নারীর নিয়তি পচনশীল বস্তুর নিয়তির সাথে বাধা; ওগুলো হারিয়ে তারা সব কিছু হারিয়ে ফেলে। শুধু একজন স্বাধীন কর্তা, যে নিজেকে দৃঢ়ভাবে জ্ঞাপন করে বস্তুরাশির স্থায়িত্বকালের থেকে উর্ধ্বে ও অনেক সুদূরে, সে-ই শুধু রোধ করতে পারে সমস্ত পচন; নারী বঞ্চিত হয়েছে এ-পরম আশ্রয় থেকে। কেননা সে মুক্তিতে বিশ্বাস করে না, তার প্রকৃত কারণ হচ্ছে সে কখনো মুক্তির শক্তিগুলো পরখ করে নি; তার কাছে মনে হয় বিশ্ব যেনোশাসিত হয় একটা অবোধ্য নিয়তির দ্বারা, যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা ধৃষ্টতা। যে-সব বিপজ্জনক পথে তাকে চলতে বলা হয়, সেগুলো সে নিজে বেছে নেয় নি, তাই ওই পথে উদ্দীপনার সঙ্গে না ঝাপিয়ে পড়াই তার পক্ষে স্বাভাবিক। তার সামনে ভবিষ্যৎকে খুলে দাও, তখন সে আর মরিয়া হয়ে অতীত আঁকড়ে থাকবে না। যখন বাস্তব কাজের জন্যে ডাকা হয় নারীদের, যখন তারা নির্ধারিত লক্ষ্যের মধ্যে দেখতে পায় নিজেদের স্বার্থ, তখন তারা পুরুষের মতোই সাহসী ও নির্ভীক।
বহু ক্রটি–মাঝারিত্ব, আলস্য, লঘুচিত্ততা, দাস্যভাব–যে-সবের জন্যে নিন্দা করা হয় নারীদের, সেগুলো শুধু এ-সত্য প্রকাশ করে যে তাদের দিগন্ত রুদ্ধ। বলা হয়ে। থাকে নারী কামাতুর, সে গড়াগড়ি খায় সীমাবদ্ধতায়; কিন্তু প্রথমে তাকে তো আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে এরই মধ্যে। হারেমের দাসী কোনো অসুস্থ সংরাগ পোষণ করে না সংরক্ষিত গোলাপ ও সুবাসিত স্নানের জন্যে; তাকে সময় কাটাতে হবে। যখন নারীর শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসে কোনো নিরানন্দ গাইনিকিউমে–বেশ্যালয়ে বা মধ্যবিত্ত গৃহেসে তখন বাধ্য হয় আরামআয়েশ ও সুখসমৃদ্ধির আশ্রয় নিতে; তাছাড়াও, যদি সে কামসুখলাভের জন্যে ব্যাকুলও হয়, তার কারণ হচ্ছে প্রায়ই সে বঞ্চিত থাকে কামসুখ থেকে। কামে অপরিতৃপ্ত, পুরুষের স্থূলতায় দণ্ডপ্রাপ্ত, ‘পুরুষের কদর্যতায় দণ্ডিত’, সে সান্ত্বনা খোঁজে তেলতেলে চাটনিতে, উৎকট মদে, মখমলে, জলের, রোদের, নারী। বন্ধুর, তরুণ প্রেমিকের স্পর্শাদরের মধ্যে। যদি তাকে এতোই ‘দৈহিক’ প্রাণী বলে মনে হয় পুরুষের, তার কারণ হচ্ছে তার পরিস্থিতি তাকে বাধ্য করে তার পাশবিক প্রকৃতির ওপর চরম গুরুত্ব দিতে। মাংসের ডাকের শব্দ তার মধ্যে পুরুষের থেকে। উচ্চ নয়, তবে সে এর ক্ষীণতম গুঞ্জরণকেও ধরে ফেলে এবং বাড়িয়ে তোলে সেগুলোর ধ্বনি। কামসুখ, বিদীর্ণকর যন্ত্রণার মতো, নির্দেশ করে অব্যবহিতের অপূর্বসুন্দর বিজয়োল্লাস; তাৎক্ষণিকের হিংস্রতার মধ্যে প্রত্যাখ্যান করা হয়ভবিষ্যৎকে ও মহাবিশ্বকে; দেহাগ্নিশিখার বাইরে যা কিছু আছে তা কিছু নয়; মোক্ষলাভের এক্ষণিক মুহূর্তে নারী আর বিকলাঙ্গ ও হতাশাগ্রস্ত থাকে না। তবে সীমাবদ্ধতার এসব বিজয়োল্লাসকে সে মূল্যবান মনে করে শুধু এ-কারণে যে সীমাবদ্ধতাই তার ভাগ্য।
যে-কারণে ঘটে তার ‘শোচনীয় বস্তুবাদ’, সে-একই কারণে ঘটে তার লঘুচিত্ততা; মহৎ জিনিশে তার প্রবেশাধিকার নেই বলে ক্ষুদ্র জিনিশকেই সে মনে করে গুরুত্বপূর্ণ, এবং যে-অন্তঃসারশূন্যতা ভরে রাখে তার দিনগুলোকে সাধারণত সেগুলোই হয় তার কাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব ব্যাপার। তার মোহনীয়তা ও সুযোগসুবিধার জন্যে সে ঋণী তার পোশাক ও রূপের কাছে। প্রায়ই তাকে মনে হয় অলস, নিরুদ্যম; তবে তার জন্যে আছে যে-সব কাজকর্ম, সেগুলো বিশুদ্ধ কালপ্রবাহের মতোই শূন্য। সে যে অনর্থক বকবক করে, লেখে হিজিবিজি করে, সে তা করে তার অলস সময় কাটানোর জন্যে : অসম্ভব কাজের বদলে সে ব্যবহার করে শব্দপুঞ্জ। সত্য কথা হচ্ছে কোনো নারী যখন মানুষের উপযুক্ত কোনো কাজে নিযুক্ত হয়, তখন সে হয়ে উঠতে পারে পুরুষের মতোই সক্রিয়, দক্ষ, মিতবাক ও কৃচ্ছব্রতী।
তাকে অভিযুক্ত করা হয় দাস্যস্বভাবসম্পন্ন বলে; বলা হয়ে থাকে যে প্রভুর পায়ে পড়ার জন্যে ও যে-হাত তাকে আঘাত করে, তাকে চুমো খাওয়ার জন্যে সে সব সময়ই প্রস্তুত, এবং এটা সত্য যে তার অভাব আছে প্রকৃত গর্ববোধের। ‘প্রেমাতুরদের প্রতি উপদেশ’, প্রবঞ্চিত স্ত্রী ও পরিত্যক্ত প্রেমিকাদের প্রতি হিতোপদেশ দেয়া হয় যেস্তম্ভগুলোতে, সেগুলো ভরা থাকে শোচনীয় বশ্যতাস্বীকারের চেতনায়। নারী নিজেকে শ্রান্ত করে তোলে উদ্ধত ভাবাবেগপূর্ণ দৃশ্য ঘটিয়ে, কিন্তু শেষে কুড়িয়ে নেয় তার দিকে অবহেলায় পুরুষের ছুঁড়ে দেয়া ক্ষুদকুঁড়ো। কিন্ত পুরুষের সাহায্য ছাড়া নারী কী করতে পারে, যার কাছে পুরুষ হচ্ছে জীবনধারণের একমাত্র উপায় ও কারণ? সে প্রতিটি অবমাননা ভোগ করতে বাধ্য; ক্রীতদাসের থাকতে পারে না মানুষের মর্যাদাবোধ; নিজের চামড়া বাঁচাতে পারাই দাসের জন্যে যথেষ্ট।
এবং পরিশেষে, নারী যদি হয়েই থাকে পার্থিব প্রবৃত্তিসম্পন্ন, বৈশিষ্ট্যহীন, স্কুল উপযোগিতাবাদী, তার কারণ হচ্ছে তাকে বাধ্য করা হয়েছে রান্নাবান্না ও ডাইয়াপার ধােয়ার কাজে তার সমগ্র অস্তিত্ব নিয়োগ করতে–এটা মহিমান্বিত বোধ করার পথ নয়। তার দায়িত্ব হচ্ছে জীবনের সমস্ত মূঢ়োচিত কাজগুলো নিয়ে জীবনের একঘেয়ে পুনরাবৃত্তি নিশ্চিত করা। নারীর পক্ষে পুনরাবৃত্তি করা, উদ্ভাবন না করে আবার শুরু করা স্বাভাবিক, তার কারণ সময়কে তার মনে হয় শুধু আবর্তন ও আবর্তন, যা কখনো কোনো অভিমুখে অগ্রসর হয় না। সে কখনো কিছু না করেই ব্যস্ত থাকে, এবং তাই তার যা আছে তার সাথেই সে অভিন্ন করে তোলে নিজেকে। বস্তুর ওপর এনির্ভরশীলতা, যা পুরুষ তাকে যে-পরনির্ভরতায় রাখে তারই পরিণতি, ব্যাখ্যা করে তার মিতব্যয়িতার, তার ধনসম্পত্তির লালসার কারণ। তার জীবন কখনোই কোনো লক্ষ্যের অভিমুখি নয় : সে নিবিষ্ট বস্তু উৎপাদনে ও সেবাযত্নে, যেমন খাবার, পোশাকপরিচ্ছদ, ও আশ্রয়, যেগুলো উপায়ের থেকে বেশি কিছু নয়। এসব বস্তু হচ্ছে পাশবিক জীবন ও স্বাধীন অস্তিত্বের মাঝে অপ্রয়োজনীয় যোগাযোগের মাধ্যম। অপ্রয়োজনীয় উপায়গুলোর সাথে যুক্ত হয় যে-একটি মাত্র মূল্য, তা হচ্ছে উপযোগিতা; গৃহিণী বেঁচে থাকে উপযোগিতার স্তরেই, আর সে একথা ভেবে শ্লাঘা বোধ করে না যে সে তার জাতির কাছে একটি উপকারী লোকের থেকে বেশি কিছু।
