আমি যতো বোকামির কর্ম ও ভালো কাজ করেছি, সেগুলোর পেছনে আছে একই কারণ; একটি বিশুদ্ধ ও আদর্শ প্রেমের জন্যে আকাঙ্খা, যাতে আমি পুরোপুরি দান করতে পারি নিজেকে, আমার নিজের সত্তার ভার তুলে দিতে পারি আরেকজনের, বিধাতা, পুরুষ, বা নারীর, হাতে, যিনি আমার থেকে এতো শ্রেষ্ঠ যে জীবনে আমি কী করবো, তা আর আমার ভাবার দরকার পড়বে না বা নিজেকে রক্ষা করতে হবে না… এমন একজন, যাঁকে মান্য করা যায় অন্ধভাবে ও আস্থার সঙ্গে… যিনি আমাকে লালন করবেন এবং আলতোভাবে ও প্রেমময়ভাবে নিয়ে যাবেন উৎকর্ষের দিকে। আমি কী যে ঈর্ষা করি মেরি ম্যাগডালেন ও জেসাসের আদর্শ প্রেমকে : একজন পূজ্য ও যোগ্য প্রভুর অতিশয় আকুল ভক্ত হওয়ার জন্যে; আমার দেবমূর্তি, তার জন্যে বাঁচতে ও মরতে, পশুর ওপর অবশেষে দেবদূতের জয় লাভের জন্যে, তাঁর সুরক্ষাপূর্ণ বাহুতে আশ্রয় নিতে, এতে ক্ষুদ্র, তাঁর প্রেমময় যত্নের মধ্যে এতো বিলুপ্ত, এতো পূর্ণাঙ্গভাবে তার যে আমার আর অস্তিত্ব নেই।
বহু উদাহরণ আমাদের ইতিমধ্যেই দেখিয়েছে যে আত্মনিশ্চিহ্নকরণের এ-স্বপ্ন আসলে বেঁচে থাকার এক লোলুপ ইচ্ছে। সব ধর্মেই বিধাতার পুজোর সাথে মিশে থাকে পুজোরীর নিজের পরিত্রাণের বাসনা; নারী যখন নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পণ করে তার আরাধ্যের কাছে, তখন নারীটি আশা করে পুরুষটি তাকে একই সাথে দেবে তার নিজের ওপর নিজের দখল ও পুরুষটি যে-বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব করে, তার অধিকার। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম সে প্রেমিকের কাছে চায় তার অহংয়ের সত্যতা প্রতিপাদন ও উন্নয়ন। বহু নারী প্রেমের কাছে নিজেদের সমর্পণ করে না, যদি না তার বদলে তারা প্রেম পায়; এবং কখনো কখনো তাদের প্রতি যে-প্রেম দেখানো হয়, তা-ই তাদের প্রেম জাগানোর জন্যে যথেষ্ট। পুরুষের চোখে তাকে যেমন দেখাবে তরুণী নিজেকে স্বপ্নে দেখেছে সেভাবে, এবং নারীটি বিশ্বাস করে অবশেষে পুরুষের চোখেই সে খুঁজে পেয়েছে নিজেকে।
মিডলটন মারিকে লেখা চিঠিগুলোর একটিতে ক্যাথেরিন ম্যান্সফিল্ড লিখেছেন যে তিনি এইমাত্র একটা দুর্দান্ত উজ্জ্বল বেগুনি রঙের কর্সেট কিনেছেন; সাথে সাথে তিনি যোগ করেছেন : ‘খুবই দুঃখের কথা যে এটা দেখার জন্যে কেউ নেই!’ নিজেকে পুষ্প, সুগন্ধি, রত্ন বলে অনুভব করা, কিন্তু সেটি কারো বাসনার বস্তু নয়, এর চেয়ে বেশি যাতনার বিষয় আর কিছু হতে পারে না : এটা কেমন সম্পদ, যা আমাকে। সমৃদ্ধ করে না এবং কেউ চায় না যার দান? প্রেম হচ্ছে সে-ছবি পরিস্ফুটকারী, যে ঘোলাটে নেগেটিভকে পরিস্ফুট করে সুস্পষ্ট অনুপুঙ্খ পজিটিভরূপে, নইলে এটা একটি শূন্য আলোকসম্পাতের মতোই মূল্যহীন। নারীর মুখমণ্ডল, তার দেহের বাঁকগুলো, তার শৈশবের স্মৃতিপুঞ্জ, তার পূর্বতন অশ্রুরাশি, তার গাউন, তার অভ্যস্ত পথ, তার বিশ্ব, তার যা কিছু আছে, যা কিছু তার অধিকারে, প্রেমের ভেতর দিয়ে সে-সব মুক্তি পায় অনিশ্চয়তা থেকে এবং হয়ে ওঠে প্রয়োজনীয় : তার দেবতার বেদিমূলে সে একটি বিস্ময়কর অর্ঘ্য।
শুধু প্রেমেই নারী কাম ও আত্মরতির মধ্যে মিলন ঘটাতে পারে বৈরিতামুক্তভাবে; আমরা দেখেছি এ-আবেগগুলো এমন বিপরীত যে তার যৌন নিয়তির সাথে খাপ খাওয়ানো নারীর পক্ষে খুবই কঠিন। নিজেকে একটি শারীর বস্তুতে পরিণত করা, আরেকজনের শিকারে পরিণত করা, তার আত্মপুজোর সাথে বিসঙ্গত : তার মনে হয় আলিঙ্গন তার দেহকে বিবর্ণ ও কলুষিত করে বা অধঃপতিত করে তার আত্মাকে। এজন্যেই কিছু নারী শরণ নেয় কামশীলতার, তারা মনে করে এভাবেই রক্ষা করতে পারবে তাদের অহংয়ের শুদ্ধতা। অন্যরা বিশ্লিষ্ট করে নেয় পাশবিক সুখ থেকে উন্নত আবেগকে। স্টেকেলের এক রোগিণী তার শ্রদ্ধেয় ও বিখ্যাত স্বামীর সাথে ছিলো কামশীতল, এবং তার মৃত্যুর পর, একজন সমতুল্য শ্রেষ্ঠ পুরুষ, একজন মহৎ সঙ্গীতস্রষ্টা, যাকে সেআন্তরিকভাবে ভালোবাসতো, তার সাথেও ছিলো কামশীতল। কিন্তু হঠাৎ একটি স্কুল, বর্বর বনরক্ষকের সাথে সে লাভ করে পরিপূর্ণ শারীরিক তৃপ্তি, ‘এক বন্য নেশাগ্রস্ততার পর দেখা দেয় এক অবর্ণনীয় ঘৃণা’, যখন সে তার প্রেমিকের কথা ভাবে। স্টেকেল মন্তব্য করেছেন ‘অনেক নারীর জন্যে পাশবিকতায় নেমে যাওয়া পুলকের আবশ্যক শর্ত’। এ-ধরনের নারীরা শারীরিক প্রেমে দেখতে পায় এক অধঃপতন, যা অসমঞ্জস শ্রদ্ধাবোধ ও প্রীতির সাথে।
অন্য নারীদের মধ্যে, উল্টোভাবে, পুরুষটির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, প্রীতি, ও অনুরাগই শুধু পারে অধঃপতনের বোধ দূর করতে। সে-পুরুষের কাছে তারা নিজেদের সমর্পণ করে না, যদি না তারা বিশ্বাস করে যে পুরুষটি তাদের ভালোবাসে গভীরভাবে। দৈহিক সম্পর্ককে আনন্দের বিনিময় হিশেবে গণ্য করার জন্যে, যা দিয়ে উভয় সাথীই সমভাবে উপকৃত হয়, এটা বোধ করার জন্যে নারীর থাকা দরকার যথেষ্ট পরিমাণে সিনিসিজম, ঔদাসীন্য, বা গর্ববোধ। নারীর সমপরিমাণেই সম্ভবত তার থেকেও বেশি–পুরুষ বিদ্রোহী হয়ে ওঠে তার বিরুদ্ধে, যে তাকে যৌন শোষণ করতে চায়; তবে সাধারণত নারীই বোধ করে যে তার সঙ্গীটি তাকে ব্যবহার করছে একটি করণরূপে। আর কিছুই নয়, শুধু অতিশয় প্রশস্তিবোধই পারে সে-কর্মের গ্লানির ক্ষতিপূরণ করতে, যাকে নারী একটি পরাজয় বলে মনে করে।
