)। সে তার নিজের বিশ্বকে আকস্মিকতায় ভেঙে পড়তে দেয়, কেননা সত্যিকারভাবে সে বাস করে তার প্রেমিকের বিশ্বে।
