কিন্তু কোনো অস্তিত্বশীলই সন্তুষ্ট থাকতে পারে না একটি অপ্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করে, কেননা তা অবিলম্বে উপায়কেই করে তোলে লক্ষ্য–যা দেখা যায়, উদাহরণ হিশেবে, রাজনীতিবিদদের মধ্যে এবং উপায়ের মূল্যকেই ধ্রুব মূল্য বলে মনে হতে থাকে। তাই সত্য, সৌন্দর্য, স্বাধীনতার উর্ধ্বে গৃহিণীর স্বর্গে রাজত্ব করে উপযযাগিতা; এবং এ-পরিপ্রেক্ষিতেই সে মনে মনে আঁকে সমগ্র বিশ্বের ছবি। এজন্যেই সে গ্রহণ করে সোনালি মধ্যপন্থার আরিস্ততলীয় নৈতিকতা–অর্থাৎ মাঝারিত্বের নৈতিকতা। তাহলে কী করে তার কাছে প্রত্যাশা করা যায় যে সে দেখাবে স্পর্ধা, উৎসাহ, নিরাসক্তি, মহিমা? এসব গুণ তখনই দেখা দেয় যখন কোনো মুক্ত মানুষ অগ্রসর হয় মুক্ত ভবিষ্যতের ভেতর দিয়ে, অনেক পেছনে ফেলে রেখে যায় বিদ্যমান বাস্তবতা। নারীকে আটকে রাখা হয়েছে রান্নাঘরে বা নারীদের খাসমহলে, এবং তারপরও বিস্ময় প্রকাশ করা হয় যে তার দিগন্ত সীমাবদ্ধ। তার ডানা হেঁটে দেয়া হয়েছে, তারপরও মনস্তাপ করা হয় যে সে উড়তে পারে না। তার সামনে খুলে দেয়া যোক ভবিষ্যৎ, তখন সে আর বাধ্য হবে না বর্তমানের মধ্যে কালবিলম্ব করতে।
তার অহমিকার বা গৃহের সীমানার মধ্যে তাকে বন্দী করে রেখে যখন তাকে নিন্দা করা হয় তার আত্মরতি, তার আত্মপ্রচার, ও এগুলোর সব সহবৈশিষ্ট্য : আত্মশ্লাঘা, অভিমান, বিদ্বেষ প্রভৃতির জন্যে, তখন প্রদর্শন করা হয় একই অসামঞ্জস্য। তাকে বঞ্চিত করা হয়েছে অন্যদের সাথে যোগাযোগের সমস্ত বাস্তব সম্ভাবনা থেকে; তার কোনো অভিজ্ঞতা নেই সংহতির আবেদন বা লাভ সম্পর্কে, কেননা তাকে, এককভাবে বিচ্ছিন্ন রেখে, সম্পূর্ণরূপে উত্সর্গ করা হয়েছে তার পরিবারের কাছে। তাই আদৌ তার কাছে প্রত্যাশা করা যায় না যে সে নিজেকে পেরিয়ে এগোবে সর্বসাধারণের কল্যাণের দিকে। সে একগুয়েভাবে অবস্থান করে সে-এলাকায়, যা তার কাছে পরিচিত, যেখানে সে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং যার মাঝে অবস্থান করে সে উপভোগ করে এক ধরনের আশঙ্কাজনক সার্বভৌমত্ব।
সে দরোজায় তালা লাগায় এবং ঝাপ বন্ধ করে দেয়, তবুও নারী তার গৃহে পুরোপুরি নিরাপত্তা করে না। এটা পরিবৃত হয়ে আছে পুরুষের সে-বিশ্ব দিয়ে, যার ভেতরে ঢোকার স্পর্ধা না করে যাকে সে দূর থেকে শ্রদ্ধা করে। এবং যেহেতু সে কৌশলগত দক্ষতা, সুষ্ঠু যুক্তি, এবং সুস্পষ্ট জ্ঞানের সাহায্যে এটিকে বুঝতে পারে না, তাই সে, শিশু ও অসভ্যের মততা, মনে করে যে সে পরিবেষ্টিত হয়ে আছে বিপজ্জনক রহস্য দিয়ে। বাস্তবতা সম্পর্কে তার ঐন্দ্রজালিক ধারণাগুলো সে প্রক্ষেপ করে পুংবিশ্বের ওপর; তার কাছে ঘটনাক্রমগুলোকে মনে হয় অনিবার্য এবং তারপরও ঘটতে পারে যা-কিছু; সে স্পষ্টভাবে সম্ভব ও অসম্ভবের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না এবং প্রস্তুত থাকে সব কিছু বিশ্বাস করার জন্যে, তা যা-ই হোক-না-কেনো। সে। গুজবে কান দেয় এবং গুজব ছড়ায় এবং আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এমনকি যখন সব কিছু শান্ত, তখনও সে উদ্বিগ্ন বোধ করে; রাতে আধােঘুমের মধ্যে পড়ে থেকে তার বিশ্রাম বিঘ্নিত হয় দুঃস্বপ্নের যে-সব রূপ নিয়ে দেখা দেয় বাস্তবতা, সেগুলো দিয়ে; এবং এভাবে অক্রিয়তায় দণ্ডিত নারীর দুয়ে ভবিষ্যতের ভেতরে হানা দিতে থাকে যুদ্ধ, বিপ্লব, দুর্ভিক্ষ, দারিদ্র্য; কোনোকাজ করতে না পেরে সে থাকে দুশ্চিন্তায়। তার। স্বামী, তার পুত্র, যখন কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করে বা মুখখামুখি হয় কোনো জরুরি অবস্থার, তখন তারা নিজেরা ঝুঁকি নেয়; তারা নেয় যে-সব পরিকল্পনা, বিধিবিধান, সেগুলোনির্দেশ করে দুর্বোধ্যতার মধ্য দিয়ে নিশ্চিত পথ। কিন্তু নারী নাকানিচোবানি খেতে থাকে কিংকর্তব্যবিমূঢ়তায় ও অন্ধকারে; সে এতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, কেননা সে কিছুই করে না; তার কল্পনায় সব সম্ভাবনাই সমান বাস্তব : রেলগাড়ি রেলচ্যুত হতে পারে, ভুল হতে পারে অস্ত্রোপচারে, ব্যবসায় ক্ষতি হতে পারে। তার আঁধার রোমন্থনের মধ্যে সে যা প্রয়োগ করার প্রচেষ্টা চালায়, তা তার নিজের শক্তিহীনতার প্রেতচ্ছায়া।
তার দুশ্চিন্তা বিদ্যমান বিশ্বের ওপর তার সন্দেহের প্রকাশ; একে যে তার কাছে মনে হয় আশঙ্কাজনক, ধ্বংসোনথ, তার কারণ সে এর মাঝে অসুখী। অধিকাংশ সময়ই সে বিনা প্রতিবাদে সব কিছু সয়ে যাওয়া সহ্য করে না; সে খুব ভালোভাবেই জানে যে সে কষ্ট পাচ্ছে, কেননা সে কাজ করে তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে; সে নারী, কিন্তু এ-ব্যাপারে তার সাথে আলাপ করা হয় নি। সে বিদ্রোহ করার সাহস পায় না; সে। অনিচ্ছায় আত্মসমর্পণ করে; তার মনোভাব নিরন্তর ভর্তসনার। যাদের কাছে নারীরা তাদের গোপন কথা বলে–চিকিৎসক, পুরোহিত, সমাজকর্মী-তারা সবাই জানে যে নারীদের নিত্যদিনের স্বর হচ্ছে অভিযোগের স্বর। বন্ধুদের মধ্যে নারী তার নিজের সমস্যা নিয়ে কাতর আর্তনাদ করে, এবং তারা সবাই সমস্বরে অভিযোগ জানাতে থাকে ভাগ্যের, বিশ্বের, এবং সাধারণভাবে পুরুষের বিচার সম্বন্ধে।
একটি স্বাধীন মানুষ তার ব্যর্থতার জন্যে দায়ী করে শুধু নিজেকে, সে নেয় এগুলোর দায়দায়িত্ব; কিন্তু নারীর সব কিছুই ঘটে অন্যদের মাধ্যমে, সুতরাং এঅন্যরা দায়ী তার দুঃখকষ্টের জন্যে। তার উন্মত্ত হতাশা অবজ্ঞাভরে প্রত্যাখ্যান করে সব প্রতিবিধান; যে-নারী অভিযোগপরায়ণ, তার কাছে প্রতিবিধানের প্রস্তাব করে কোনো ফল হয় না : সে কোনো প্রতিবিধানকেই গ্রহণযোগ্য মনে করে না। সে জেদের সাথে জীবনযাপন করতে চায় যে-পরিস্থিতিতে সে আছে, তাতেই–অর্থাৎ একটা ক্লীব ক্রোধের অবস্থার মধ্যে। কোনো পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হলে সে আতঙ্কে দু-হাত ওপরে তোলে : ‘ওটিই শেষ খড়কুটো!’ সে জানে তার তোলা অজুহাতগুলো যে-সমস্যার ইঙ্গিত করে, তার সমস্যাগুলো তার থেকে আরো অনেক গভীর, এবং সে জানে এর থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্যে কৌশলের থেকেও বেশি কিছু দরকার। সে সমগ্র বিশ্বকে দায়ী মনে করে, কেননা এটি তৈরি করা হয়েছে তাকে ছাড়া, ও তার বিরুদ্ধে; বয়ঃসন্ধি থেকেই, এমনকি শৈশব থেকেই সে অভিযোগ করে আসছে তার অবস্থার বিরুদ্ধে। তাকে ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে, তাকে। আশ্বাস দেয়া হয়েছে যদি সে তার সৌভাগ্য অর্পণ করে পুরুষের হাতে, তাহলে তা শতগুণে ফিরিয়ে দেয়া হবে এবং সে অনুভব করে তার সাথে জোচ্চুরি করা হয়েছে। সে অভিযুক্ত করে সমগ্র পুংবিশ্বকে। অসন্তুষ্টি হচ্ছে পরনির্ভরতার উল্টো পিঠ : যখন কেউ সব দান করে, প্রতিদানে সে যথেষ্ট পায় না।
