আমরা যেমন দেখেছি, কিশোরী মেয়ে প্রথমে নিজেকে অভিন্ন করে তুলতে চায় পুরুষের সাথে; যখন সে এটা ছেড়ে দেয়, তখন সে পুরুষদের পুরুষত্বের অংশীদার হতে চায় তাদের একটিকে তার প্রেমে আবদ্ধ করে; এমন নয় যে সে আকৃষ্ট হয়। এটির বা ওটির ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের প্রতি; সে প্রেমে পড়ে সর্বসাধারণ পুরুষের। অবশ্য পুরুষটিকে হতে হয় তার শ্ৰেণীর ও জাতির, কেননা এ-কাঠামোর মধ্যেই চলে কামের খেলা। পুরুষকে নরদেবতা হতে হলে প্রথমে তাকে হতে হবে মানুষ, আর ঔপনিবেশিক কর্মকর্তার কন্যার কাছে উপনিবেশের আদিবাসীরা মানুষ নয়। কোনো তরুণী যদি নিজেকে দান করে কোনো ‘নিকৃষ্ট’-এর কাছে, তাহলে সে তা করে একারণে যে সে নিজেকে অধঃপতিত করতে চায়, কেননা সে বিশ্বাস করে সে কারো প্রেম লাভের অনুপযুক্ত; তবে স্বাভাবিকভাবে সে খোঁজে থাকে এমন একটি পুরুষের, যে তার কাছে পুরুষের শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক। অবিলম্বে সে বুঝে ফেলে যে অনুগ্রহপ্রাপ্ত লিঙ্গের অনেকেই দুঃখজনকভাবে ঘটনাচক্ৰজাত ও পার্থিব, তবে প্রথম দিকে তার অনুমানগুলো থাকে পুরুষের অনুকূলেই। সরল তরুণী মুগ্ধ হয় পৌরুষের ছটায়, এবং তার দৃষ্টিতে পুরুষের যোগ্যতা, পরিস্থিতি অনুসারে, প্রতিভাত হয় শারীরিক শক্তিতে, আচরণের আভিজাত্যে, ধনসম্পদে, সংস্কৃতিতে, বুদ্ধিতে, কর্তৃত্বে, সামাজিক মর্যাদায়, সামরিক উর্দিতে; তবে সে যা সব সময় চায়, তা হচ্ছে তার প্রেমিক হবে পুরুষত্বের সারসত্তার প্রতীক।
ঘনিষ্ঠতা প্রায়ই পুরুষের মর্যাদা বিনষ্ট করার জন্যে যথেষ্ট; এটা ধসে পড়তে পারে প্রথম চুম্বনেই, বা দৈনন্দিন সাহচর্যে, বা বিয়ের রাত্রিতে। তবে দূরে দূরে থেকে ভালোবাসা হচ্ছে নিতান্তই একটা উদ্ভট কল্পনা, তা প্রকৃত অভিজ্ঞতা নয়। প্রেমের জন্যে কামনা তখনই শুধু হয়ে ওঠে সংরক্ত প্রেম, যখন তা শারীরিকভাবে চরিতার্থ হয়। এর বিপরীতে, দৈহিক সঙ্গম থেকে উদ্ভূত হতে পারে প্রেম; এ-ক্ষেত্রে কামগতভাবে অধীনস্থ নারীটির কাছে পুরুষটি প্রতিভাত হয় অসাধারণ বলে, যাকে প্রথমে নারীটির কাছে মনে হয়েছিলো খুবই তুচ্ছ।
তবে এটা প্রায়ই ঘটে যে কোনো নারী যে-সমস্ত পুরুষকে জানে, তাদের কারো ওপরই দেবত্ব আরোপ করতে সে সফল হয় না। সাধারণত যা ধারণা করা হয়ে থাকে, তার থেকে নারীর জীবনে প্রেমের স্থান অনেক কম। স্বামী, সন্তান, গৃহ, হাস্যকৌতুক, সামাজিক দায়িত্ব, অহমিকা, কাম, কর্মজীবন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অধিকাংশ নারী স্বপ্ন দেখে একটা মহাপ্রেমের, একটা আত্মবিবশকর প্রেমের। তারা এর বিকল্পের সাথে পরিচিত হয়েছে, তারা এর কাছাকাছি এসেছে; এটা তাদের কাছে এসেছে আংশিক, ক্ষতবিক্ষত, হাস্যকর, অশুদ্ধ, মিথ্যে রূপ ধরে; তবে খুব কম নারীই এর প্রতি উৎসর্গ করেছে তাদের জীবন। সে-সব নারীই সাধারণত হয় মহাপ্রেমিকা, যারা কৈশোরিক প্রেমে নিজেদের লক্ষ্যহীনভাবে অপচয় করে নি; তারা প্রথমে মেনে নিয়েছে নারীর প্রথাগত নিয়তি : স্বামী, গৃহ, সন্তান; অথবা অরা বেছে নিয়েছে নির্মম নিঃসঙ্গতা; বা তারা নির্ভর করেছে কোনো কর্মোদ্যোগের ওপর যা কম-বেশি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। যখন তারা কোনোশ্রেষ্ঠ ব্যক্তির কাছে জীবন উৎসর্গ করে তাদের ব্যর্থ জীবনকে পুনরুদ্ধার করার সুযোগ দেখতে পায়, তখন তারা মরিয়া হয়ে এআশার প্রতি নিয়োগ করে নিজেদের। মাদমোয়াজেল আইসি, জুলিয়েত দ্ৰো, ও মাদাম দআগল ছিলেন তিরিশ বছর বয়সের কাছাকাছি, যখন শুরু হয় তাঁদের প্রেম-জীবন, জুলি দ্য লেসপিনাস ছিলেন চল্লিশের কাছাকাছি। মূল্যবান মনে হতে পারে এমন আর কোনোলক্ষ্যই তখন তাদের সামনে ছিল না, প্রেমই ছিলো তাঁদের কাছে একমাত্র মুক্তির পথ।
এমনকি স্বাধীনতা বেছে নিতে পারলেও অধিকাংশ নারীর কাছে এ-পথটিকেই মনে হয় আকর্ষণীয় : নিজের জীবনের ভার নেয়া নারীর কাছে যন্ত্রণাদায়ক। বয়ঃসন্ধিকালে এমনকি পুরুষও পথনির্দেশ, শিক্ষা, মাতৃসুলভ লালনের জন্যে বয়স্ক নারীর মুখাপেক্ষী। হতে ইচ্ছুক হয়; কিন্তু প্রথানুগ মনোভাব, বালকের প্রশিক্ষণ, এবং তার নিজের আন্তর প্রণোদনা পরিশেষে তাকে বারণ করে অধিকার ত্যাগের সহজ সমাধান গ্রহণ করে পরিতৃপ্ত বোধ করতে; তার কাছে বয়স্ক নারীর সঙ্গে এ-ধরনের সম্পর্ক নিতান্তই তার পথযাত্রার একটি পর্ব। পুরুষের এটা এক সৌভাগ্য যে–যেমন শৈশবে তেমনি। প্রাপ্তবয়স্কতার কালে তাকে নিতে হয় সর্বাধিক দুঃসাধ্য, তবে সবচেয়ে সুনিশ্চিত, পথ; নারীর এটা এক দুর্ভাগ্য যে সে পরিবেষ্টিত থাকে অপ্রতিরোধ্য প্রলোভন দিয়ে; সব কিছুই তাকে সহজ ঢাল বেয়ে নামতে প্ররোচিত করে; নিজের পথ তৈরির সগ্রামে আহ্বান জানানোর বদলে তাকে বলা হয় তার কাজ শুধু নিজেকে পিছলে দেয়া এবং তাহলেই সে পৌঁছোবে মনোহর স্বর্গগুলোতে। যখন সে বুঝতে পারে সে মরীচিকা। দিয়ে প্রতারিত হয়েছে, তখন খুবই দেরি হয়ে গেছে; তার শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে একটি অবধারিতভাবে ব্যর্থ, ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগে।
মনোবিশ্লেষকেরা একথা ঘোষণা করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন যে নারী প্রেমিকের মধ্যে খোঁজে পিতার ভাবমূর্তি; তবে এটা এ-কারণে যে পিতা একটি পুরুষ বলে, সে পিতা বলে নয়; সে বিস্ময়বিহ্বল করে ছোটো মেয়েকে, এবং প্রত্যেক পুরুষেরই আছে এ-যাদুকরী শক্তি। নারী বিশেষ একটি ব্যক্তিকে অন্য একটি ব্যক্তির মধ্যে প্রতিমূৰ্ত করতে চায় না, সে পুনর্গঠন করতে চায় একটি পরিস্থিতি : সে-পরিস্থিতি, যার অভিজ্ঞতা সে লাভ করেছে ছোটো মেয়ে হিশেবে, প্রাপ্তবয়স্কের রক্ষণাবেক্ষণের মধ্যে। সে গভীরভাবে বিন্যস্ত হয়েছিলো গৃহে ও পরিবারে, সে জেনেছে দৃশ্যতঅক্রিয়তার শান্তি। প্রেম তাকে ফিরিয়ে দেবে তার মাকে ও পিতাকে, এটা তাকে ফিরিয়ে দেবে তার শৈশব। সে যা পুনরুদ্ধার করতে চায়, তা হচ্ছে তার মাথার ওপর একটি ছাদ; দেয়াল, যা তাকে বুঝতে দেবে না যে সে পরিত্যক্ত হয়েছে বিশাল বিশ্বলোকে; কর্তৃত্ব, যা তাকে রক্ষা করবে তার মুক্তি থেকে। এ-শিশুসুলভ নাটক হানা দেয় বহু নারীর প্রেমে; তারা সুখী হয় ‘আমার ছোট্ট মেয়ে, আমার প্রিয় শিশু’ ধরনের ডাকে; পুরুষেরা জানে যে এ-শব্দগুলো : ‘তুমি একেবারে একটি ছোট্ট মেয়ের মতো’ সে-সবের অন্যতম, যা নিশ্চিতভাবে ছোঁয় নারীর হৃদয়। আমরা দেখেছি বহু নারী প্রাপ্তবয়স্ক হতে গিয়ে কষ্ট পায়; তাই বিপুলসংখ্যক নারী একয়েভাবে রয়ে যায় ‘শিশুসুলভ’, আচরণে ও পোশাকে তারা শৈশবকে প্রলম্বিত করতে থাকে অনির্দিষ্ট কাল ধরে। পুরুষের বাহুবন্ধনে আবার শিও হয়ে উঠতে পেরে আনন্দে ভরে ওঠে তাদের পেয়ালা। ব্যবহারজীর্ণ বিষয়টি : প্রিয়, তোমার বাহুর মধ্যে নিজেকে এতো ছোটো লাগে, ফিরে ফিরে আসে প্রেমাতুর সংলাপে ও প্রেমপত্রে। ‘শিশু আমার’, গুনগুন করে প্রেমিক, নারীটি নিজেকে বলে ‘তোমার ছোট্টটি’ ইত্যাদি। তরুণী লেখে : ‘কখন আসবে সে, যে আধিপত্য করবে আমার ওপর?’ আর যখন সে আসে, তখন নারী ভালোবাসে তার পুরুষসুলভ শ্রেষ্ঠত্ব অনুভব করতে। জেনেটের পর্যেষিত স্নায়ুবৈকল্যগ্রস্ত এক রোগী খুব স্পষ্টভাবে তুলে ধরে এ-মনোভাব :
