এ-একগুঁয়ে ভক্তি পরিস্থিতি অনুসারে নিতে পারে দুটি রূপের মধ্যে একটি রূপ : হতে পারে যে নারী সংরক্তভাবেই অনুগত বিধানটির আধেয়র বা সে অনুগত নিতান্তই তার শূন্যগর্ভ রূপের। যদি সে অন্তর্ভুক্ত হয়সুবিধাভোগী অভিজাতশ্রেণীর, যারা লাভবান হয় প্রচলিত সমাজব্যবস্থায়, তাহলে সে চায় ব্যবস্থাটি থাকবে অটল এবং এবাসনায় সে থাকবে লক্ষণীয়ভাবে অনমনীয়। পুরুষ জানে যে সে বিকাশ ঘটাতে পারে ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের, আরেক জীবনবিধানের, নতুন আইনগত বিধির; যা আছে তা অতিক্রম করে যাওয়ার নিজের সামর্থ সম্পর্কে সে সচেতন, তাই সে ইতিহাসকে গণ্য করে এক ধরনের হয়ে-ওঠা বলে। সবচেয়ে রক্ষণশীল পুরুষও জানে কোনো-নাকোনো ধরনের বিবর্তন অনিবার্য এবং বুঝতে পারে তাকে ওই বিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়াতে হবে তার কর্মকে ও তার চিন্তাকে; কিন্তু নারী ইতিহাসে অংশ নেয় না বলে সে এর প্রয়োজনীয়তাগুলো বুঝতে ব্যর্থ হয়; ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সে সন্দেহজনকভাবে। সন্দিগ্ধ এবং রোধ করতে চায় সময়ের প্রবাহ। যদি তার পিতার, তার ভ্রাতাদের, তার স্বামীর প্রতিষ্ঠিত মূর্তিগুলো ভেঙে চুরমার করা হয়, তাহলে স্বৰ্গকে আবার অধ্যুষিত করার কোনোপথ সে দেখতে পায় না; প্রচণ্ড তীব্রভাবে সে ছোটে পুরোনো দেবতাদের রক্ষা করার জন্যে।
মার্কিন বিচ্ছিন্নতাবাদী যুদ্ধের সময় দাসপ্রথা টিকিয়ে রাখার জন্যে কোনো দক্ষিণীই নারীদের থেকে প্রবলতরভাবে আবেগগাদ্দীপ্ত ছিলো না। বুয়োর যুদ্ধের সময় ইংল্যান্ডে, কম্যিউনের সময় ফ্রান্সে, নারীরাই প্রজ্বলিত হয়েছিলো সবচেয়ে যুদ্ধংদেহিভাবে। তারা তাদের নিষ্ক্রিয়তার ক্ষতিপূরণ করতে চেয়েছিলো তাদের প্রদর্শিত আবেগের তীব্রতা দিয়ে। যখন জয় হয়, তখন তারা হায়েনার মতো ছুটে গিয়ে পড়ে পরাভূত শক্রর ওপর; পরাজয়ে, তারা তিক্ততার সাথে প্রত্যাখ্যান করে মীমাংসার যে-কোনো প্রচেষ্টা। তাদের ভাবনাচিন্তাগুলো যেহেতু নিতান্ত মনোভাব মাত্র, তাই তারা নির্বিকারভাবে। সমর্থন করে অতিশয় বাতিল ব্যাপারগুলো; ১৯১৪তে তারা হতে পারে বৈধতাবাদী, ১৯৫৩তে জারবাদী। পুরুষেরা অনেক সময় সহাস্যে তাদের উৎসাহিত করতে পারে, কেননা তাদের সংযত ভাষায় প্রকাশিত ভাবনাচিন্তা নারীদের মধ্যে কী উগ্ররূপ ধারণ করতে পারে, তা দেখে তারা কৌতুকবোধ করে; তবে তাদের ভাবনাচিন্তা এমন। নির্বোধ, একগুঁয়ে রূপ ধারণ করেছে দেখে তারা বিরক্তও বোধ করতে পারে।
নারী এ-অদম্য মনোভাব পোষণ করে শুধু শক্তভাবে সংহত সভ্যতায় ও সামাজিক শ্ৰেণীতে। আরো সাধারণভাবে, সে আইনকে শ্রদ্ধা করে কেননা তা আইন, যেহেতু তার বিশ্বাস অন্ধ; আইন বদলে গেলেও এটা টিকিয়ে রাখে তার যাদুমন্ত্র। নারীর চোখে জোরই অধিকার, কেননা পুরুষের যে-অধিকারগুলো সে স্বীকার করে, সেগুলো তাদের শক্তির ওপর নির্ভরশীল। তাই যখন ভেঙে পড়ে কোনো সমাজ, তখন নারীরাই প্রথম নিজেদের ছুঁড়ে দেয় বিজয়ীর পদতলে। সার্বিকভাবে, যা আছে, তা তারা মেনে নেয়। তাদের অন্যতম স্বাতন্ত্র্যনির্দেশক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বিনাপ্রতিবাদে মেনে নেয়া। পম্পেইর ধ্বংসস্তৃপ যখন খোঁড়া হয়, তখন দেখা যায় যে স্বৰ্গকে অমান্য করে বা পালানোর চেষ্টায় পুরুষদের ভস্মীভূত দেহগুলো স্থির হয়ে আছে বিদ্রোহের ভঙ্গিতে, সেখানে নারীদের দেহগুলো, দু ভাঁজ হয়ে, মাথা নত করে মুখ ঠেকিয়ে আছে মাটিতে। নারীরা বোধ করে যে তারা বিভিন্ন বস্তু : অগ্নিগিরি, পুলিশ, পৃষ্ঠপোষক, পুরুষের বিরুদ্ধে শক্তিহীন। ‘নারী জন্মেছে দুঃখভোগের জন্যে,’ তারা বলে; ‘এ-ই জীবন–এর আর কিছু করা যাবে না’।
এ-বিনাপ্রতিবাদে মেনে নেয়ার ফলে দেখা দেয় নারীর বহুলপ্রশংসিত ধৈর্যশীলতা। তারা পুরুষের থেকে অনেক বেশি দৈহিক যন্ত্রণা সহ্য করতে পারে; পরিস্থিতির প্রয়োজনে তারা ধারণ করতে পারে স্টোয়িকধর্মী সাহস; পুরুষের আক্রমণাত্মক ঔদ্ধত্য তাদের নেই বলে বহু নারী তাদের অক্রিয় প্রতিরোধের মধ্যে দেখিয়ে থাকে প্রশান্ত ধৈর্যশীলতা। স্বামীদের থেকে অনেক বেশি উদ্যমের সাথে তারা সহ্য করতে পারে সংকট, দারিদ্র্য, দুর্ভোগ। কোনো কর্মোদ্যোগে যখন তারা নিয়োগ করে তাদের নিঃশব্দ অটলতা, তখন তারা কখনো কখনো অর্জন করে চমকপ্রদ সাফল্য। ‘নারীর শক্তিকে কখনো কমিয়ে দেখো না’। দয়াবতী নারীর মধ্যে বিনাপ্রতিবাদে মেনে নেয়ার ব্যাপারটি রূপ নেয় তিতিক্ষার; সে সব কিছু সহ্য করে, কারো দোষ দেয় না, কেননা সে মনে করে কোনো মানুষ বা জিনিশ যেমন আছে, তেমন ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না। গর্বিত কোনো নারী তার বিনাপ্রতিবাদে মেনে নেয়ার ব্যাপারটিকে মহৎ গুণে পরিণত করতে পারে, যেমন করেছিলেন মাদাম দ্য শারিয়ের। তবে এটা এক ধরনের বন্ধ্যা পরিণামদর্শিতারও জন্ম দেয়; নারীরা ধ্বংস করা ও নতুন করে তৈরি করার বদলে সব সময়ই চেষ্টা করে সংরক্ষণ করার, খাপ খাওয়ানোর, বিন্যাস করার বিপ্লবের থেকে তারা বেশি পছন্দ করে আপোষমীমাংসা ও খাপ খাওয়ানো।
উনিশশতকে শ্রমিকদের মুক্তির প্রচেষ্টার পথে নারীরা ছিলো অন্যতম বৃহৎ বাধা; একজন ফ্লোরা ত্রিস্তান, একজন লুইস মিশেলের বিপরীতে কতো অজস্র নারী ঝুঁকি না নেয়ার জন্যে অনুনয় করেছে তাদের স্বামীদের কাছে। তারা শুধু ধর্মঘট, বেকারত্ব, ও দারিদ্রকেই ভয় করতো না : তারা ভয় করতো যে বিদ্রোহটাই হয়তো একটা ভুল।
