নারী, অবশ্য, পুরুষের বিশ্বকে কিছুটা ভক্তির সঙ্গে মেনে নিতে বাধ্য; যদি সে পুরোপুরি বিরুদ্ধে থাকতো, তাহলে তার মাথার ওপরে একটা চালের অভাবে সে বিপদ বোধ করতো; সুতরাং সে নেয় একটা ম্যানিকীয়বাদী অবস্থান–শুভ ও অশুভর একটা সুস্পষ্ট পৃথককরণ–গৃহিণী হিশেবে তার অভিজ্ঞতাও এটাই নির্দেশ করে। যেব্যক্তি কাজ করে, সে অন্যদের মতো নিজেকেও দায়ী করে শুভ ও অশুভ উভয়েরই জন্যে, সে জানে তাকেই স্থির করতে হবে লক্ষ্য, তাকেই সফল করতে হবে সেগুলো; কর্মের মাধ্যমে সে সচেতন হয় সব প্রতিবিধানের দ্ব্যর্থবোধকতা সম্পর্কে; ন্যায় ও অন্যায়, লাভ ও ক্ষতি অচ্ছেদ্যভাবে মিশ্রিত। কিন্তু যে অক্রিয়, সে থাকে খেলার বাইরে এবং চিন্তার মধ্যেও নৈতিক প্রশ্নগুলো তুলতে অস্বীকার করে : শুভকে বাস্তবায়িত হতেই হবে, যদি তা না হয়, তাহলে নিশ্চয়ই কোনো অপরাধ করা হয়েছে, তার জন্যে দোষীদের শাস্তি দিতে হবে। শিশুর মতোই নারী শুভ ও অশুভকে দেখে সরল মূর্তিতে, সহাবস্থানরত, পৃথক সত্তারূপে; তার এ-ম্যানিকীয়বাদ কঠিন সিদ্ধান্তগ্রহণের উদ্বেগ দূর করে তার মনকে দুশ্চিন্তামুক্ত করে তোলে। কোনটি অশুভ ও কোনটি কম অশুভ, বর্তমানের শুভ ও ভবিষ্যতের বৃহত্তর শুভর মধ্যে কোনটি কাম্য, পরাজয় কী ও বিজয় কী, তা নিজে স্থির করা–এসবের মধ্যে আছে ভয়ঙ্কর ঝুঁকি। ম্যানিকীয়বাদীর কাছে ভালো গম সুস্পষ্টভাবে ভিন্ন আগাছার থেকে, তাই আগাছাগুলো তুলে ফেলে দিলেই হলো; ধুলো সুনিন্দিত এবং পরিচ্ছন্নতা হচ্ছে ধুলোর সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি; গৃহ পরিচ্ছন্ন করা হচ্ছে ময়লা ও আবর্জনা তাড়ানো।
তাই নারী মনে করে ‘সব দোষই ইহুদিদের’, অথবা ফ্রিম্যাসনদের অথবা বলশেভিকদের, বা সরকারের; সে সব সময়ই থাকে কারো বা কোনো কিছুর বিরুদ্ধে। তারা সব সময় জানে না কোথায় নিহিত থাকতে পারে অশুভ নীতিটি, তবে একটি ‘ভালো সরকার’-এর কাছে তারা চায় যে সরকার অশুভকে ঝেড়েমুছে পরিষ্কার করে ফেলবে যেমন তারা বাড়ি থেকে ঝেটিয়ে দূর করে ধুলোময়লা।
তবে সব সময়ই এসব হচ্ছে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশা; এ-অবসরে অশুভ ক্ষয় করতে থাকে শুভকে; এবং সে যেহেতু ইহুদি, ফ্রিম্যাসন, বলশেভিকদের ওপর তার হাত তুলতে পারে না, তাই নারী এর জন্যে দোষী বলে খোঁজে এমন একজনকে, যার বিরুদ্ধে সে তার রোষ প্রকাশ করতে পারে মূর্তভাবে। তার স্বামীটি এ-পছন্দসই বলি। স্বামীটি পুরুষের বিশ্বের প্রতিমূর্তি, যার মাধ্যমে পুরুষের সমাজ গ্রহণ করেছে তার দায়িত্ব ও তার সাথে জোচ্চুরি করেছে। স্বামীটি ধারণ করে বিশ্বের ভর, এবং কিছু। বিগড়ে গেলে সেটা তার দোষ। স্বামীটি যখন রাতে বাড়ি ফেরে, সে তার কাছে অভিযোগ করে সন্তানদের, দোকানদানদের সম্বন্ধে, জীবনযাপনের ব্যয়, তার বাতের ব্যথা, আবহাওয়া সম্পর্কে–এবং চায় যে এর জন্যে স্বামীটি দোষী বোধ করুক। সে মাঝেমাঝেই স্বামীকে মনে করে দুঃখদুর্দশার বিশেষ কারণ বলে; তবে তার প্রথম অপরাধ হচ্ছে সে পুরুষ। স্বামীটির নিজেরই থাকতে পারে অসুস্থতা ও উদ্বেগ—’সেটা ভিন্ন’–তবে স্বামীটির আছে এমন এক বিশেষাধিকার, যা তার কাছে নিরন্তর একটা অবিচার বলে মনে হয়। এটা লক্ষণীয় জিনিশ যে স্বামী বা প্রেমিকের প্রতি সে যেবৈরিতা বোধ করে, সেটা তাকে স্বামী বা প্রেমিকের থেকে বিচ্ছিন্ন করার বদলে। তাদের প্রতি অনুরক্ত করে। যে-পুরুষ তার পত্নী বা উপপত্নীকে তীব্রভাবে ঘৃণা করতে শুরু করেছে, সে চেষ্টা করে তাদের থেকে দূরে সরে যেতে; কিন্তু নারী যে-পুরুষকে ঘৃণা করে, তাকে সে হাতের কাছাকাছি চায়, যাতে তাকে সে ব্যয় বহন করতে বাধ্য করতে পারে। প্রত্যভিযোগ তার দুর্ভাগ্য থেকে মুক্তির নয়, বরং তাতে গড়াগড়ি দেয়ার উপায়; স্ত্রীর পরম সান্ত্বনা নিজেকে শহিদ হিশেবে দাবি করা। জীবন, পুরুষ, তাকে পরাজিত করেছে : পরাজয়কেই সে পরিণত করবে বিজয়ে। এটাই ব্যাখ্যা করে কেননা সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে নিজেকে সমর্পণ করে অশ্রুপাত ও দৃশ্যসৃষ্টির কাছে, যেমন সে করতো তার শৈশবে।
নারীর অবলীলায় অশ্রুপাতের অর্জিত ক্ষমতা, নিঃসন্দেহে, অনেকাংশে আসে এঘটনা থেকে যে তার জীবন স্থাপিত একটা বন্ধ্যা বিদ্রোহের ভিত্তির ওপর; এটাও শারীরবৃত্তিকভাবে পুরুষের থেকে তার স্নায়বিক নিয়ন্ত্রণ কম। এবং তার শিক্ষা তাকে শিখিয়েছে অবলীলাক্রমে ভেঙে পড়তে। শিক্ষা, বা প্রথার এপ্রভাব খুবই স্পষ্ট, কেননা অতীতে, উদাহরণস্বরূপ, বেঞ্জামিন কনস্ট্যান্ট ও দিদরোর মতো পুরুষেরাও অশ্রুর বন্যা বইয়ে দিতেন, এবং তারপর পুরুষেরা কাদাকাটি করা থামিয়ে দেয়, যখন এটা আর পুরুষসম্মত থাকে না। তবে, সর্বোপরি, সত্য কথা হচ্ছে বিশ্বের প্রতি একটা নৈরাশ্যপূর্ণ মনোভাব পোষণ করার জন্যে নারী সব সময়ই তৈরি, কেননা সে কখনো একে অকপটে মেনে নেয় নি। কোনো পুরুষ বিশ্বকে মেনে নেয় না; এমনকি দুর্ভাগ্যও তার মনোভাবের পরিবর্তন ঘটাতে পারে সে এর মুখোমুখি দাঁড়ায়, সে ছেড়ে দেয় না; আর সেখানে অল্পতেই নারীর মনে পড়েযায় তার বিরুদ্ধে বিশ্বের বৈরিতা এবং তার প্রতি ভাগ্যের অবিচারের কথা। তখন সে দ্রুত অবসর নেয় তার সবচেয়ে সুনিশ্চিত আশ্রয়স্থলে; নিজের ভেতরে। তার এ-গাল লাল হয়ে ওঠা, এ-রক্তাভ চোখ, এগুলো তার তীব্র শোকাহত আত্মার দৃষ্টিগ্রাহ্য বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কী? তার ত্বকের কাছে স্নিগ্ধশীতল, বড়ো জোর জিভে একটু নোনতা লাগে, একটু তিক্ত হলেও অশ্রু এক রকম মৃদু আদর; এ-দয়ালু ধারার নিচে দগ্ধ হয় তার মুখমণ্ডল। অশ্রু একই সঙ্গে অভিযোগ ও সান্ত্বনা, জ্বর ও শান্তিদায়ক প্রশমন। অশ্রু নারীর পরমতম অজুহাত; ঝোড়ো বাতাসের মতো আকস্মিক, থেকে থেকে দেখা দিয়ে, তুফানের মতো এপ্রিলের বর্ষণের মতো, অশ্রু নারীকে করেতোলে একটি বিলাপাতুর ফোয়ারা, ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ আকাশ। তার দু-চোখ অন্ধ, কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে আসে; দৃষ্টিহীন, চোখ বিগলিত হয় বৃষ্টিধারায়; অন্ধ, সে ফিরে আসে প্রাকৃতিক বস্তুর অক্রিয়তায়। কেউ তাকে জয় করতে চায়, কিন্তু সে নিমজ্জিত হয়ে থাকে তার পরাজয়ের মধ্যে; সে পাথরের মতো নিমজ্জিত হয়, ডুবে মৃত্যুবরণ করে, যে-পুরুষ তার ধ্যান করে তাকে সে এড়িয়ে চলে, যেনো সে কোনো জলপ্রপাতের মুখোমুখি অসহায়। পুরুষটি একে মনে করে অন্যায় কাজ; কিন্তু নারী শুরু থেকেই এ-সংগ্রামকে অন্যায় মনে করে, কেননা তার হাতে আর কোনো কার্যকর অস্ত্র তুলে দেয় হয় নি। সে আরেকবার নিয়েছে যাদুর আশ্রয়। এবং তার ফুপিয়ে কান্না যে পুরুষকে রাগিয়ে তোলে, তাও তার ফুঁপিয়ে কান্নার আরেক কারণ।
