সে যে নিজেকে দান করতে পারে নিজের কামনাবাসনার কাছে, তার কারণ হচ্ছে শিশুকাল থেকেই সে নিজেকে একটি বস্তু হিশেবে বোধ করে এসেছে। তার শিক্ষা তাকে বলেছে নিজেকে তার সম্পূর্ণ শরীরের সাথে অভিন্ন করে তুলতে, বয়ঃসন্ধি এদেহকে বিকশিত করেছে অক্রিয় ও কামনার বস্তু বলে; এটা এমন বস্তু, যা সে সাটিন বা মখমলের মতো ছুঁতে পারে, এবং প্রেমিকের দৃষ্টিতে নিবিষ্টভাবে অবলোকন করতে পারে। একলা আনন্দের সময় নারী নিজেকে একটি পুরুষ কর্তা ও নারী কর্মরূপে দুভাগে ভাগ করতে পারে; দালবিজের এক রোগী ইরেন এ-ভঙ্গিতেই কথা বলতো নিজের সাথে নিজে; ‘আমি নিজেকে ভালোবাসতে যাচ্ছি,’ বা আরোসংরাগের সাথে বলতে : ‘আমি নিজের সাথে সঙ্গম করতে যাচ্ছি,’ বা বেদনার প্রবল বিস্ফোরণের সময় বলতো : ‘আমি নিজেকে গর্ভবতী করতে যাচ্ছি’। মারি বাশকির্তসেভ যুগপৎ হয়ে ওঠেন কর্তা ও কর্ম যখন তিনি লেখেন : ‘কী দুঃখ কেউ আমার বাহু ও দেহ দেখতে পায় না, এ-সজীবতা ও যৌবন’।
প্রকৃতপক্ষে, কারো পক্ষেই বাস্তবিকভাবে একজন অপর হয়ে ওঠা এবং নিজেকে সচেতনভাবে একটি বস্তু হিশেবে দেখা অসম্ভব। এ-দ্বৈততা নিতান্তই স্বপ্ন। শিশুর কাছে এ-স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয় পুতুলরূপে; সে নিজের দেহে যেভাবে দেখে নিজেকে তার চেয়ে বেশি মূর্তরূপে নিজেকে দেখে পুতুলের মধ্যে, কেননা সে আর পুতুল বাস্তবিকভাবে পরস্পরপৃথক। নিজের সঙ্গে নিজের একটা প্রীতিপূর্ণ সংলাপ চালানোর জন্যে দরকার পড়ে নিজে দুজন হওয়া, যা, উদাহরণস্বরূপ, প্রকাশ করেছেন মাদাম আনা দ্য নোয়াইলে তাঁর লিভল দ্য ভি-এ :
‘আমি পুতুল ভালোবাসাতাম, সেগুলোকে আমি আমার মতোই জীবন্ত বলে কল্পনা করতাম; আমার চাদরের নিচে উষ্ণভাবে আমি ঘুমোতে পারতাম না, যদি না সেগুলোকে পশম ও মখমলের কাপড়ে ভালোভাবে জড়িয়ে নিতাম… আমি কল্পনা করতাম আমি বাস্তবিকভাবেই উপভোগ করছি বিশুদ্ধ দ্বৈত নির্জনতা… শৈশবের শুরুতে আমি তীব্রভাবে অনুভব করতাম এই পূর্ণাঙ্গ থাকার, নিজে দুজন হওয়ার প্রয়োজন। … আহা, বেদনার মুহূর্তগুলোতে যখন আমার স্বপ্নাতুর মৃদুতা হয়ে উঠতোতিক্ত অশ্রুর বলি, তখন আমার পাশে আমি কতো যে চাইতাম আরেকটি ছোটো আনাকে, যে জড়িয়ে ধরবে আমার গলা, আমাকে সান্ত্বনা দেবে, আমাকে বুঝবে!… পরবর্তী জীবনে আমি তাকে পাই আমার হৃদয়ে এবং তাকে আমি শক্ত করে ধরে রাখি; সে আমাকে যে-সহায়তা দিতো, তা সান্ত্বনারূপে নয়, যেমন আমি আশা করতাম, বরং দিতো সাহসরূপে’।
কিশোরী তার পুতুল ছেড়ে দেয়। কিন্তু নিজেকে প্রক্ষেপ করার প্রচেষ্টায় ও তারপর আত্মপরিচয় লাভে জীবনভর নারী একটা প্রচণ্ড সহায়তা পায় তার আয়নার ইন্দ্রজালের কাছে। কিংবদন্তি ও স্বপ্নে আয়না ও ডবলের মধ্যে সম্পর্কের ওপর আলোকপাত করেছেন মনোবিশ্লেষক অটো র্যাংক। বিশেষ করে নারীতে, প্রতিবিম্বটিকে শনাক্ত করা হয় অহংরূপে। পুরুষে সুদর্শন আকৃতি নির্দেশ করে সীমাতিক্ৰমণতা; নারীতে, সীমাবদ্ধতার অক্রিয়তা; শুধু দ্বিতীয়টির কাজ হচ্ছে স্থির দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং এজন্যে একে ধরা যেতে পারে গতিহীন, রুপোলি ফাদে। পুরুষ নিজেকে সক্রিয়, কর্তা রূপে অনুভব ও কামনা করে নিজেকে সে একটা স্থির মূর্তিতে দেখে না; তার কাছে এর আবেদন খুব কম, কেননা তার কাছে পুরুষের দেহকে একটি কাম্যবস্তু বলে মনে হয় না; আর তখন নারী, নিজেকে একটি বস্তু হিশেবে বোধ করে ও তৈরি করে, বিশ্বাস করে যে আয়নায় সে সত্যিই দেখছে নিজেকে। প্রতিবিম্বটি এক অক্রিয় ও বিদ্যমান ঘটনা, যা তার নিজের মতোই একটি বস্তু; এবং সে যেহেতু লালসা করে মাংস, তার মাংস, তাই সে দেখে যে-কাল্পনিক গুণগুলো, সেগুলোকে সে জীবন্ত করে তোলে তার অনুরাগ ও কামনার মাধ্যমে। মাদাম দ্য নোয়াইলে, যিনি এ-ব্যাপারে বুঝতেন নিজেকে, আমাদের বিশ্বাস করে সে-গোপনকথা বলেছেন নিম্নরূপে :
‘আমার ঘন ঘন-ব্যবহৃত আয়নাটিতে প্রতিফলিত হতো যে-প্রতিবিম্ব, তার থেকে আমি কম অহঙ্কার পোষণ করতাম আমার মেধাগত ক্ষমতা সম্পর্কে, যেগুলোএতো তীব্র ছিলো যে সেগুলো সম্পর্কে সন্দেহের অবকাশ ছিলো না… শুধু শারীরিক সুখই পুরোপুরি পরিতৃপ্ত করে আত্মাকে’।
শারীরিক সুখ কথাগুলো এখানে ব্যবহৃত হয়েছে অস্পষ্ট ও অশুদ্ধভাবে। আত্মাকে যা পরিতৃপ্ত করে, তা হচ্ছে যখন মনকে প্রমাণ করতে হবে নিজেকে তখন সেখানে, আজ, কল্পিত মুখভাবটি আছে এক নিঃসন্দিগ্ধ, বিদ্যমান ঘটনারূপে। সমগ্র ভবিষ্যৎ সংহত হয়ে আছে সে-আলোকপাতের মধ্যে, যা হচ্ছে আয়নার ফ্রেমে বন্দী এক মহাবিশ্ব; এ-সংকীর্ণ সীমার বাইরে সব কিছু এক বিশৃঙ্খল গোলমাল; বিশ্ব পর্যবসিত হয়েছে এ-আয়নার পাতে, যাতে স্থির হয়ে আছে একটি অত্যন্ত উজ্জ্বল মূর্তি : অনন্যা। প্রতিটি নারী, যে তন্ময় হয়ে পড়ে তার প্রতিফলনে, একা, সার্বভৌমরূপে শাসন করে স্থান ও কালের ওপর; তার সমস্ত অধিকার আছে পুরুষ ও সম্পদ, খ্যাতি ও বিনোদ লাভের। মারি বাশকির্তসেভ তার রূপের প্রেমে এতোই মুগ্ধ ছিলেন যে তিনি একে রূপায়িত করতে চেয়েছিলেন অবিনাশী মর্মরে; যখন তিনি লিখেছিলেন এশব্দগুলো, তখন তিনি নিজেকেই দান করেছিলেন অমরত্ব :
