এবং একথা সত্য যে তার নেই প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, যা দিয়ে সে কর্তৃত্ব করতে পারতো পদার্থের ওপর। তার দিক থেকে সে পদার্থ দিয়ে অধিকার করে না, করে জীবন দিয়ে; এবং হাতিয়ার দিয়ে জীবনকে আয়ত্ত করা যায় না : মানুষ পারে শুধু এর গুপ্ত নিয়মের কাছে বশ্যতা স্বীকার করতে। নারীর কাছে বিশ্বকে তার ইচ্ছে ও তার লক্ষ্যের মাঝামাঝি ‘একটি হাতিয়ারের সন্নিবেশ’, যেমন একে সংজ্ঞায়িত করেছেন হাইডেগার, বলে মনে হয়না; এর বিপরীতে এটা এমন জিনিশ, যা একগুয়েভাবে প্রতিরোধক, অজেয়; এর ওপর আধিপত্য করে চরম বিপর্যয় ও এটি রহস্যময় চাপল্যে পরিপূর্ণ। একটি রক্তাপ্লুত স্ট্রোবেরির এ-রহস্য, যা মায়ের ভেতরে রূপান্তরিত হয় একটি মানুষে, এটা এমন এক রহস্য, যা কোনো গণিত সমীকরণরূপে প্রকাশ করতে পারে না, কোনো যন্ত্র একে ত্বরান্বিত বা বিলম্বিত করতে পারে না; নারী বোধ করে ধারাবাহিকতার এমন শক্তি, যা সবচেয়েউদ্ভাবনকুশল যন্ত্রপাতিও ভাগ বা গুণ করতে অসমর্থ; চান্দ্ৰস্পন্দনের দ্বারা আন্দোলিত হয়ে সে একে অনুভব করে নিজের দেহের ভেতরে; প্রথমে পেকে, তারপর পচে, বছরের পর বছর ধরে। প্রতিদিন রান্নাঘরটিও তাকে শেখায় ধৈর্য ও অক্রিয়তা; এখানে আছে রসায়ন; মেনে চলতে হয় আগুনকে, জলকে, অপেক্ষা করতে হয় চিনি গলার জন্যে, দলা ময়দার তাল ফুলে। ওঠার জন্যে। ঘরকন্নার কাজগুলো অনেকটা প্রযুক্তিগত কর্মপদ্ধতির কাছাকাছি, তবে নারীর কাছে যান্ত্রিক কার্যকারণ প্রমাণ করার জন্যে ওগুলো খুবই প্রারম্ভিক, অতি একঘেয়ে। এছাড়াও, এখানেও জিনিশপত্র চাপল্যপূর্ণ কিছু জিনিশ ধোলাই সহ্য করে কিছু সহ্য করে না, কিছু দাগ ওঠানোযায় কিছু লেগেই থাকে, কিছু জিনিশ নিজে থেকেই ভেঙে যায়, ধুলো গজিয়ে ওঠে উদ্ভিদের মতো।
নারীর মানসিকতা চিরস্থায়ী করে রাখে কৃষিসভ্যতার মানসিকতা, যে-সভ্যতাগুলো পুজো করতো ভূমির যাদুশক্তির : নারী বিশ্বাস করে যাদুতে। তার অক্রিয় কাম তার কামনাকে এমন রূপ দেয় যে তাতে কামকে তার কাছে ইচ্ছে ও আক্রমণ বলে মনে হয় না, বরং মনে হয় এক আকর্ষণ, যা সগোত্র সে-প্রক্রিয়ার, যার ফলে নিমজ্জিত হয় গণকের দণ্ড; তার মাংসের সামান্য উপস্থিতিতেই স্ফীত ও দৃঢ় হয়ে ওঠে পুরুষের লিঙ্গ; তাই গুপ্ত জলধারা কেনো কাপাবে না হেজেলের দণ্ডকে? সে অনুভব করে যে সে পরিবেষ্টিত হয়ে আছে ঢেউ, বিকিরণ, অতীন্দ্রিয় তরল পদার্থ দিয়ে; সে বিশ্বাস করে টেলিপ্যাথিতে, জ্যোতিষশাস্ত্রে, রেডিওথেরাপিতে, সম্মােহনে, থিয়সফিতে, টেবিল-কাত করাতে, অলোকদৃষ্টিতে, বিশ্বাসের-জোরে-নিরাময়কারীতে; তার ধর্ম আদিম কুসংস্কারে পরিপূর্ণ : মোমবাতি, উত্তরদত্ত প্রার্থনা; সে বিশ্বাস করে সন্তরা হচ্ছে প্রকৃতির প্রাচীন চেতনারাশির মূর্তরূপ : এটি রক্ষা করে ভ্রমণকারীদের, এটি রক্ষা করে প্রসূতিকে, অন্য একটি ফিরিয়ে দেয় হারানো জিনিশ, এবং কোনো মহাশ্চর্য বস্তুই তাকে বিস্মিত করতে পারে না। তার মনোভাব যাদু ও প্রার্থনার; বিশেষ ফল লাভের জন্যে সে পালন করে বিশেষ ধরনের পরীক্ষিত ব্ৰতানুষ্ঠান।
কেননা নারীরা শক্তভাবে লেগে থাকে নিত্যনৈমিত্তিকতায়, তা বোঝা বেশ সহজ; তার কাছে সময়ের মধ্যে বিশেষ অভিনবত্বের ব্যাপার নেই, এটা সৃষ্টিশীল প্রবাহ নয়; সে যেহেতু পুনরাবৃত্তিতে দণ্ডিত, ভবিষ্যতের মধ্যে সে দেখতে পায় শুধু অতীতের প্রতিলিপিকরণ। যদি জানা যায় শব্দ ও সূত্র, তাহলে কালের ব্যাপ্তি সম্পর্কিত হয় উর্বরতার শক্তির সাথে–তবে এটা নিজেই নিয়ন্ত্রিত হয় মাস ও ঋতুর ছন্দোস্পন্দ দিয়ে; গর্ভধারণের, ফুল ফোটার প্রতিটি চক্র যথাযথভাবে পুনরাবৃত্তি করে পূর্ববর্তী চক্রটির। চক্রবর্তনশীল প্রপঞ্চের এ-খেলায় সময়ের একান্ত কাজ হচ্ছে ধীরভাবে বিনাশ করা; এটা যেমন নষ্ট করে আসবাবপত্র ও পোশাকপরিচ্ছদ, তেমনি এটা নষ্ট করে মুখমণ্ডল; বছরের পর বছর কাটার সঙ্গে ধীরেধীরে ধ্বংস হয় প্রজননের শক্তি। তাই নারী এই নিরন্তর ধ্বংসের শক্তির ওপর কোনো আস্থা রাখে না।
প্রকৃত কর্ম কী এবং কীভাবে বদলানো যায় বিশ্বের মুখমণ্ডল, সে-সম্পর্কে সে শুধু অজ্ঞই নয়, সে এমনভাবে লীন হয়ে আছে বিশ্বের মাঝে যেনো সে আছে এক বিপুল, অস্পষ্ট নীহারিকার মর্মলোকে। পুরুষের যুক্তি প্রয়োগের সাথে সে পরিচিত নয়। পুরুষের বিশ্বে তার চিন্তাভাবনা কোনো কর্মোদ্যোগের দিকে এগোয় না, কেননা সে কিছুই করে না, তাই তার চিন্তাভাবনাকে দিবাস্বপ্নের থেকে পৃথক করা যায় না। কার্যকারিতার অভাবে বাস্তব সত্য সম্পর্কে তার ধারণা নেই; শব্দ ও মানসচিত্র ছাড়া আর কিছু দিয়ে সে অনুধাবন করে না, এজন্যেই অতিশয় বিপরীতধর্মী দাবিগুলোও তাকে কোনো অস্বস্তি দেয় না; যা সব দিক দিয়েই তার শক্তির সীমার বাইরে, তেমন এলাকার রহস্য ব্যাখ্যা করার জন্যে সে সামান্যও চেষ্টা করে না। তার অভীষ্টের জন্যে চূড়ান্ত অস্বচ্ছ ধারণা নিয়েই সে তৃপ্ত, সে গুলিয়ে ফেলে দল, মতামত, স্থান, ব্যক্তি, ঘটনা; তার মাথা ভরাট অদ্ভুত তালগোল পাকানো বস্তুতে।
তবে, সব সত্ত্বেও, সুস্পষ্টভাবে কিছু দেখা তো তার কাজ নয়, কেননা তাকে শেখানো হয়েছে পুরুষের কর্তৃত্ব মেনে নিতে। তাই সে ছেড়ে দেয় নিজে সমালোচনা করা, অনুসন্ধান করা, বিচার করা, এবং এসব ছেড়েদেয় উৎকৃষ্টতর বর্ণের ওপর। তাই পুরুষের বিশ্বকে তার কাছে মনে হয় এক সীমাতিক্রান্ত সত্য, এক ধ্রুব বস্তু। ‘পুরুষ দেবতা তৈরি করে,’ ফ্রেজার বলেন, ‘তাদের পুজো করে নারীরা’। পুরুষ যেসব মূর্তি তৈরি করেছে, সেগুলোর সামনে তারা পূর্ণ বিশ্বাসে নতজানু হতে পারে না; কিন্তু নারীরা যখন রাস্তায় মুখোমুখি হয় এসব শক্তিশালী মূর্তির, তারা মনে করে এগুলো হাত দিয়ে তৈরি করা হয় নি, এবং বাধ্যতার সাথে নত করে মাথা। বিশেষ করে নেতার মধ্যে তারা মূর্ত দেখতে চায় শৃঙ্খলা ও অধিকার। প্রত্যেক অলিম্পাসেই আছে একটি পরম দেবতা; পুরুষের ঐন্দ্রজালিক সারসত্তা সংহত হতে হবে একটি আদিরূপের মধ্যে, যার নিতান্ত অস্বচ্ছ প্রতিফলন হচ্ছে পিতা, স্বামী, প্রেমিকেরা। তাদের এ-মহাটোটেম পুজো যৌন প্রকৃতির, একথা বলা হবে বিদ্রুপাত্মক; তবে একথা সত্য যে এ-পুজোর মধ্যে তারা সম্পূর্ণরূপে তৃপ্ত করে তাদের শৈশবের বিনাপ্রতিবাদে নতজানু হওয়ার স্বপ্ন। ফ্রান্সে বলজে, পেতা, ও দ্য গলের মতো সেনাপতিরা সর্বদাই পেয়েছে নারীদের সমর্থন; মনে পড়ে সাম্যবাদী পত্রিকা লইয়মানিক্সে নারী সাংবাদিকেরা কিছুকাল আগে কী রকম ধড়ফড়ে কলমে স্তব লিখতেন টিটো ও তার জমকালো উর্দির। তীক্ষ্ণ-চক্ষু, চারকোণা-চোয়ালের সেনাপতি, একনায়ক হচ্ছে সব গভীর সদচিন্তাশীলদের প্রার্থিত দিব্য পিতা, সব মূল্যবোধের পরম নিশ্চয়তাবিধায়ক। বীরদের ও পুরুষের বিশ্বের বিধিবিধানের প্রতি নারীরা যে শ্রদ্ধাশীল হয়, তার কারণ তাদের অকার্যকারিতা ও অজ্ঞতা; তারা এগুলোকে সুষ্ঠু চিন্তার মাধ্যমে গ্রহণ করে না, গ্রহণ করে বিশ্বাস দিয়ে। আর বিশ্বাস তার উগ্র যুক্তিহীন গোঁড়ামির শক্তি পায় এঘটনা থেকে যে এটা কোনোজ্ঞান নয়; এটা অন্ধ, আবেগাতুর, একগুঁয়ে, নির্বোধ; এটা যা ঘোষণা করে, ঘোষণা করে নিঃশর্তভাবে, যুক্তিশীলতার বিরুদ্ধে, ইতিহাসের বিরুদ্ধে, সমস্ত অস্বীকারের বিরুদ্ধে।
