এক অর্থে তার সমগ্র অস্তিত্বই হচ্ছে প্রতীক্ষা, কেননা সে আটকে আছে সীমাবদ্ধতা ও অনিশ্চিত সম্ভাবনার অবহেলিত অবস্থার মধ্যে; এবং যেহেতু তার যাথার্থ প্রতিপাদন সব সময়ই অন্যদের হাতে। সে প্রতীক্ষা করে পুরুষের শ্রদ্ধাঞ্জলির, অনুমোদনের, সে প্রতীক্ষা করে প্রেমের, সে প্রতীক্ষা করে তার স্বামী বা তার প্রেমিকের কৃতজ্ঞতা ও প্রশংসার। সে তার জীবিকার প্রতীক্ষা করে, যা আসে পুরুষের কাছে থেকে; সে নিজে চেক-বই রাখুক বা স্বামীর কাছে থেকে নিতান্তই সাপ্তাহিক বা মাসিক ভাতা পাক, নারীটিকে দোকানদারের পাওনা শোধের জন্যে বা নিজের জন্যে একটি নতুন পোশাক কেনার জন্যে পুরুষটির দরকার হয় বেতন তোলা। নিজের মুখ দেখানোর জন্যে সে পুরুষের প্রতীক্ষা করে, কেননা তার আর্থিক পরনির্ভরতা তাকে পুরুষের নিয়ন্ত্রণের অধীনে রাখে; পুরুষের জীবনের সে একটি উপাদান মাত্র, আর পুরুষ তার সমগ্র অস্তিত্ব। ঘরের বাইরে স্বামীটির আছে নিজের পেশা, এবং স্ত্রীটিকে দিনভর সহ্য করতে হয় তার অনুপস্থিতি; আর প্রেমিক–যদিও সে সংরক্ত–তবু সে-ই নিজের সুবিধা অনুসারে ঠিক করে কখন তাদের দেখা হবে ও বিচ্ছেদ ঘটবে। বিছানায়, সে প্রতীক্ষায় থাকে পুরুষের কামনার, সে কামনা করে অনেক সময় উদ্বেগভরে–তার আপন সুখের।
মোট সে যা করতে পারে, তা হচ্ছে তার প্রেমিক অভিসারের জন্যে যে-স্থান ঠিক করেছে, সেখানে দেরি করে উপস্থিত হতে পারে, তার স্বামী যে-সময়ে তাকে তৈরি হতে বলেছে, সে-সময়ে সে তৈরি না হতে পারে; ওই উপায়ে সে জ্ঞাপন করে তার নিজের বৃত্তির গুরুত্ব, সে জোর দিয়ে জ্ঞাপন করে তার স্বাধীনতা; এবং ওই মুহূর্তে সে হয়ে ওঠে অপরিহার্য কর্তা, যার ইচ্ছের কাছে অন্যজন অক্রিয়ভাবে আনুগত্য স্বীকার করে। কিন্তু এসব হচ্ছে প্রতিশোধ নেয়ার ভীরু উদ্যোগ; পুরুষদের প্রতীক্ষায় রাখার জন্যে সে নাছোড়বান্দার মতো যতোই অটল থাকুক না কেননা, সে কিছুতেই সেঅন্তহীন ঘন্টাগুলোর ক্ষতিপূরণ করতে পারবে না, যা সে ব্যয় করেছে পুরুষের শুভ ইচ্ছের প্রতীক্ষায় তাকিয়ে থেকে ও আশায় আশায়।
পুরুষের বিশ্বকে নারী উপলব্ধি করতে পারে না, কেননা তাদের অভিজ্ঞতা তাদের যুক্তি ও কৌশল প্রয়োগ করতে শেখায় না; এর বিপরীতে, পুরুষের যন্ত্রপাতি নারীর রাজ্যের সীমান্তে এসে তার শক্তি হারিয়ে ফেলে। মানব-অভিজ্ঞতার আছে একটি সমগ্র এলাকা, পুরুষ ইচ্ছাকৃতভাবে অবহেলা করতে চায়, কেননা সে তা ভাবতে পারে না: যে-অভিজ্ঞতা যাপন করে নারী। যে-প্রকৌশলী তার রেখাচিত্র তৈরির সময় খুবই যথাযথ, বাড়িতে সে আচরণ করে একটা গৌণ দেবতার মতো একটা শব্দ, আর দ্যাখো, তার খাবার দেয়া হয়ে গেছে, তার জামা ইস্ত্রি হয়ে গেছে, তার সন্তানেরা চুপ হয়ে গেছে; জন্মদান মুসার যাদুদণ্ড দোলানোর মতোই এক দ্রুতগতিশীল কর্ম; সে। এসব অলৌকিক কাণ্ডের মধ্যে স্তম্ভিত হওয়ার মতো কিছু দেখতে পায় না। অলৌকিক কারে ধারণা ইন্দ্রজালের বোধ থেকে ভিন্ন; যৌক্তিক কার্যকারণের মধ্যে এটা। উপস্থিত করে কারণহীন ঘটনার এক আমূল ধারাবাহিকতাহীনতা, যার মুখখামুখি ভেঙেচুরে পড়ে চিন্তাভাবনার অস্ত্রগুলো; আর সেখানে ঐন্দ্রজালিক প্রপঞ্চগুলো সমন্বিত হয় গুপ্ত শক্তিরাশির দ্বারা, যার ধারাবাহিকতা–না বুঝেও–গ্রাহ্য হতে পারে সহজ-বশ-মানা একটি মনের কাছে। নবজাতক শিশু পিতৃসুলভ গৌণ দেবতাটির কাছে এক অলৌকিক ব্যাপার, আর সে-মায়ের কাছে এটা এক ঐন্দ্রজালিক ঘটনা, যে তার পেটের ভেতরে এর সঙ্গে আপোষমীমাংসায় পৌছোনোর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। পুরুষটির অভিজ্ঞতা বোধগম্য, তবে বিঘ্নিত হয় নানা ফাঁক দিয়ে; নারীর অভিজ্ঞতা, এর সীমার মধ্যে, রহস্যময় ও অবোধ্য, তবে পূর্ণাঙ্গ। এ-অবোধ্য তাকে করে তোলে গুরুভার; নারীর সঙ্গে তার সম্পর্কের মধ্যে পুরুষটিকে মনে হয় লঘু : পুরুষটির লঘুত্ব হচ্ছে একনায়কদের, সেনাপতিদের, বিচারকদের, আমলাদের, আইনের বিধানের, ও বিমূর্ত নীতিমালার লঘুত্ব। যখন এক গৃহিণী তার কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেছে, ‘পুরুষ, তারা চিন্তা করে না!’, তখন সে নিঃসন্দেহে এটাই বুঝিয়েছে। নারী আরো বলে :’পুরুষ, তারা জানে না, তারা জীবনকে জানে না’। আরাধনারত ম্যান্টিসের কিংবদন্তির বিপরীতে নারী তুলে ধরে চপল ও অনধিকারচর্চাপ্রবণ পুং মৌমাছির প্রতীক।
পুরুষ তার কর্তৃত্বের পক্ষে সানন্দে মেনে নেয় হেগেলের ধারণা যে কোনো নাগরিক নিজেকে অতিক্রম করে বিশ্বজনীনের দিকে প্রসারিত হওয়ার মধ্যেই লাভ করে তার নৈতিক মর্যাদা, তবে ব্যক্তিমানুষ হিশেবে তার অধিকার আছে কামনা পোষণের ও আনন্দ লাভের। তাই নারীর সাথে তার সম্পর্ক অবস্থিত একটি ঘটনাচক্ৰজাত এলাকায়, যেখানে নৈতিকতা আর কাজ করে না, যেখানে আচরণ এক অনীহার ব্যাপার। অন্যান্য পুরুষের সাথে তার সম্পর্কের মধ্যে জড়িয়ে আছে মূল্যবোধ; সে একজন স্বাধীন সংঘটক, যে সকলের কাছে সম্পূর্ণ স্বীকৃত বিধান অনুসারে সম্মুখিন হয় আরেক স্বাধীন সংঘটকের; কিন্তু নারীর সাথে সম্পর্কের মধ্যেনারীকে উদ্ভাবন করা হয়েছিলো এ-উদ্দেশ্যেই–সে বর্জন করে অস্তিত্বের দায়িত্ব, সে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে সমর্পণ করে তার আঁ-সোর কাছে, বা স্থির, হীনতর প্রকৃতির কাছে, সে নিজেকে স্থাপন করে অসত্যতার স্তরে। সে দেখা দেয়স্বৈরাচারী, ধর্ষকামী, হিংস্র, বা বালসুলভ, মর্ষকামী, কলহপ্রিয় রূপে; সে তপ্ত করার চেষ্টা করে তার আবিষ্টতা ও খেয়াল; সামাজিক জীবনে তার অর্জিত অধিকারগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় সে ‘আরামে থাকে’, সে ‘অবসর যাপন করে’।
