পোশাক ও কথোপকথন অনেকাংশে তৃপ্ত করে এ-নারীসুলভ প্রদর্শনের রুচি। তবে কোনো উচ্চাভিলাষী আত্মরতিবতী নিজেকে প্রদর্শন করতে চাইবে আরো কম সাধারণ ও বহুবিচিত্র রীতিতে। বিশেষ করে, সে প্রায়ই নিজের জীবনকেই করে তুলবে জনগণের হর্ষধ্বনির কাছে উপস্থাপিত একটি প্রদর্শনীরূপে এবং ঐকান্তিকভাবে ঢুকবে মঞ্চে। কোরিন-এ মাদাম দ্য স্কাল আমাদের বিস্তারিতভাবে বলেছেন হার্পসহযোগে কবিতা আবৃত্তি করে তিনি কীভাবে অভিভূত করেছিলেন ইতালীয় ভিড়কে। কোপেতে তার সুইস পল্লীভবনে তার একটি প্রিয় বিনোদন ছিলো বিয়োগান্তক চরিত্রের ঢঙে কথা বলা; তিনি পছন্দ করতেন ফেদ্র সেজে হিপোলিতের পোশাকপরিহিত এক বা আরেক প্রেমিকের কাছে অতিশয় ব্যাকুলভাবে প্রণয় নিবেদন করতে। পরিস্থিতি অনুকূল হলে অভিনয়-মঞ্চের কাছে প্রকাশ্যে নিজেকে উৎসর্গ করার থেকে আর কিছুই এতো গভীরভাবে তৃপ্ত করে না আত্মরতিবতীকে। ‘অভিনয়-মঞ্চ’, বলেছেন জর্জেৎ লেব্লা, ‘আমাকে তা দেয়, যা আমি দীর্ঘকাল ধরে চেয়েছি : পরমানন্দ লাভের একটি কারণ। আজ একে আমার মনে হয় ক্রিয়ার ব্যঙ্গরূপ, এমন একটা কিছু, যা অতিরিক্ত মেজাজের জন্যে অপরিহার্য’।
তিনি যে-বাকভঙ্গিটি প্রয়োগ করেন, তা চমকপ্রদ। কাজের অভাবে নারী আবিষ্কার করে কাজের বিকল্প; কারো কারো কাছে অভিনয়-মঞ্চ একটি প্রিয় বিকল্প।অভিনেত্রীরা, অধিকন্তু, পোষণ করতে পারে নানা লক্ষ্য। কারো আরো কাছে অভিনয় হচ্ছে জীবিকার একটা উপায়, নিতান্তই একটি পেশা; অন্যদের কাছে এটা এনে দেয় এমন খ্যাতি, যা ব্যবহার করা যেতে পারে নাগরালির কাজে; আরো অন্যদের কাছে, এটা এনে দেয় তার আত্মরতির বিজয়োল্লাস। বড়ো অভিনেত্রীরা–রাশেল, দুস–খাঁটি শিল্পী, যারা বিভিন্ন ভূমিকায় সীমাতিক্রমণ করেন নিজেদের; কিন্তু তৃতীয়-মানেরটি, এর বিপরীতে, সে কী অর্জন করছে তাতে উৎসাহী নয়, বরং এটা তার জন্যে যেগৌরব বয়ে আনছে, তাতে উৎসাহী; সবার আগে সে জোর দিতে চায় তার নিজের গুরুত্বের ওপর। নিজেকে সমর্পণ করার অসামর্থ্যবশত একগুঁয়েআত্মরতিবতী প্রেমে যেমন সীমাবদ্ধ শিল্পকলায়ও তেমনি সীমাবদ্ধ।
এ-ক্রটির সাংঘাতিক প্রভাব পড়বে তার সমস্ত কাজের ওপরই। সে প্রলোভন বোধ করবে যে-কোনো ও প্রতিটি পথের প্রতি, যা তাকে নিয়ে যাবে খ্যাতির দিকে, কিন্তু সে কখনোই সর্বান্তকরণে কোনো একটিতে নিজেকে নিয়োজিত করবে না। চিত্রকলা, ভাস্কর্য, সাহিত্য, আর সমস্ত জ্ঞানের শাখা, যাতে দরকার পড়ে কঠোর শিক্ষানবিশি ও একলা প্রচেষ্টা; বহু নারী এগুলো চেষ্টা করে দেখে, কিন্তু অবিলম্বে তারা এগুলো ছেড়ে দেয় যদি না তারা চালিত হয় সৃষ্টি করার ইতিবাচক বাসনা দিয়ে; অনেকে অধ্যবসায় চালিয়ে যায়, তবে তারা কাজের নামে খেলার বেশি কিছু করে না। তারা ঘণ্টার পর ঘন্টা ইজেলের সামনে কাটাতে পারে, কিন্তু তারা নিজেদের এতো মাত্রাতিরিক্ত ভালোবাসে যে চিত্রকলার প্রতি তাদের কোনো প্রকৃত ভালোবাসা থাকে না এবং তাই তারা পর্যবসিত হয় ব্যর্থতায়। যখন কোনো নারী, মাদাম দ্য স্তাল ও মাদাম দ্য নোয়াইলের মতো, ভালো কিছু সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়, তখন ব্যাপার হচ্ছে সে। একান্তভাবে আত্মপুজোয়ই মগ্ন থাকে নি; তবে অজস্র নারী লেখককে অধঃপতিত করে যে-সব ত্রুটি, তার একটি হচ্ছে তাদের আত্মপ্রেম, যা তাদের আন্তরিকতাকে দূষিত করে, তাদের সীমাবদ্ধ করে, এবং তাদের মর্যাদা হ্রাস করে।
তাদের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে পুরোপুরি প্রত্যয়শীল বহু নারী, অবশ্য, তাদের শ্রেষ্ঠত্ব জগতের কাছে প্রকাশ করতে পারে না; তখন তাদের উচ্চাভিলাস দেখা দেয়কোনো একটি পুরুষ, যাকে তারা মুগ্ধ করতে পারে তাদের গুণে, তাকে মধ্যস্থতাকারীরূপে ব্যবহার করার। এমন নারী তার নিজের মূল্যবোধ অনুসারে তার স্বাধীন পরিকল্পনার মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করে না; সে তার অহংয়ের সঙ্গে যুক্ত করতে চায় গতানুগতিক ভাবনাচিন্তা; তাই নিজেকে প্রেরণা, কলালক্ষ্মী, এজেরিয়ারূপে পুরুষের প্রভাব ও খ্যাতির সঙ্গে অভিন্ন করে তোলার আশায় সে আশ্রয় নেয় সে-সব পুরুষের, যাদের আছে প্রভাব ও খ্যাতি। লরেন্সের সঙ্গে সম্পর্কে মাবেল ডজ লুহান পরিচয়। দিয়েছেন এর এক চমকপ্রদ উদাহরণের : তিনি চেয়েছেন ‘লরেন্সের মনকে প্রলুব্ধ করতে, কিছু উৎপাদনে তাঁর মনকে বাধ্য করতে’; তার দরকার ছিলোলরেন্সের সপ্নবিভাব, তাঁর সৃষ্টিশীল কল্পনাপ্রতিভা; তাঁর নিজের কিছু করার ছিলো না বলে এদুঃখের এক ধরনের ক্ষতিপূরণ হিশেবে লরেন্সকে দিয়ে কাজ করিয়ে তিনি এক ধরনের সক্রিয়তা বোধ করতেন। তার তাওসমূহের সুফল লাভের জন্যে, তিনি চাইতেন লরেন্স জয় করবে তাঁর মাধ্যমে। একই উপায়ে জর্জেৎ লেব্লা হতে চেয়েছিলেন মেটারলিংকের ‘খাদ্য ও শিখা’; তবে তিনি মেটারলিংকের বইয়ে তার নিজের নামও চেয়েছিলেন। এখানে আমরা পাচ্ছি না সে-উচ্চাভিলাষী নারীদের, যারা নিজেদের লক্ষ্য সাধনের জন্যে ব্যবহার করে পুরুষদের, বরং পাচ্ছি সে-নারীদের, যারা গুরুত্বলাভের একটা মন্ময় বাসনা দ্বারা উদ্দীপিত, যার কোনো বস্তুগত লক্ষ্য নেই, এবং যারা অন্যের সীমাতিক্ৰমণতা চুরি করার জন্যে একাগ্রচিত্ত। তারা কোনোক্রমেই সব সময় সফল হয় না; তবে তারা নিজেদের কাছে নিজেদের ব্যর্থতা লুকিয়ে রাখতে এবং তাদের অপ্রতিরোধ্য প্রলুব্ধকরতায় নিজেদের প্ররোচিত করতে নিপুণ। নিজেদের তারা ভালোবাসার যোগ্য, কাম্য, প্রশংসণীয় জেনে নিশ্চিত থাকে যে অন্যরা তাদের ভালোবাসছে, কামনা করছে, এবং প্রশংসা করছে।
