আমরা দেখেছি সঙ্গমে নারীর দরকার পড়ে সুগভীর আত্মবিসর্জন; সে স্নাত হয় অক্রিয় অবসন্নতায়; নিমীলিত চোখে সে নামপরিচয়হীন, বিলুপ্ত, তার মনে হয় যেনো সে ভেসে যাচ্ছে ঢেউয়ে, বিক্ষিপ্ত হচ্ছে ঝঞায়, ঢেকে যাচ্ছে অন্ধকারে : মাংস, জরায়ু, কবরের অন্ধকার। নিশ্চিহ্ন হয়ে এক হয়ে ওঠে সে সমগ্রের সাথে, বিলুপ্ত হয়ে যায় অহং। তবে পুরুষটি যখন তার থেকে সরে যায়, সে নিজেকে ফিরে আবার দেখতে পায় পৃথিবীতে, শয্যায়, আলোতে; সে আবার একটি নাম পায়, মুখমণ্ডল পায় : সে পরাস্ত একজন, শিকার, বস্তু।
এটা এমন এক মুহূর্ত, যখন প্রেম হয়ে ওঠে এক আবশ্যিকতা। দুধ ছাড়ার পর শিও যেমন খোঁজে তার পিতামাতার আশ্বস্তকর দৃষ্টি, তেমনি নারী পুরুষটির প্রেমময় অনুভবের মধ্যে বোধ করে সে এখনো এক হয়ে আছে সমগ্রের সাথে, যার থেকে তার মাংস বেদনাদায়কভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এমনকি পুলক লাভ করলেও নারী খুব। কম সময়ই পরিপূর্ণরূপে পরিতৃপ্ত হয়, সে তার মাংসের যাদুমন্ত্র থেকে পুরোপুরি মুক্তি পায় না; প্রীতিরূপে তার বাসনা চলতেই থাকে। তাকে সুখ দিয়ে পুরুষটি বাড়িয়ে তোলে তার আসক্তি, পুরুষটি তাকে মুক্তিদান করে না। পুরুষটির দিক থেকে, সে আর নারীটিকে কামনা করে না; কিন্তু নারীটি তার এ-ক্ষণিক ঔদাসীন্যকে ক্ষমা করবে যদি না পুরুষটি তার প্রতি নিবেদন করে কোনো চিরন্তন ও পরম আবেগ। তখন ওই মুহূর্তটির সীমাবদ্ধতা লাভ করে সীমাতিক্ৰমণতা; তীব্র স্মৃতিগুলো আর মনস্তাপ হয়ে থাকে না, বরং হয়ে ওঠে মূল্যবান সুখ; সুখের হ্রাসপ্রাপ্তি হয়ে ওঠে আশা ও প্রতিশ্রুতি; প্রতিপন্ন হয় আনন্দভোগের যাথার্থ্য; নারী সগৌরবে মেনে নিতে পারে তার কামকে, কেননা সে একে অতিক্রম করে যায়; উত্তেজনা, আনন্দ, কামনা আর মানসিক অবস্থারূপে থাকে না, বরং হয়ে ওঠে হিতসাধন; তার দেহ আর বস্তু নয় :এটি একটি স্তোত্র, একটি শিখা।
তারপর সংরাগের সাথে সে নিজেকে সমর্পণ করতে পারে কামের যাদুর কাছে; অন্ধকার হয়ে ওঠে আলো; তখন প্রণয়িনী নারী মেলতে পারে তার চোখ, তাকাতে পারে সে-পুরুষের দিকে, যে তাকে ভালোবাসে এবং যার দৃষ্টি তাকে গৌরবান্বিত করে; তার মাধ্যমে শূন্যতা হয়ে ওঠে অস্তিত্বের পূর্ণতা, এবং অস্তিত্ব হয়ে ওঠে মূল্যবান; সে আর ছায়ার সমুদ্রে নিমজ্জিত হয় না, বরং উড়তে থাকে পাখায় ভর করে, ওঠে সুউচ্চ আকাশমণ্ডলে। ক্ষান্তি হয়ে ওঠে পবিত্র তুরীয়ানন্দ। যখন নারী গ্রহণ করে তার প্রিয়তমকে, তখন নারীর ওপর সেভাবে অধিষ্ঠিত হয়, নারী সেভাবে সাক্ষাৎ লাভ করে, যেভাবে কুমারী মেরির ওপর ভর করেছে, কুমারী মেরি সাক্ষাৎ লাভ করেছে পবিত্র প্রেতের, যেভাবে ধর্মবিশ্বাসী লাভ করে খ্রিস্টান্ন। এটাই ব্যাখ্যা করে ধর্মীয় স্তোত্র ও কামগীতির অশ্লীল সাদৃশ্য; এমন নয় যে অতীন্দ্রিয় প্রেমের সব সময়ই থাকে একটা যৌন চরিত্র, বরং ঘটনা হচ্ছে প্রণয়িনী নারীর কাম রঞ্জিত থাকে অতীন্দ্রিয়বাদে। ‘আমার বিধাতা, আমার আরাধ্য, আমার প্রভু ও পালক’–একই শব্দরাশি ঝরে পড়ে নতজানু সন্তের এবং শয্যায় প্রণয়িনী নারীর ওষ্ঠ থেকে; এক নারী তার মাংস নিবেদন করে খ্রিস্টের বজ্রের কাছে, সে তার হাত বাড়িয়ে দেয়। কুশের কলঙ্কদাগ গ্রহণের জন্যে, সে চায় স্বর্গীয় প্রেমের জ্বলন্ত উপস্থিতি; অন্যজনও অর্ঘ্যদান করে ও অপেক্ষা করে; বন্ধু, তীব্রবেগ, বাণ মূর্ত হয়ে ওঠে পুরুষের যৌনাঙ্গে। উভয় নারীতেই থাকে একই স্বপ্ন, শৈশবপ্ন, অতীন্দ্রিয় স্বপ্ন, প্রেমের স্বপ্ন : অপরের মধ্যে নিজেকে লুপ্ত করে পরম অস্তিত্ব অর্জনের স্বপ্ন।
অনেক সময় এটা দাবি করা হয়েছে যে নিশ্চিহ্নকরণের এ-বাসনা চালিত করে। মর্ষকামের দিকে। কিন্তু আমি কামের প্রসঙ্গে যেমন উল্লেখ করেছি, একে মর্ষকাম বলা যেতে পারে শুধু তখনই যখন আমি চেষ্টা করি ‘বস্তু হিশেবে আমার নিজের অবস্থান দিয়ে মুগ্ধ হতে, অন্যদের সংঘটনার মাধ্যমে’; অর্থাৎ বলা যায় যখন বিষয়ীর চৈতন্য পেছনমুখো হয়ে চালিত হয় অহংয়ের দিকে, একে হীনাবস্থায় দেখার জন্যে। এখন, প্রণয়িনী নারী একান্ত ও সম্পূর্ণরূপে তার অহংয়ের সাথে অভিন্ন আত্মরতিবতী নয়; সে বোধ করে নিজেকে অতিক্রম করার এক সংরক্ত বাসনা এবং যার প্রবেশাধিকার আছে অনন্ত বাস্তবে, তার সহযোগিতায় সে হতে চায় অনন্ত। নারী নিজেকে রক্ষা করার জন্যে নিজেকে বিসর্জন করে প্রেমে; তবে মূর্তিপুজোরী প্রেমের স্ববিরোধ এখানে যে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করতে গিয়ে পরিশেষে সে নিজেকে অস্বীকার করে শোচনীয়ভাবে। তার অনুভূতিগুলো লাভ করে এটি অতীন্দ্রিয় মাত্রা; তার বিধাতা তার অনুরাগী থাকুক ও তাকে অনুমোদন করুক, এটা আর তার দরকার পড়ে না; সে মিশে যেতে চায় তার সাথে, নিজেকে ভুলে যেতে চায় তার বাহুবন্ধনে। ‘আমি হতে চাই প্রেমের সন্ত’, লিখেছেন মাদাম দ’আগল। ‘এ-উন্নয়ন ও তপশ্চর্যাপূর্ণ ক্ষিপ্ততার মুহূর্তে আমি লাভ করতে চাই শহিদত্ব’। এসব কথা থেকে যা বেরিয়ে আসে, তা হচ্ছে যে-সীমারেখা পৃথক করে রাখে তাকে ও তার প্রিয়তমকে, সে-সীমারেখা বিলুপ্ত করে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করার বাসনা। এখানে মর্ষকামের কোনো ব্যাপার নেই, আছে এক পরমোল্লাসদায়ক মিলনের স্বপ্ন।
