‘বাড়ি ফেরার পর আমি পোশাক খুলে ফেলি এবং আমার নগ্ন সৌন্দর্য দেখে মোহিত হই যেনো একে আমি আগে কখনো দেখি নি। আমার একটি ভাস্কর্য অবশ্যই তৈরি করতে হবে, কিন্তু কীভাবে? বিয়ে না করলে এটা একেবারেই অসম্ভব। কুৎসিত হয়ে উঠে একে নষ্ট করার আগে এটা অবশ্যই করতে হবে… শুধু ভাস্কর্যটি তৈরির জন্যে হলেও আমাকে একটি স্বামী পেতেই হবে’।
অভিসারে যাওয়ার জন্যে তৈরি হওয়ার সময় সেসিল সসারেল নিজেকে চিত্রিত করেছেন এভাবে :
‘আমি আমার আয়নার সামনে। আমাকে আরো রূপসী দেখাতে হবে। আমি আমার সিংহের কেশর নিয়ে খাটাখাঁটি করতে থাকি। আমার চিরুনি থেকে স্ফুলিঙ্গ বেরোতে থাকে। আমার মাথাটি সোনালি রশ্মিতে ঘেরা একটি সূর্য’।
আমার মনে পড়ছে আরেক তরুণীকে, যাকে আমি এক সকালবেলা দেখেছিলাম একটি কাফের প্রসাধনঘরে; তার হাতে ছিলো একটি গোলাপ এবং তাকে একটু নেশাগ্রস্ত মনে হচ্ছিলো; সে আয়নায় তার ঠোট লাগায় যেনো সে পান করতে চায় তার প্রতিবিম্বটিকে, এবং স্মিত হেসে সে গুঞ্জন করে ওঠে : ‘মোহিনী, আমি একেবারে মনোমমাহিনী!’ একই সঙ্গে যাজিকা ও মূর্তি, আত্মরতিবতী গৌরবের জ্যোতিশ্চক্র পরে চিরন্তন ভুবনের ভেতর দিয়ে উড়াল দিয়ে উঠতে থাকে ওপরে, এবং মেঘমণ্ডলের নিচে মোহিত হয়ে নতজানু হয় প্রাণীরা; সে হচ্ছে আত্মধ্যানে নিমগ্ন বিধাতা। ‘আমি নিজেকে ভালোবাসি, আমি আমার বিধাতা!’ বলেছিলেন মাদাম মিয়েরোস্কি। যে-তরুণী তার আয়নায় দেখতে পেয়েছে তার নিজের দেহের গঠনের
মধ্যে জীবন্ত হয়ে উঠেছে রূপ, বাসনা, প্রেম, সুখ, সে তার সমগ্র চেতনা দিয়ে বিশ্বাস করে এ-দীপ্ত প্রত্যাদেশ টিকে থাকবে সারাজীবন। নারীটি যদি নিখুঁত রূপসী নাও হয়, তবুও সে দেখতে পায় তার মুখাবয়বে দীপ্ত হয়ে উঠেছে তার আত্মার বিশেষ সৌন্দর্য, এবং তাকে নেশাগ্রস্ত করার জন্যে এটুকুই যথেষ্ট। ‘তার রূপের জন্যে তাকে পছন্দ নাও করতে পারে, তবে তার আছে বিশেষ এক অপরূপ যাদু…’
এটা বিস্ময়কর নয় যারা কম ভাগ্যবান, তারাও অনেক সময় ভাগ পায় আয়নার পরমোল্লাসের, কেননা তারা আবেগ বোধ করে নিতান্ত এ-ঘটনায়ই যে তারা একটি মাংসের বস্তু, যা তারা সত্যিই; যেমন ঘটে পুরুষের বেলা, তরুণীর রমণীয় মাংসের বিশুদ্ধ প্রাচুর্য তাদের বিস্ময়াভিভূত করার জন্যে যথেষ্ট; এবং তারা যেহেতু নিজেদের স্বতন্ত্র কর্তা বলে বোধ করে, তাই তারা একটু আত্মপ্রবঞ্চনার মাধ্যমে তাদের বিশেষ গুণাবলিকে দিতে পারে একটি ব্যক্তিগত আকর্ষণীয়তা; তারা মুখে বা দেহে আবিষ্কার করবে কোনো মাধুর্যময়, অস্বাভাবিক, বা উত্তেজক কিন্ত সুখকর বৈশিষ্ট্য। তারা বিশ্বাস করে তারা যেহেতু অনুভব করে যে তারা নারী, শুধু এ কারণেই তারা রূপসী।
এছাড়াও, ডবল লাভের জন্যে আয়নাই একমাত্র উপায় নয়, যদিও এটাই সবচেয়ে প্রিয়। অন্তর্গত সংলাপের মাধ্যমে প্রত্যেকেই সৃষ্টি করতে পারে তার একটি যমজ। সে প্রায় সারাদিন ভরে নিঃসঙ্গ, করে চলছে একঘেয়ে গৃহস্থালির কাজ, কল্পনায় একটি উপযুক্ত চরিত্র সৃষ্টির অবকাশ আছে নারীর। যখন সে ছিলো অল্প বয়সী বালিকা, তখন সে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছে; এখন অন্তহীন বর্তমানে বন্দী থেকে সে স্মরণ করে তার ইতিহাস; সে একে আবার এমনভাবে সংশোধন করে যে একে দেয় নান্দনিক শৃঙ্খলা, মৃত্যুর আগেই সে তার অনিশ্চিত জীবনকে রূপান্তরিত করে একটি নিয়তিতে।
পুরুষদের থেকে নারীরা অনেক বেশি এঁটে থাকে বাল্যস্মৃতির সাথে : ‘যখন আমি ছোট্ট মেয়ে ছিলাম…’ তারা স্মরণ করে পিতামাতার তত্ত্বাবধানে তারা স্বাধীন ছিলো, তাদের সামনে ছড়ানো ছিলো মুক্ত ভবিষ্যৎ এখন তারা কম নিরাপদ, এবং তারা বর্তমানের মধ্যে রুদ্ধ হয়ে আছে চাকর বা বস্তুর মতো; একদা তাদের সামনে ছিলো জয় করার জন্যে বিশ্ব, এখন তারা পরিণত হয়েছে সাধারণ্যে : লাখ লাখ স্ত্রী ও গৃহিণীর একটিতে। সে হয়ে উঠেছে যে-নারী, সে আক্ষেপ করে সে-মানুষটির জন্যে, যা সে ছিলো এক সময়, এবং সে আবার দেখতে চায় তার ভেতরের মৃত শিশুটিকে, এমনকি পুনর্জীবিত করতে চায় তাকে। তাই সে ভাবার চেষ্টা করে যে তার রুচি, ভাবনা, আবেগের মধ্যে এখনো আছে একটা অসাধারণ সজীবতা, এমনকি আছে কিছুটা অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য ও বিশ্বকে না মানার ঔদ্ধত্য : ‘তুমি আমাকে চেনো’; ‘ওই দিক দিয়ে আমি অদ্ভুত’; ‘আমাকে ঘিরে আমি ফুল চাই’; ইত্যাদি। তার আছে একটি প্রিয় রঙ, একজন প্রিয় গায়ক, বিশেষ বিশ্বাস ও কুসংস্কার, যা সাধারণ্যের থেকে ওপরের। তার অনন্য ব্যক্তিত্ব প্রকাশ পায় বস্ত্রে ও তার ‘অভ্যন্তর’-এ; সে তৈরি করে একটি ডবল, যা প্রায়ই রেখাচিত্রিক, তবে কখনো কখনো সেটি হয়ে ওঠে একটি নির্দিষ্ট সম্রান্ত ব্যক্তি, যার ভূমিকায় নারীটি জীবনভর অভিনয় করছে। বহু নারী নিজেদের দেখতে পায় সাহিত্যের নায়িকাদের মধ্যে : ‘সে একেবারে আমার মতো!’ এ-ধরনের অভিন্নতা সে বোধ করতে পারে রূপসী, রোম্যান্টিক নায়িকাদের বা শহিদ নায়িকাদের সাথে। নারী প্রতিমূর্তি হয়ে উঠতে পারে আমাদের দুঃখিনী রমণীর বা অনাদৃত স্ত্রীর : ‘আমি জগতের সবচেয়ে হতভাগিনী নারী’। স্টেকেল এ-ধরনের এক রোগিণী সম্পর্কে বলেছেন : ‘সে আনন্দ পেতো এ-বিষাদান্তক ভূমিকায়অভিনয় করে’।
