এসব মোহ ঘটাতে পারে প্রকৃত মস্তিষ্কবিকৃতি, এবং ক্লেরাম্বল কামক্ষিপ্ততাকে অকারণে এক ধরনের পেশাগত ‘ব্যাধি’ বলে গণ্য করেন নি; নিজেকে নারী বলেবোধ করা হচ্ছে নিজেকে একটি কামনার বস্তু বলে বোধ করা, নিজেকে কাম্য ও প্রেমাস্পদ বলে বোধ করা। এটা তাৎপর্যপূর্ণ যে যে-রোগীরা এ-মোহে ভোগে যে তাদের কেউ ভালোবাসে, তাদের দশজনের মধ্যে ন-জনই নারী। এটা বেশ স্পষ্ট যে কাল্পনিক প্রেমিকের মধ্যে তারা যা চায়, তা হচ্ছে তাদের আত্মরতির মহিমান্বিতকরণ। তারা চায় একে দেয়া হোক একটা অবিসম্বাদিত মূল্য, কোনো পুরোহিত, চিকিৎসক, আইনজীবী, বা কোনো শ্রেষ্ঠ পুরুষ দ্বার। এবং পুরুষটির আচরণ প্রকাশ করে যেনিরঙ্কুশ সত্য, তা হচ্ছে পুরুষটির কল্পনার দয়িতা সর্বোপরি সমস্ত নারীর থেকে অপ্রতিরোধ্য ও শ্রেষ্ঠতর গুণাবলিতে পরিপূর্ণ।
কামক্ষিপ্ততা দেখা দিতে পারে বিচিত্র ধরনের মনোবৈকল্যের সঙ্গে, তবে এর আধেয় সব সময়ই এক। ব্যক্তিটি দীপ্তিময়ভাবে মর্যাদাসম্পন্ন হয়ে ওঠে এমন একজন বিখ্যাত পুরুষের প্রেম দ্বারা, যে হঠাৎ তার আকর্ষণীয়তায় মুগ্ধ হয়েছে–যখন সে এধরনের কিছুই প্রত্যাশা করছিলো না–এবং যে তার আবেগ প্রকাশ করে পরোক্ষ তবে সনির্বন্ধ রীতিতে। এ-সম্পর্ক অনেক সময় থেকে যায় আদর্শ স্তরে এবং অনেক সময় ধারণ করে যৌন ধাচ; তবে এর অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে নারীটি যতোটা প্রেমে পড়েছে, বিখ্যাত ও শক্তিশালী নরদেবতাটি প্রেমে পড়েছে তার থেকে বেশি এবং সে তার সংরাগ প্রকাশ করে অদ্ভুত ও দ্ব্যর্থবোধক রীতিতে।
তবে আত্মরতির কমেডি অভিনীত হয় বাস্তবতার মূল্যে; একটি কাল্পনিক চরিত্র এক কাল্পনিক জনগণের কাছে প্রশস্তিবোধের সনির্বন্ধ আবেদন জানায়; তার অহংয়ে মোহগ্রস্ত হয়ে সে বাস্তবিক জগতের ওপর সমস্ত অধিকার হারিয়ে ফেলে, অন্যদের সঙ্গে প্রকৃত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার কোন আগ্রহ তার থাকে না। তাঁর অনুরাগীরা রাতে তাদের নোটবইয়ে লিখবে যে-সব ক্ৰিপাত্মক মন্তব্য, সেগুলোর কথা যদি আগেই বুঝতেন মাদাম দ্য স্কাল, তাহলে তিনি অনেক কম উৎসাহে কথা বলতেন ফের ঢঙে। তবে আত্মরতিবতী একথা মানতে অস্বীকার করে যে সে নিজেকে যেভাবে উপস্থাপন করে, লোকজন তাকে সে থেকে ভিন্নভাবেও দেখতে পারে, এটাই ব্যাখ্যা করে একথা যে যদিও সে সব সময়ই মগ্ন থাকে আত্মধ্যানে, তবু কেননা সে হয়ে থাকে নিজের নিকৃষ্ট বিচারক, এবং কেননা সে অতি সহজেই হাস্যকর হয়ে ওঠে। সে আর শোনে না, সে বলে; এবং যখন সে বলে তখন সে তার ভূমিকা বলে।
মারি বাশকির্তসেভ লিখেছেন : ‘এটা আমাকে আমোদ দেয়। আমি তার সাথে আলাপ করি না, আমি অভিনয় করি, এবং আমি আছি যথার্থ-মূল্য-বুঝতে-সমর্থ এক দর্শকমণ্ডলির সামনে, এটা অনুভব করে আমি দক্ষ হয়ে উঠি শিশুসুলভ ও খেয়ালি স্বরে কথা বলতে এবং ঢংয়ে’।
সে নিজেকে এতো বেশি দেখে যে সে কিছুই দেখতে পায় না; সে অন্যদের মধ্যে যেটুকু নিজের মতো বলে চেনে, শুধু সেটুকুই বুঝতে পারে; যা কিছু তার নিজের সঙ্গে, তার নিজের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নয়, তা রয়ে যায় তার বোধগম্যতার বাইরে। সে তার অভিজ্ঞতাগুলোকে বহুগুণে বাড়িয়ে তুলতে ভালোবাসে; সে জানতে চায় প্রেমের মাতলামো ও যন্ত্রণা, মাতৃত্বের, বন্ধুত্বের, নির্জনতার, অশ্রুর ও হাস্যের বিশুদ্ধ আনন্দ; তবে সে যেহেতু নিজেকে দান করতে পারে না, তাই তার আবেগগুলো কৃত্রিমভাবে তৈরি। সন্দেহ নেই যে তাঁর সন্তানদের মৃত্যুতে আইসোরা ডাক্কান সত্যিকার অশ্রু ফেলেছেন। কিন্তু যখন তিনি মস্ত যাত্রাভিনয়ের ভঙ্গিতে তাদের ভস্ম সমুদ্রে নিক্ষেপ করতে চান, তখন তিনি হয়ে ওঠেন একটি অভিনেত্রী মাত্র; এবং কারো পক্ষে বিবেকের অস্বস্তি ছাড়া আমার জীবন-এর এ-অংশটুক পড়াসম্ভব নয়, যাতে তিনি স্মৃতিচারণ করেছেন তার দুঃখের :
‘আমি অনুভব করি আমার নিজের দেহের উষ্ণতা। আমি তাকাই আমার নগ্ন পায়ের দিকে–ওগুলো ছড়িয়ে দিই। আমার স্তনের কোমলতা, আমার বাহু, যেগুলো কখনো স্থির নয়, বরং কোমলভাবে। তরঙ্গিত হয়ে নিরন্তর দুলে যাচ্ছে, এবং আমি বুঝতে পারি যে বারো বছর ধরে আমি ক্লান্ত, এ-বক্ষ মনে মনে পোষণ করেছে এক অশেষ যন্ত্রণা, আমার এ-হাত দুটিতে লেগে আছে দুঃখের দাগ, আর যখন আমি একলা থাকি, তখন এ-চোখ দুটি কদাচিৎ শুষ্ক থাকে’।
কিশোরী তার আত্মপুজো থেকে উদ্বিগ্নকর ভবিষ্যতের মুখখামুখি দাঁড়ানোর সাহস সংগ্রহ করতে পারে; তবে তাকে অবিলম্বে পেরিয়ে যেতে হয় এ-স্তর, নইলে ভবিষ্যৎ রুদ্ধ হয়ে যায়। যে-নারী তার প্রেমিককে বন্দী করে যুগলের সীমাবদ্ধতার মধ্যে, সে তার প্রেমিক ও নিজেকে বিপর্যস্ত করে মৃত্যুতে; এবং যে-আত্মরতিবতী নিজেকে অভিন্ন করে তোলে তার কাল্পনিক ডবলের সাথে, সে ধ্বংস করে নিজেকে। তার স্মৃতিগুলো হয়ে ওঠে অনড়, তার আচরণ ছকবাঁধা; সে কথার পুনরুক্তি করে, সে পুনরাবৃত্তি করে। আন্তরিকতাহীন নাটকীয় আচরণের, যেগুলো ধীরেধীরে সব অর্থ হারিয়ে ফেলেছে, তাই নারীদের লেখা বহু দিনপঞ্জি ও আত্মজীবনীর এমন দরিদ্রদশা; নিজের জন্যে ধূপ জ্বালানোয় পুরোপুরি নিয়োজিত থেকে, যে-নারী কিছুই করে না সে নিজেকে কিছুই করে তুলতে পারে না এবং ধূপ জ্বালায় একটি অসত্তার জন্যে।
