যখন অশ্রু তার বিদ্রোহের প্রকাশের জন্যে অপ্রতুল হয়ে ওঠে, তখন সে এমন সব অসম্বন্ধ হিংস্রতার দৃশ্য ঘটায়, যা পুরুষকে আরো বিব্রত করে তোলে। কোনো কোনো সামাজিক বৃত্তে স্বামী তার স্ত্রীকে সত্যিই ঘুষি মারতে পারে; অন্যান্য বৃত্তে সে হিংস্রতার আশ্রয় নেয়া থেকে বিরত থাকে শুধু এ-কারণে যে সে অধিকতর শক্তিশালী এবং তার মুষ্টি একটা কার্যকর অস্ত্র। কিন্তু নারী, শিশুর মতো, ফেটে পড়ে প্রতীকী বিস্ফোরণে : সে আক্রমণ করতে পারে পুরুষটিকে, তাকে মারতে পারে খামচাতে পারে, তবে এটা একটা ইঙ্গিত মাত্র। তবে স্নায়বিক সংকটের নির্বাক অভিনয়ের মধ্য দিয়ে সে প্রকাশ করতে চেয়েছে সে-অবাধ্যতা, যা সে বাস্তবে পালন করতে পারে না। তার ভয়ানক বিক্ষুব্ধ আলোড়নের বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর প্রবণতার শারীরবৃত্তিক কারণ ছাড়াও আছে অন্যান্য কারণ : ভয়ানক বিক্ষুব্ধ আলোড়ন হচ্ছে শক্তির অভ্যন্তরণীকরণ, যা বাইরের দিকে চালিত করার পর সেখানে কোনো বস্তুর ওপর ক্রিয়া করতে ব্যর্থ হয়; এটা হচ্ছে পরিস্থিতিজাত সমস্ত নঞর্থক শক্তির লক্ষ্যহীন বর্ষণ। ছোটো সন্তানদের সাথে মায়ের স্নায়বিক সংকট ঘটেই না, কেননা সে তাদের শাস্তি দিতে পারে, মারতে পারে; বরং তার প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে, তার স্বামী, বা তার প্রেমিক, যাদের ওপর তার কোনো সত্যিকার ক্ষমতা নেই, তাদের সঙ্গেই নারীর ঘটে উন্মত্ত। বদমেজাজের ঘোর। মাদাম তলস্তয়ের স্নায়ুবিকারগ্রস্ত আবেগের বিস্ফোরণ ঘটানোর দৃশ্যগুলো তাৎপর্যপূর্ণ; সন্দেহ নেই কখনোই তার স্বামীকে বোঝার চেষ্টা না করে তিনি খুব ভুল করেছিলেন, এবং তার দিনপঞ্জির আলোকে তাকে মনে হয় অনুদার, সংবেদনাহীন, এবং আন্তরিকতাহীন, তাকে কিছুতেই আকর্ষণীয় মানুষ মনে হয় না। তবে তিনি ঠিক ছিলেন না ভুল করেছিলেন, তা যা-ই হোক, তাতে তার পরিস্থিতির বিভীষিকার বদল ঘটে না। সারাজীবন ভরে তিনি কিছু করেন নি, নিরন্তর নিন্দার মধ্যে, বৈবাহিক বিধির মধ্যে, তাঁকে শুধু সহ্য করতে হয়েছে মাতৃত্ব, নৈঃসঙ্গ, এবং তার ওপর তার স্বামীর চাপিয়ে দেয়া জীবনের ধরন। তলস্তয়ের নতুন কোনো হুকুম যখন বিরোধকে তীব্রতর করে তুলতো, তলস্তয়ের নির্মম ইচ্ছের সামনে তিনি অসহায় হয়ে পড়তেন, তিনি তখন তাঁর অক্ষম শক্তি দিয়ে তার বিরোধিতা করতেন; তিনি ফেটে পড়তেন অস্বীকার করার নাটকীয়তায়–ভান করতেন আত্মহননের, ভান করতেন পালানোর, ভান করতেন অসুস্থতার, এবং আরো এমন বহু কিছুর–এসব তার চারপাশের লোকজনের কাছে মনে হতো উল্কট এবং তার নিজের জন্যে ছিলো ক্ষতিকর। তার পক্ষে এ-ছাড়া অন্য কিছু করা সম্ভব ছিলো, এটা মনে করা খুবই কঠিন, কেননা তার বিদ্রোহের অনুভূতিগুলো গোপন করে রাখার মতো কোনো সদর্থক কারণ তার ছিলো না, এবং সেগুলোকে কার্যকররূপে প্রকাশের কোনো উপায়ও তার ছিলো না।
যে-নারী পৌছে গেছে তার প্রতিরোধের সীমান্তে, তার সামনে খোলা আছে মুক্তির একটি পথ–সেটা আত্মহত্যা। তবে মনে হয় যেনো পুরুষের থেকে নারী এর আশ্রয় নেয় কম। এখানে পরিসংখ্যান খুবই দ্ব্যর্থবোধক। সফল আত্মহত্যার ঘটনা নারীর থেকে পুরুষের ক্ষেত্রে ঘটে অনেক বেশি, তবে নিজেদের জীবন শেষ করে দেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ নারীদের ক্ষেত্রে ঘটে অনেক বেশি। এটা হয়তো এ-কারণে যে নারীরা ভাব দেখিয়েই বেশ তৃপ্তিবোধ করে : প্রকৃতপক্ষে তারা যতোটা চায় তার চেয়ে অনেক বেশি ভান করে আত্মবিনাশের। এটা আংশিকভাবে এ-কারণেও যে প্রচলিত নৃশংস পদ্ধতিগুলো বিকর্ষণীয় : নারীরা প্রায় কখনোই ছুরিকা ও তরবারি বা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে না। তারা, ওফেলিয়ার মতো, সাধারণত জলে ডুবে মরে, একথা প্রমাণ করে যে জলের সাথে নারীর আছে ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ, যেখানে, নিথর অন্ধকারে, জীবনের অক্রিয় অবসান ঘটবে বলে মনে হয়। সাধারণভাবে এখানে আমরা আবার দেখতে পাই সে-দ্ব্যর্থবোধকতা, যার প্রতি আমি আগেই ইঙ্গিত করেছি : নারী যা তীব্রভাবে ঘৃণা করে, নারী তা সততার সঙ্গে প্রত্যাখ্যানের চেষ্টা করে না। সে সম্পর্কচ্ছেদের ভাব করে, কিন্তু পরিশেষে থাকে সে-পুরুষটির সাথেই, যে তার সমস্ত দুঃখকষ্টের কারণ; যে-জীবন তাকে কষ্ট দেয়, সেটি সে ত্যাগ করার ভান করে, কিন্তু তার পক্ষে নিজেকে হত্যা করার সাফল্য লাভ তুলনামূলকভাবে দুর্লভ। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার বিশেষ রুচি নেই। পুরুষের বিরুদ্ধে, জীবনের বিরুদ্ধে, তার পরিস্থিতির বিরুদ্ধে সে প্রতিবাদ করে, কিন্তু সে তার উদ্দেশ্য সাধন করে না।
নারীর আচরণের বহু দিক আছে, যেগুলোকে ব্যাখ্যা করতে হবে প্রতিবাদের নানা রূপ হিশেবে। আমরা দেখেছি নারী প্রায়ই তার স্বামীর সঙ্গে প্রতারণা করে প্রকাশ্যে অবাধ্যতা দেখিয়ে এবং তা আনন্দের জন্যে নয়; এবং সে উদ্দেশ্যমূলকভাবে অসাবধান ও অপব্যয়ী হতে পারে, কেননা তার স্বামী সুশৃঙ্খল ও মিতব্যয়ী। যেনারীবিদ্বেষীরা অভিযোগ করে যে নারীরা সব সময়ই দেরি করে তারা মনে করে নারীর সময়ানুবর্তিতার বোধ নেই; তবে আমরা দেখেছি সত্য হচ্ছে যে নারী সময়ের দাবির সঙ্গে নিজেকে ভালোভাবেই খাপ খাইয়ে নিতে পারে। যখন সে দেরি করে, তখন উদ্দেশ্যমূলক পরিকল্পনা থেকেই দেরি করে। কিছু ছেনাল নারী মনে করে এভাবে তারা উদ্দীপ্ত করে পুরুষের কামনা এবং তাদের উপস্থিতিকে করে তোলে অতিশয় আকর্ষণীয়; কিন্তু একটি পুরুষকে কয়েক মিনিট অপেক্ষা করতে বাধ্য করে নারী সর্বোপরি প্রতিবাদ জানায় সে-দীর্ঘ প্রতীক্ষার বিরুদ্ধে; তার জীবনের বিরুদ্ধে।
