একটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, যা সাধারণভাবে দেখা যায় এসব নারীর মধ্যে, তা হচ্ছে তারা মনে করে তাদের ভুল বোঝা হচ্ছে; তাদের চারপাশের লোকজন তাদের বিশেষ গুণাবলি বুঝতে ব্যর্থ; তাদের প্রতি অন্যদের এ-অজ্ঞতা বা ঔদাসীন্যকে তারা অনুবাদ করে এ-ধারণায় যে তাদের অন্তরে তারা ধারণ করে কিছু গূঢ় সত্য। ঘটনা হচ্ছে। তাদের অধিকাংশই নীরবে সমাহিত করেছে তাদের শৈশবের বা যৌবনের কিছু উপাখ্যান, যেগুলোর অতিশয় গুরুত্ব ছিলো তাদের জীবনে; তারা জানে তাদের আনুষ্ঠানিক জীবনীগুলোকে তাদের প্রকৃত জীবনকাহিনী বলে মনে করা ঠিক নয়। তবে প্রায় সময়ই আত্মরতিপরায়ণ নারীর নায়িকা নিতান্তই কাল্পনিক, কেননা সে বাস্তবিক জীবনে আত্মসিদ্ধি লাভ করে না; মূর্ত বিশ্ব তাকে দান করে নি তার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য : এটা এক সংগুপ্ত নীতি, ফ্লোজিস্টনের মতোই অবোধ্য এক ধরনের শক্তি বা গুণ। নারী তার নায়িকার বিদ্যমানতায় বিশ্বাস করে, কিন্তু সে যদি তাকে প্রকাশ করতে চাইতো অন্যদের সামনে, তাহলে সে তেমন বিব্রত হতো স্পর্শাতীত অপরাধের স্বীকারোক্তি করতে গিয়ে যেমন বিব্রত হয় স্নায়ুবিকল ব্যক্তি। উভয়ের ক্ষেত্রেই গৃঢ় সত্যটি কমে পরিণত হয় শূন্যগর্ভ একটি প্রত্যয়ে যে অনুভূতি ও ক্রিয়াগুলোর পাঠোদ্ধার ও সত্যতা প্রতিপাদনের জন্যে তাদের অন্তরের অন্তস্তলে আছে একটা চাবি। তাদের ইচ্ছাশক্তির রুগ্ন অভাব, জড়তা, স্নায়ুবিকল ব্যক্তিদের মধ্যে সৃষ্টি করে এ-মতিবিভ্রম এবং দৈনন্দিন কর্মের মধ্যে দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করার অসামর্থ্যই নারীকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করে যে তার অন্তরেও আছে এক অনির্বচনীয় রহস্য। নারীর রহস্যময়তার বিখ্যাত কিংবদন্তিটি উৎসাহিত করে এ-বিশ্বাসকে এবং পালাক্রমে এর দ্বারা দৃঢ়তরভাবে বলবৎ হয়।
তার ভুল-বোঝা সম্পদে ঋদ্ধ হয়ে, তার নিজের দৃষ্টিতে, বিয়োগান্তক নায়কের প্রয়োজন হয় যেমন একটা প্রধান নিয়তি, তার অংশীদার হয়ে ওঠে নারী। তার সমগ্র জীবনকে দেয়া হয় একটি আদর্শায়িত মূর্তি এবং সেটি হয়ে ওঠে এক পবিত্র নাটক। তার ভাবগম্ভীরভাবে নির্বাচিত গাউনের ভেতরে সে দাঁড়ায়, যাজকীয় বস্ত্রে যুগপৎ সে একজন যাজিকা এবং বিশ্বাসীদের হাতে শ্রীমণ্ডিত ও ভক্তদের পুজোর জন্যে উপস্থাপিত এক মূর্তি। তার গৃহ হয়ে ওঠে মন্দির, যেখানে সম্পন্ন হয় তার পুজো। আত্মরতিপরায়ণ নারী তার বস্ত্রের প্রতি যতোটা যত্নশীল ততোটাই যত্নশীল সে-সব আসবাব ও অলঙ্কারের প্রতি, যা তাকে ঘিরে থাকে।
যখন সে নিজেকে প্রদর্শন করে অন্যদের কাছে বা নিজেকে সমর্পণ করে প্রেমিকের বাহুবন্ধনে, নারী সিদ্ধ করে তার ব্রত : সে হয়ে ওঠে ভেনাস, যে তার রূপের অমূল্য সম্পদ দান করছে বিশ্বকে। সেসিল সেরেল যখন বিবের ব্যঙ্গচিত্রের কাঁচের ঢাকনাটি ভাঙেন, তখন তিনি নিজের নয়, পক্ষ নিয়েছিলেন সৌন্দর্যের; তার মেমওয়ার-এ দেখতে পাই সারাজীবন তিনি মরগণকে ডেকেছেন শিল্পকলা আরাধনার জন্যে। আইসোডোরা ডাঙ্কানও তা-ই করেছেন, এভাবে তিনি নিজেকে চিত্রিত করেছেন মাই লাইফ-এ :
‘একেকটা অনুষ্ঠানের পর, আমি টিউনিক পরা, আমার চুল গোলাপে ঢাকা, আমাকে এতো রূপসী দেখাতো। কেননা উপভোগ করা হবে না এ-সৌন্দর্য?… যে-পুরুষ সারাদিন পরিশ্রম করে মগজের… তাকে কেননা নেয়া হবে না এ-সুন্দর বাহুতে এবং মুক্তি পাবে না তার কষ্ট থেকে এবং কয়েক ঘণ্টার জন্যে ভোগ করবে না সৌন্দর্য ও বিস্মরণ?’
আত্মরতিবতীর সহৃদয়তা তার জন্যে একটি লাভের জন্ম দেয় : আয়নার থেকে অনেক বেশি ভালোভাবে অন্যদের চোখের ভেতরে সে দেখতে পায় গৌরবের জ্যোতিক্রথচিত তার ডবলকে। যদি সে কোনো অনুরক্ত দর্শকশ্রোতামণ্ডলি না পায়, তাহলে সে তার মন খুলে দেয় কোনো স্বীকারোক্তিগ্রহণকারীর কাছে, চিকিৎসকের কাছে, মনোচিকিৎসকের কাছে; সে যায় হস্তরেখাবিদ ও অলোকদ্রষ্টার কাছে। ‘এমন নয় যে আমি তাদের বিশ্বাস করি,’ বলেছে চলচ্চিত্রের একটি ‘ক্ষুদেতারকা’, ‘তবে আমি ভালোবাসি কেউ আমার কাছে আমার নিজের সম্বন্ধে কথা বলুক!’ সে তার বন্ধুর কাছে বলে তার সম্পর্কে সমস্ত কথা; অন্য যে-কোনো লোকের থেকে বেশি ব্যাকুলভাবে সে তার প্রেমিকের মধ্যে খোঁজে একটি শ্রোতা। সত্যিকার প্রেমে পড়েছে যে-নারী, সে অবিলম্বে ভুলে যায় তার অহংকে; তবে বহু নারী খাঁটি প্রেমে জড়িয়েপড়তে অসমর্থ, শুধু এ-কারণে যে তারা কখনো নিজেদের ভুলতে পারে না। তারা নিভৃত কক্ষের অন্তরঙ্গতার থেকে বেশি পছন্দ করে বড়োসড়ো মঞ্চ। এজন্যেই তাদের কাছে সমাজের গুরুত্ব : তাদের দিকে তাকানোর জন্যে তাদের দরকার চোখ, তাদের কথা শোনার জন্যে তাদের দরকার কান; সম্রান্ত ব্যক্তি হিশেবে তাদের দরকার যথাসম্ভব শ্রেষ্ঠ শ্রোতৃমন্ডলি। তার নিজের ঘরের বর্ণনা করে মারি বাশকির্তসেভ অবাধে করেছেন এ স্বীকারোক্তিই : ‘এভাবে লোকজন যখন এসে দেখে আমি লিখছি তখন আমি থাকি মঞ্চেই’। এবং আরো : ‘আমি ঠিক করেছি আমি নিজেকে দেখবো মঞ্চরূপেই। আমি নগরে সারার থেকে উৎকৃষ্টতর একটি বাড়ি, ও বড়ো স্টুডিও তৈরি করবো’।
তাঁর ব্যাপারে, মাদাম দ্য নোয়াইলে লিখেছেন : ‘আমি মুক্তাঙ্গন ভালোবাসতাম এবং এখনো ভালোবাসি… বহু অতিথি সমাগমে যারা ভয় পেতে যে এতে আমি বিরক্ত হতে পারি, প্রায়ই আমি ক্ষমা চেয়ে সে-বন্ধুদের আশ্বস্ত করতে সমর্থ হয়েছি এ-আন্তরিক অবাধ প্রকাশ্য স্বীকৃতির মাধ্যমে : আমি খালি আসনের সামনে অভিনয় করতে পছন্দ করি না’।
