তার স্ত্রী প্রায়ই অবাক হয় স্বামীর প্রকাশ্যে উচ্চারিত চমৎকার কণ্ঠস্বর ও আচরণ, এবং ‘অন্ধকারের ভেতরে তার অধ্যবসায়ী উদ্ভাবন’-এর বৈপরীত্য দেখে। সে উচ্চ জন্মহারের পক্ষে প্রচার চালায়, কিন্তু নিজের জন্যে যতোটা সুবিধাজনক তার থেকে বেশি সন্তান জন্মদানের ব্যাপারে সে থাকে সুকৌশলী। সে গুণকীর্তন করে সতী ও বিশ্বাসিনী স্ত্রীর, কিন্তু সে তার প্রতিবেশীর স্ত্রীকে ডাকে ব্যভিচারের জন্যে। আমরা দেখেছি পুরুষ কতোটা ভণ্ডামোর সাথে গর্ভপাতকে একটি অপরাধমূলক কাজ বলে হুকুম জারি করে, আর সেখানে ফ্রান্সে প্রতিবছর পুরুষেরা এক মিলিয়ন নারীকে ফেলে গর্ভপাতের অবস্থানে; স্বামী বা প্রেমিক প্রায়ই চায় এ-সমাধান; এছাড়াও প্রায়ই তারা মৌনভাবে ধরে নেয় যে দরকার হলে এটাই করতে হবে। তারা খোলাখুলিভাবে নির্ভর করে এর ওপর, যাতে নারী স্বেচ্ছাপ্রণোদিতভাবে নিজেকে করে তোলে অপরাধী : পুরুষের শ্রদ্ধেয় নৈতিক সমাজের সঙ্গতিবিধানের জন্যে নারীর ‘অনৈতিকতা’ দরকার।
এ-কপটতার সবচেয়ে জাজ্বল্যমান উদাহরণ হচ্ছে বেশ্যাবৃত্তির প্রতি পুরুষের। মনোভাব, কেননা তার প্রয়োজনেই সৃষ্টি হয় এ-সরবরাহ। আমি উল্লেখ করেছি কী রকম ঘৃণ্য সন্দিগ্ধচিত্ততার সাথে বেশ্যারা দেখে থাকে সম্মানিত ভদ্রলোকদের, যারা সাধারণত এ-পাপের নিন্দা করে, কিন্তু নিজেদের ব্যক্তিগত খেয়াল চরিতার্থ করে ইন্দ্রিয়পরায়ণতার সাথে; তবুও যে-সব মেয়ে নিজেদের দেহ ব্যবহার করে জীবিকা নির্বাহ করে, তাদের তারা গণ্য করে বিকৃত ও ভ্রষ্টা বলে, কিন্তু যে-পুরুষেরা তাদের ব্যবহার করে, তাদের নয়। একটি সত্য কাহিনী চমৎকারভাবে বুঝিয়ে দেয় এমানসিকতা। এ-শতকের শুরুতে বারো ও তেরো বছরের দুটি ছোটো মেয়েকে পুলিশ পায়একটি বেশ্যালয়ে; বিচারে সাক্ষী দেয়ার সময় মেয়ে দুটি তাদের খদ্দেরদের কথা বলে, যারা ছিলো গুরুত্ত্বপূর্ণ ব্যক্তি, এবং একটি মেয়ে তাদের একজনের নামও বলতে যায়। বিচারক তখনই তাকে থামিয়ে দেয় : ‘তুমি একজন সম্রান্ত পুরুষের নামকে কালিমালিপ্ত করতে পারো না’। লেজিআঁ দ’অনর উপাধিভূষিত দ্রলোক একটি ছোটো মেয়ের সতীত্বমোচনের সময়ও থাকেন সম্রান্ত পুরুষ; তার একটু দুর্বলতা থাকতে পারে, তা কার নেই? আর সেখানে ওই ছোটো মেয়েটি, যার কোনো উচ্চাকাঙ্খ নেই বিশ্বজনীন নৈতিকতার জগতের দিকে এগোনোর–যে ম্যাজিস্ট্রেট নয়, বা জেনারেল। নয়, বা একজন মহান ফরাশি নয়, একটা ছোট্ট মেয়ে ছাড়া যে আর কিছু নয়। তারই নৈতিকতা বিপন্ন হয় কামের অনিশ্চিত এলাকায় : সে বিকৃত, দূষিত, পাপিষ্ঠ, সে মানসিক ও নৈতিক সংশোধন গারদে বন্দী থাকার যোগ্য।
নারী পালন করে সে-সব গুপ্তচরের ভূমিকা, ধরা পড়লে যাদের তুলে দেয়া হয়। গুলিবর্ষী সেনাদলের সামনে, এবং সফল হলে বোঝাই করা হয় পুরস্কারে; পুরুষের সমস্ত অনৈতিকতা কাঁধে তুলে নেয়া তার দায়িত্ব : শুধু বেশ্যারাই নয়, সব নারীই পয়ঃপ্রণালির কাজ করে সে-ঝলমলে, স্বাস্থ্যকর সৌধের, যাতে বসবাস করেন সম্রান্ত দ্রজনেরা। তারপর যখন এ-নারীদের কাছে কেউ বলে মর্যাদা, সম্মান, আনুগত্য, পুরুষের সমস্ত অত্যুচ্চ গুণাবলির কথা, তখন এতে বিস্ময়ের কিছু থাকে না যদি তারা এক মত না হয়। তারা পরিহাসের হাসি হাসে বিশেষ করে যখন পুণ্যবান পুরুষেরা তাদের তিরষ্কার করেন নিরাসক্ত না হওয়ার জন্যে, ছল-অভিনয়ের জন্যে, মিথ্যাচারের জন্যে। তারা ভালোভাবেই জানে যে তাদের সামনে মুক্তির আর কোনো পথ খোলা নেই। পুরুষও টাকা ও সাফল্যের ব্যাপারে ‘নিরাসক্ত’ নয়, তবে তার কাজের মধ্যে এগুলো অর্জনের উপায় তার আছে। নারীর জন্যে নির্ধারণ করা হয়েছে পরজীবীর ভূমিকা–এবং প্রতিটি পরজীবীই শোষক। নারীর পুরুষ দরকার মানবিক মর্যাদার জন্যে, খাওয়ার জন্যে, জীবন উপভোগের জন্যে, জন্মদানের জন্যে, সে এসব উপকার পেয়ে থাকে লিঙ্গের সেবাদানের মাধ্যমে; সে যেহেতু এসব ভূমিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ, তাই সে পুরোপুরিভাবে শোষণের এক নিমিত্তত্ব।
পুরুষের প্রতি নারীর অনুভূতির এ-দ্ব্যর্থবোধকতার পরিচয় আবারো পাওয়া যায় নিজের ও বিশ্বের প্রতি তার সাধারণ মনোভাবের মধ্যে। যে-এলাকায় সে বন্দী হয়ে আছে, সেটিকে বেষ্টন করে আছে পুরুষের জগত, কিন্তু সে-জগতে হানা দেয় এমন সব দুর্বোধ্য শক্তি, যেগুলোর কাছে পুরুষেরা নিজেরাই ক্রীড়নক; নারী এসব যাদুকরী শক্তির সাথে মৈত্রির সম্পর্ক পাতায়, কারণ যখন তার পালা আসবে তখন সে ক্ষমতাশীল হবে। সমাজ দাসত্বে বন্দী করে প্রকৃতিকে; কিন্তু প্রকৃতি প্রাধান্য করে তার ওপর। চেতনা দাউদাউ করে জ্বলে উঠে জীবনকে অতিক্রম করে যায়, কিন্তু জীবন যখন আর তাকে সমর্থন করে না, তখন তা আর জ্বলে না। নারীর সত্যতা প্রতিপন্ন হয় এ-দ্ব্যর্থকতা দিয়ে যে নারী অনেক বেশি সত্যতা দেখতে পায় একটি নগরের থেকে একটি বাগানে, একটি ভাবনার থেকে একটি ব্যাধিতে, একটি বিপ্লবের থেকে একটি জন্মের মধ্যে; সে আবার প্রয়োজনীয় হয়েওঠার জন্যে অপ্রয়োজনীয়র বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, সে প্রয়াস চালায় পৃথিবীর, মহামাতার, রাজত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার, যার স্বপ্ন দেখেছিলেন বাখোফেন। পুরুষ বাস করে একটি সমঞ্জস বিশ্বে, যা এমন এক বাস্তবতা ভাবনাচিন্তা দিয়েযা উপলব্ধি করা যায়। নারী সম্পর্কিত এক যাদুবাস্তবতার সাথে, যা অমান্য করে চিন্তাভাবনাকে, এবং সে এটি থেকে মুক্তি পায় এমন চিন্তাভাবনার মধ্য দিয়ে, যার কোনো সত্যিকারের আধেয় নেই। নিজের অস্তিত্বকেএগিয়ে নেয়ার বদলে সে অলীক ধ্যান করে তার নিয়তির বিশুদ্ধ ভাব সম্পর্কে; কাজ। করার বদলে সে কল্পলোকে স্থাপন করে নিজের মূর্তি : অর্থাৎ যুক্তিপ্রয়োগের বদলে সে স্বপ্ন দেখে। এ থেকেই এটা ঘটে যে ‘প্রাকৃতিক’ হয়েও সে আবার কৃত্রিমও, এবং পার্থিব হয়েও সে নিজেকে করে তোলে বায়বীয়। তার জীবন কেটে যায় হাড়িপাতিল ধুয়ে, এবং এটা এক ঝলমলে উপন্যাস; সে পুরুষের অনুগত দাস, তবু সে মনে করে যে সে পুরুষের আরাধ্য মূর্তি; দৈহিকভাবে সে অবমানিত, কিন্তু সে তীব্রভাবে প্রেমের পক্ষে। সে যেহেতু শুধু জীবনের বাস্তব ঘটনাচক্রে জড়িয়ে থাকার জন্যেই দণ্ডিত, তাই সে নিজেকে করে তোলে পরম আদর্শের যাজিকা।
