তার দুর্ভাগ্য হচ্ছে যে, তার সমস্ত আন্তরিকতাহীনতা সত্ত্বেও, সে সচেতন এঅসারতা সম্পর্কে। একটি ব্যক্তি ও তার ডবলের মধ্যে কোনো সত্যিকার সম্পর্ক থাকতে পারে না, কেননা এ-ডবলের কোনো অস্তিত্ব নেই। আত্মরতিবতী হঠাৎ মুখোমুখি হয় এক মৌল হতাশার। সে একটি সমগ্রতারূপে মনে মনে নিজের ছবি আঁকতে পারে না, পুর-সো–আঁ-সো হওয়ার প্রতিভাস রক্ষা করতে সে অসমর্থ হয়। তার বিচ্ছিন্নতা, প্রতিটি মানুষের বিচ্ছিন্নতার মতোই, আকস্মিকতা ও নিঃসহায়পরিত্যাগরূপে অনুভূত হয়। এবং এজন্যেই–যদি সে না বদলায়–নিজের জন্যে কথা বলার জন্যে সে দণ্ডিত হয় ভিড়ের কাছে, অন্যদের কাছে, অস্থিরতাবে পালিয়েযেতে। একথা মনে করা খুব ভুল হবে যে নিজেকে পরম লক্ষ্যরূপে গণ্য করে সে মুক্তি পায় পরনির্ভরতা থেকে; বরং এর বিপরীতে, সে নিজেকে ধ্বংস করে অতিশয়সার্বিক দাসত্বে। সে স্বাধীনভাবে দাঁড়ায় না, বরং নিজেকে করে তোলে একটি বস্তু, যা বিপন্ন। হয় বিশ্ব ও অন্য সচেতন সত্তাদের দ্বারা।
আত্মরতিবতী, প্রকৃতপক্ষে, হেতাইরার মতোই পরনির্ভর। বিশেষ একটি পুরুষের স্বৈরাচার এড়িয়ে গেলেও সে মেনে নেয় জনমতের স্বৈরাচার। এ-বন্ধন, যা তাকে বেঁধে রাখে অন্যদের সাথে, তাতে নেই বিনিময়ের পারস্পরিকতা, কেননা সে আর আত্মরতিবতী থাকতো না, যদি সে চাইতো যে অন্যরা স্বাধীনভাবে মূল্যায়ন করে তাকে স্বীকৃতি দিক, এবং যদি সে এ-মূল্যায়নকে নিজের কর্মের দ্বারা অর্জনীয় লক্ষ্য বলে মনে করতো। তার মনোভাবের বিসঙ্গতিটি এখানে যে সে এমন এক বিশ্বের কাছে থেকে মূল্য পেতে চায়, যাকে সে নিজে মূল্যহীন মনে করে, কেননা তার বিচারে একমাত্র সে-ই মূল্যবান। অন্যদের অনুমোন হচ্ছে একটা অমানবিক শক্তি, রহস্যময় ও চপল, এবং এটা অর্জনের যে-কোনো উদ্যোগ নিতে হবে যাদুর মাধ্যমে। তার। অগভীর ঔদ্ধত্য সত্ত্বেও, আত্মরতিবতী তার অনিশ্চিত অবস্থান বুঝতে পারে; এবং এই ব্যাখ্যা করে কেননা সে অস্থির, অতিস্পর্শকাতর, খিটখিটে, সব সময় সম্ভাব্য বিপদের দিকে লক্ষ্য রাখে; তার অহমিকা চির-অতৃপ্ত। যতোই সে বুড়োহতে থাকে, ততোই ব্যগ্রভাবে সে কামনা করে স্তুতি ও সাফল্য এবং সে আরো সন্দিগ্ধ হয়ে উঠতে থাকে তার চারদিকের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে; বিহ্বল, আবিষ্ট, সে আত্মগোপন করে আন্তরিকতাহীনতার তমসায় এবং প্রায়ই নিজেকে ঘিরে বিকারগ্রস্ত মানসিক বৈকল্যের একটি খোলক তৈরি করে পরিসমাপ্তি লাভ করে। একটি প্রবাদ আছে, যা একান্তভাবে তার বেলা যথোচিত : ‘যে জীবন লাভ করেছে, সে তা হারাবে’।
প্রণয়িনী নারী
দ্বিতীয় খণ্ড । ভাগ ৬ –যাথার্থ্য প্রতিপাদন। পরিচ্ছেদ ২
প্রেম শব্দটি উভয় লিঙ্গের কাছে কোনোক্রমেই একই অর্থ বোঝায় না, এবং এটাই তাদের মধ্যে মারাত্মক ভুল বোঝাবুঝির একটি কারণ, যা তাদের মধ্যে সৃষ্টি করে মতানৈক্য। বায়রন চমৎকারভাবে বলেছেন : ‘পুরুষের প্রেম পুরুষের জীবনের থেকে দূরের জিনিশ, এটা নারীর সমগ্র অস্তিত্ব’। নিটশে দি গে সায়েন্স-এ ব্যক্ত করেছেন একই ধারণা :
প্রেম শব্দটি প্রকৃতপক্ষে পুরুষ ও নারীর কাছে বোঝায় দুটি ভিন্ন জিনিশ। নারী প্রেম বলতে যা বোঝে, তা খুবই স্পষ্ট : এটা শুধু গভীর অনুরক্তি নয়, এটা দেহ আর আত্মার এক সামগ্রিক দান, যাতে নেই কোনো মনোভাবসংবরণ, নেই অন্য কিছু বিচারবিবেচনা। নারীর প্রেমের এ-শর্তহীন প্রকৃতি একে করে তোলে একটি ধর্মবিশ্বাস, তার একমাত্র বিশ্বাস। পুরুষের কথা বলতে গেলে, সে কোনো নারীকে ভালোবাসলে, সে যা চায় তা হচ্ছে নারীটির প্রেম; যদি পুরুষ থেকে থাকে যারা বোধ করে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের বাসনা, তাহলে আমি আমার সম্মানের দোহাই দিয়ে বলছি, তারা পুরুষ নয়।
পুরুষেরা তাদের জীবনের বিশেষ কোনো সময়ে সংরক্ত প্রেমিক হয়ে উঠতে পারে, কিন্তু তাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যাকে বলা যেতে পারে ‘মহাপ্রেমিক’; তীব্রতম আবেগে আত্মহারা অবস্থায়ও তারা কখনো সম্পূর্ণরূপে অধিকার ত্যাগ করে না; এমনকি দয়িতার সামনে নতজানু অবস্থায়ও তারা যা চায়, তা হচ্ছে দয়িতাকে দখল করতে; তাদের জীবনে মর্মমূলে তারা রয়ে যায়সার্বভৌম কর্তা; প্রিয়তমাটি আরো বহু মূল্যবান বস্তুর মধ্যে একটি মাত্র; তারা দয়িতাকে সন্নিবিষ্ট করতে চায় তাদের অস্তিত্বের মধ্যে এবং তার অস্তিত্বকে দয়িতার জন্যে পুরোপুরি অপব্যয় করতে চায়। অন্য দিকে, নারীর প্রেমে পড়া হচ্ছে প্রভুর কল্যাণের জন্যে সর্বস্ব বিলিয়ে দেয়া। যেমন বলেছেন সেসিল সভাজ : ‘যখন সে প্রেমে পড়ে নারীকে ভুলে যেতে হয় তার ব্যক্তিত্ব। এটা প্রকৃতির বিধান। একটি প্রভু ছাড়া নারী অস্তিত্বহীন। একটি প্রভু ছাড়া নারী একটি ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ফুলের তোড়া’।
সত্য হচ্ছে এখানে প্রকৃতির বিধানের সঙ্গে আমাদের কোনো সংশ্রব নেই। প্রেম সম্পর্কে পুরুষ ও নারীর ধারণার মধ্যে যে-ভিন্নতা দেখা যায়, তাতে প্রতিফলিত হয় তাদের পরিস্থিতির ভিন্নতা। যে-ব্যক্তিটি কর্তা, যে নিজে, যদি সীমাতিক্ৰমণতার দিকে তার থাকে সাহসী প্রবণতা, তাহলে সে প্রয়াস চালায় বিশ্বের ওপর তার অধিকার সম্প্রসারণের : সে উচ্চাভিলাষী, সে কাজ করে। কিন্তু একটি অপ্রয়োজনীয় প্রাণী অসমর্থ তার মন্ময়তার মর্মমূলের ধ্রুবকে অনুভব করতে; সীমাবদ্ধতায় দণ্ডিত কোনো সত্তা কর্মের মধ্যে সিদ্ধি লাভ করতে পারে না। আপেক্ষিকতার জগতে বন্দী হয়ে, শৈশব থেকে পুরুষের জন্যে পূর্বনির্ধারিত হয়ে, পুরুষের মধ্যে একটি অসাধারণ সত্তাকে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে, যে-পুরুষের সমকক্ষ সে হয়তো হবে না, যে-নারী তার মনুষ্যত্বের দাবি ত্যাগ করে নি, সে স্বপ্ন দেখবে সে নিজের সত্তাকে অতিক্রম করে। এগিয়ে গেছে এসব শ্রেষ্ঠ সত্তার কোনো একটির প্রতি, সে স্বপ্ন দেখবে নিজেকে সে মিশিয়ে দিচ্ছে সার্বভৌম কর্তার সাথে। যাকে তার কাছে উপস্থিত করা হয়েছে ধ্রুবর, অনিবার্যের প্রতীকরূপে, তার মধ্যে দেহে-মনে নিজেকে হারিয়ে ফেলা ছাড়া তার মুক্তির আর কোনো পথ নেই। যেহেতু সে কোনো-না-কোনোভাবে পরনির্ভরতায় দণ্ডিত, তাই সে স্বৈরাচারীদের পিতামাতা, স্বামী, বা রক্ষককে মান্য করার থেকে একটি দেবতার পুজো করতেই বেশি পছন্দ করবে। সে তার দাসত্ববন্ধনকে এতো ব্যগ্রভাবে কামনা করে যে একেই মনে হয়তার স্বাধীনতার অভিব্যক্তি বলে; সে যে অপ্রয়োজনীয় বস্তু, এটা পুরোপুরি স্বীকার করে নিয়ে সে অপ্রয়োজনীয় বস্তু হিশেবে তার পরিস্থিতির উর্ধ্বে ওঠার জন্যে চেষ্টা করে; তার মাংস, অনুভূতি, আচরণের মাধ্যমে সে প্রেমিককে অধিষ্ঠিত করে পরম মূল্য ও বাস্তবতা রূপে; প্রেমিকের সামনে নিজেকে অধম করে তুলে সে নিজেকে করে তোলে শূন্যতা। প্রেম তার কাছে হয়ে ওঠে ধর্ম।
