নারী যেভাবে দেখে তার দেহকে, তার মধ্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে এ-পরস্পরবিপরীত মূল্য। এটি একটি বোঝা : প্রজাতির সেবায় জীর্ণ হয়ে, প্রতিমাসে রক্তক্ষরণ ঘটিয়ে, অক্রিয়ভাবে বেড়ে উঠে, এটা তার কাছে বিশ্ব সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভের বিশুদ্ধ হাতিয়ার নয়, বরং এটা এক জড় শারীরিক রূপ; এটা আনন্দের সুনিশ্চিত উৎস নয় এবং এটা সৃষ্টি করে ক্ষতের যন্ত্রণা; এটা ধারণ করে বিপদ : নারী তার ‘অভ্যন্তর’ দিয়ে বিপন্ন বোধ করে। অন্তর ক্ষরণক্রিয়ার সঙ্গে স্নায়বিক ও সহানুভূতিশীল সংশ্রয়গুলো, যেগুলো নিয়ন্ত্রণ করে পেশি ও অন্ত্রতন্ত্র, সেগুলোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ফলে এটা এক ‘স্নায়ুবিকারগ্রস্ত’ দেহ। তার দেহ প্রদর্শন করে এমন প্রতিক্রিয়া, যার দায় নিতে নারী অস্বীকার করে; ফুঁপিয়ে কান্নায়, বমনে, শরীরের ভয়ানক আলোড়নে, এটা তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, এটা তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে; এটা তার অন্তরঙ্গতম সত্য, কিন্তু এটা এক লজ্জাজনক সত্য, যাকে সে গোপন রাখে। এবং তবু এটি তার মহিমান্বিত ডবল; আয়নায় একে দেখে তার চোখ ধাঁধিয়ে যায়; এটা প্রতিশ্রুত সুখ, শিল্পকর্ম, জীবন্ত ভাস্কর্য; সে এটিকে রুপায়িত করে, অলঙ্কৃত করে, প্রদর্শন করে। সে যখন আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে স্মিত হাসে, তখন সে ভুলে যায় তার রক্তমাংসের আকস্মিকতাকে; প্রেমের আলিঙ্গনে, মাতৃত্বে তার মূর্তি ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু প্রায়ই, যখন সে তন্ময় হয়ে ভাবে নিজের সম্পর্কে, সে বিস্মিত হয় যে একই সময়ে সে সেই নায়িকা ও সেই মাংস।
রান্নাঘর সরবরাহ করে ও অতীন্দ্রিয় অপ্রতিরোধ্য ভাবোচ্ছ্বাস ঘটিয়ে একইভাবে প্রকৃতি তার সামনে উপস্থিত করে ঐকটি দ্বৈত মুখ। যখন সে গৃহিণী ও মা হয়, তখন সে ছেড়ে দেয় বনেবাদাড়ে স্বাধীনভাবে বিচরণ, তখন সে বেশি পছন্দ করে নীরবে শজির বাগান চাষ করা, সে ফুলদানিতে ফুল সাজায় : তবুও সে অভিভূত হয় চন্দ্রালোক ও সূর্যাস্ত দিয়ে। পার্থিব প্রাণী ও উদ্ভিদের মধ্যে সব কিছুর আগে সে দেখে খাদ্য ও অলঙ্কার; কিন্তু তাদের ভেতরে সঞ্চালিত হয় একটি রস, যা হচ্ছে মহত্ত্ব ও ইন্দ্রজাল। জীবন শুধু সীমাবদ্ধতা ও পুনরাবৃত্তি নয় : এর আলোতে চোখ-ধাঁধানো একটি মুখও আছে; পুষ্পিত উদ্যানে এটা দেখা দেয় সৌন্দর্যরূপে। তার জরায়ুর উর্বরতা দিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে এক সুরে বাঁধা পড়ে নারী ভেসে যায় এর প্রাণসঞ্চারক মৃদুমন্দ বায়ুতেও, যা হচ্ছে চৈতন্য। এবং যতোটা সে থাকে অতৃপ্ত এবং, তরুণীর মতো, যতোটা সে বোধ করে অচরিতার্থ ও অসীম, তার আত্মাও ততোটাই হারিয়ে যাবে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে অসীম দিগন্তের দিকে প্রসারিত পথের দৃশ্য দেখে। তার স্বামী, তার সন্তান, তার গৃহের কাছে দাসীত্বে বন্দী থেকে নিজেকে একাকী, সার্বভৌমরূপে পাহাড়ের ধারে দেখতে পাওয়া হচ্ছে পরমানন্দ; সে তখন আর মা, স্ত্রী, গৃহিণী নয়, সে একটি মানুষ; সে অক্রিয় বিশ্বকে নিবিষ্টভাবে অবলোকন করে, এবং তার মনে পড়ে যে সে একটি পূর্ণাঙ্গ সচেতন সত্তা, একটি অপর্যবসেয় স্বাধীন ব্যক্তি। জলের রহস্য ও পর্বতশিখরের গগনমুখিতার সামনে পুরুষের আধিপত্য মিলিয়ে যায়। যখন সে হাঁটে চিরহরিৎ গুল্মের জঙ্গলের ভেতর দিয়ে, তার হাত ডুবোয় স্রোতধারায়, তখন সে অন্যের জন্য বাঁচে না, বাঁচে নিজের জন্যে। যে-নারী তার সমস্ত দাসীত্বের মধ্যেও বজায় রেখেছে তার স্বাধীনতা, সে প্রকৃতির মধ্যে তার স্বাধীনতাকে ভালোবাসবে অতিশয় আকুল হয়ে। অন্যরা সেখানে অজুহাত পাবে শুধু মার্জিত তুরীয় আনন্দের; এবংগোধূলিবেলায় তারা দ্বিধাগ্রস্ত থাকবে ঠাণ্ডা লাগার বিপদ ও আত্মার পরমোল্লাসের মধ্যে।
স্বাধীনতার বিকাশ ঘটানো–এমনকি নারীর জন্যেও–আধুনিক সভ্যতার একটি দায়িত্ব; এ-সভ্যতায় ধর্ম যতোটা বাধ্যকরণের হাতিয়ার তার চেয়ে অনেক বেশি ধোকা দেয়ার হাতিয়ার। বিধাতার নামে নিজেকে পুরুষের থেকে নিকৃষ্ট বলে মেনে নেয়ার জন্যে নারীকে ততোটা আর আদেশ দেয়া হয় না, বরং, বিধাতাকে ধন্যবাদ, তাকে বিশ্বাস করতে বলা হয় যে সে প্রভুসুলভ পুরুষের সমান; এমনকি বিদ্রোহ করার প্রলোভনকেও দমন করা হয় এ-দাবি করে যে অবিচার যা হয়েছিলো, তা দূরীভূত হয়েছে। নারীকে আর সীমাতিক্রমণ থেকে বঞ্চিত করা হয় না, কেননা নারীকে তার সীমাবদ্ধতা উৎসর্গ করতে হবে বিধাতার কাছে; আত্মার বিশেষ মূল্য পরিমাপ করা হবে শুধু স্বর্গে, পৃথিবীতে তাদের সিদ্ধি অনুসারে নয়। যেমন বলেছেন দস্তয়েভস্কি, এনিম্নলোকে এটা নানা ধরনের কাজের ব্যাপার মাত্র; জুতো পালিশ করার বা একটা সেতু নির্মাণের, সবই একই রকমের অসার দম্ভ; সামাজিক বৈষম্যের থেকে উধ্বস্তরে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে দু-লিঙ্গের সাম্য। এ-কারণেই ছোটো মেয়ে ও কিশোরী তাদের ভাইদের থেকে অনেক বেশি ঐকান্ত্রিকভাবে ধর্মের ভক্ত; বিধাতার চোখ, যা বালকের সীমাতিক্ৰমণতাকে অতিক্রম করে যায়, বালকটিকে লজ্জিত করে : এ-মহাশক্তির। অভিভাবকত্বের নিচে সে চিরকাল থাকবে শিশু; তার পিতার অস্তিত্ব নপুংসকীকরণের যে-ভয় দেখিয়েছিলো তাকে। এটা তার থেকেও বেশি আমূলবাদী নপুংসকীকরণ। তবে ‘চিরশিশু’টি যদি হয় স্ত্রীলিঙ্গ, তাহলে সে এ-চোখের কাছে পাপ থেকে পরিত্রাণ লাভ করে, যা তাকে রূপান্তরিত করে দেবদূতদের বোনে। এটা রহিত করে শিশ্নের সুবিধা। হীনম্মন্যতা গূঢ়ৈষা এড়োনোয় ছোটো বালিকার জন্যে আন্তরিক ধর্মবিশ্বাস একটা বিশাল উপকার : সে পুরুষও নয় নারীও নয়, সে বিধাতার জীব।
