সত্য হচ্ছে নারীরা ধর্মকে ব্যবহার করে নিজেদের বাসনা পরিতৃপ্ত করার একটি ছুতো হিশেবে। সে কি কামশীতল, মর্ষকামী, ধর্ষকামী? মাংসকে অস্বীকার করে, শহিদের অভিনয় করে, তার চারদিকের সমস্ত জীবন্ত প্রণোদনাকে ধ্বংস করে সে। লাভ করে সাধুতা। নিজেকে বিকলাঙ্গ করে, সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে সে কয়েক ডিগ্রি ওপরে ওঠে মনোনীতদের স্তরক্ৰমে; যখন সমস্ত পার্থিব সুখ থেকে বঞ্চিত করে সে শহিদ করে তার স্বামী ও সন্তানদের, তখন সে স্বর্গে তাদের জন্যে তৈরি করতে থাকে একটি শ্রেষ্ঠ স্থান। তার ধার্মিক জীবনীকারের বর্ণনানুসারে ‘নিজের পাপের জন্যে নিজেকে শাস্তি দেয়ার জন্যে’ কর্তোনার মার্গারেত নির্দয় আচরণ করতেন তার অবৈধ সন্তানের সাথে; সমস্ত ভবঘুরে ভিখিরিদের ধাওয়ানোর পরই শুধু তিনি ছেলেটিকে খেতে দিতেন। আমরা দেখেছি, অবাঞ্ছিত সন্তানের প্রতি ঘৃণা এক সাধারণ ঘটনা : এটা দৈববর–আক্ষরিকার্থেই–তাই এর প্রতি ন্যায়নিষ্ঠ ক্রোধ দেখানো যায়। তার দিকে থেকে, সহজ সতী নারীরা সহজেই বিধাতার সাথে সব কিছু ঠিকঠাক করে নেয়; আগামীকাল সে ঘোষণা পাবে তার পাপমুক্তির, এ-আত্মপ্রত্যয় ধার্মিক নারীকে প্রায়ই সাহায্য করে তার আজকের বিবেকের অস্বস্তি জয় করতে।
তাই ‘চিরন্তন’ পুরুষ বলা যেমন বাজেকথা, তেমনি ‘নারী’ সম্পর্কে সাধারণভাবে কোনো কিছু বলাও বাজেকথা। আমরা বুঝতে পারি কেনো সমস্ত তুলনা নিরর্থক, যেগুলো দেখাতে চায় নারী পুরুষের থেকে শ্রেষ্ঠ, নিকৃষ্ট, বা সমান, কেননা তাদের পরিস্থিতি গভীরভাবে ভিন্ন। আমরা যদি পরিস্থিতির অন্তর্গত মানুষদের মধ্যে তুলনা না করে এ-পরিস্থিতিগুলোর তুলনা করি, আমরা স্পষ্টভাবেই দেখতে পাই যে পুরুষ। অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য; এর অর্থ হচ্ছে বিশ্বে তার স্বাধীনতা প্রয়োগের জন্যে পুরুষের সুযোগ অনেক বেশি। এর অনিবার্য ফল হচ্ছে পুরুষের সিদ্ধি নারীর সিদ্ধির থেকে অনেক বেশি শ্রেষ্ঠ, কেননা বাস্তবিক কোনো কিছু করা নারীদের জন্যে নিষিদ্ধ। তাছাড়া, তাদের সীমাবদ্ধতার মধ্যে নারী ও পুরুষ তাদের মুক্তিকে কীভাবে কাজে লাগায়, তার তুলনা করা কারণকার্যগতভাবে একটা নিরর্থক প্রচেষ্টা, কেননা তারা যা করে, তা হচ্ছে মুক্তিকে তারা স্বাধীনভাবে কাজে লাগায়। তবে নারীর স্বাধীনতা এখনো বিমূর্ত ও শূন্যগর্ভ বলে সে এটা প্রয়োগ করতে পারে শুধু বিদ্রোহে, যাদের গঠনমূলক কিছু করার কোনো সুযোগ নেই তাদের সামনে খোলা এটাই একমাত্র পথ। বিনাপ্রতিবাদে মেনে নেয়া নিতান্তই অধিকারত্যাগ ও পলায়ন, নিজের মুক্তির জন্যে কাজ করা ছাড়া নারীর আর কোনো পথ নেই।
এ-মুক্তি অবশ্যই হতে হবে যৌথ এবং এর জন্যে সবার আগে সম্পন্ন করতে হবে নারীর অবস্থার আর্থনীতিক বিবর্তন। আগেও অনেকে করেছে, এবং এখনো অনেক নারী একক উদ্যোগে চেষ্টা করছে ব্যক্তিগত পরিত্রাণের। তাদের সীমাবদ্ধতার মধ্যে তারা চেষ্টা করছে নিজেদের অস্তিত্বের যাথার্থ্য প্রতিপাদনের–অর্থাৎ বাস্তবায়িত করতে চাচ্ছে সীমাবদ্ধতার মধ্যে সীমাতিক্রমণ। এটা কখনো কখনো হাস্যকর, প্রায়ই করুণ, তবে এটা হচ্ছে তার কারাগারকে গৌরবের স্বর্গে, তার দাসত্বকে সার্বভৌম মুক্তিতে রূপান্তরিত করার জন্যে কারারুদ্ধ নারীর চূড়ান্ত প্রচেষ্টা, যা আমরা দেখতে পাবো আত্মরতিবতীতে, প্রণয়িনী নারীতে, অতীন্দ্রিয়বাদীতে।
আত্মরতিবতী
দ্বিতীয় খণ্ড । ভাগ ৬ –যাথার্থ্য প্রতিপাদন। পরিচ্ছেদ ১
কখনো কখনো ধারণা পোষণ করা হয়েছে যে আত্মরতি হচ্ছে সব নারীর মৌলিক মনোভাব; কিন্তু এ-ধারণাকে বেশি দূর বাড়ানো হচ্ছে একে ধ্বংস করা, যেমন ল্য রশফুকো ধ্বংস করেছেন অহংবাদের ধারণা। আত্মরতি হচ্ছে অভেদত্ববোধের একটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া, যাতে অহংকে গণ্য করা হয় একটি ধ্রুব লক্ষ্য বলে এবং পাত্র নিজের থেকে সরে আশ্রয় নেয় অহংয়ে। আরো অনেক মনোেভাব–সত্য বা মিথ্যে দেখা যায় নারীর মধ্যে, যার কিছু কিছু আমরা আগেই আলোচনা করেছি। তবে একথা সত্য যে অবস্থা পুরুষের থেকে নারীকে অনেক বেশি চালিত করে নিজেকে নিজের প্রতি নিবদ্ধ করতে এবং তার প্রেমকে নিজের প্রতি নিয়োগ করতে।
প্রেমে দরকার পড়ে কর্তা ও কর্মের এক দ্বৈততা। আত্মরতির দিকে নারী চালিত হয় একই গন্তব্য-অভিমুখি দুটি পথ দিয়ে। কর্তা হিশেবে সে বোেধ করে ব্যর্থতা; যখন সে খুবই ছোটো, তখনই তার অভাব সে-বিকল্প অহংয়ের, বালক যা পায় তার শিশ্নে; এর পরে তার আক্রমণাত্মক কাম থেকে যায় অতৃপ্ত। এবং যা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তা হচ্ছে পুরুষসুলভ কাজগুলো তার জন্যে নিষিদ্ধ। সে ব্যস্ত থাকে, কিন্তু সে কিছুই করে না; স্ত্রী, মা, গৃহিণী হিশেবে কাজ করে সে একজন ব্যক্তি হিশেবে স্বীকৃতি পায় না। পুরুষের বাস্তবতা সে যে-গৃহগুলো তৈরি করে, যে-অরণ্যগুলো পরিষ্কার করে, যেসব ব্যাধি সে নিরাময় করে, তার মধ্যে; কিন্তু পরিকল্পিত কোনো কর্ম ও লক্ষ্যের মাধ্যমে নিজেকে চরিতার্থ করতে না পেরে নারী বাধ্য হয় নিজের দেহের সীমাবদ্ধতার মধ্যে নিজের বাস্তবতা খুঁজতে। সিয়েসের উক্তি ব্যঙ্গ করে মারি বাশকির্তসেভ লিখেছিলেন : ‘আমি কী? কিছুই না। আমি কী হবো? সব কিছু’। যেহেতু তারা কিছুই নয়, তাই বহু নারী চাপা ক্রোধে নিজেদের সমস্ত আগ্রহ নিবদ্ধ করে শুধু তাদের অহংয়ের প্রতি এবং সেগুলোকে এতোটা ফুলিয়ে তোলে যে সেগুলোকে তারা সব কিছুর সাথে তালগোল পাকিয়ে ফেলে। আবার, মারি বাশকির্তসেভ বলেছেন, ‘আমি আমার নিজের নায়িকা’। যে-পুরুষ কাজ করে, সে নিজের সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখতে বাধ্য হয়। অকার্যকর, বিচ্ছিন্ন, নারী নিজের জন্যে কোনোস্থানও পায় না নিজের সম্পর্কে কোনো সুস্থ ধারণাও করতে পারে না; সে নিজের ওপর আরোপ করে পরম গুরুত্ব, কেননা কোনো গুরুত্বপূর্ণ জিনিশেই তার প্রবেশাধিকার নেই।
