বৃদ্ধ নারীরা তাদের স্বাধীনতায় গর্ববোধ করে; অবশেষে তারা বিশ্বটিকে তাদের নিজেদের চোখে দেখতে শুরু করে; তারা লক্ষ্য করে যে সারাজীবন ভরে তাদের বোকা বানানো হয়েছে ও প্রবঞ্চনা করা হয়েছে; প্রকৃতিস্থ ও সন্দিগ্ধ, প্রায়ই তাদের মধ্যে দেখা দেয় একটা তিক্ত সিনিসিজম। বিশেষ করে, যে-নারী ‘জীবন যাপন করেছে’, সে পুরুষদের এমনভাবে জানে, যা কোনো পুরুষ জানে না, কেননা সে পুরুষের মধ্যে জনগণের কাছে তার যে-ভাবমূর্তি, তা দেখতে পায় নি, বরং দেখেছে ঘটনাচক্ৰজাত একটি ব্যক্তিকে, পরিস্থিতির প্রাণীটিকে। সে নারীদেরও জানে, কেননা তারা অসংযমের সাথে নিজেদের প্রকাশ করে শুধু অন্য নারীদের কাছে : সে দৃশ্যের আড়ালে থেকেছে। তবে তার অভিজ্ঞতা তাকে প্রতারণা ও মিথ্যাচারের মুখোশ খুলে ফেলতে সমর্থ করলেও ওই অভিজ্ঞতা সত্য প্রদর্শন করার মতো যথোপযুক্ত নয়। সে হাসিখুশি থাক বা থাক তিক্ত, বৃদ্ধ নারীর প্রজ্ঞা তখনোথাকে পুরোপুরি নেতিবাচক : এর স্বভাব বিরোধিতাকরণ, অভিযুক্তকরণ, অস্বীকারকরণ; এটা বন্ধ্যা। যেমন তার কাজে তেমনি তার ভাবনাচিন্তায় নারী-পরগাছার পক্ষে লভ্য মুক্তির শ্রেষ্ঠতম রূপ হচ্ছে স্টোয়িকধর্মী বিরুদ্ধাচরণ বা সংশয়বাদী বক্রোক্তি। জীবনের কোনো সময়েই সে একই সঙ্গে কার্যকর ও স্বাধীন থাকতে সমর্থ হয় না।
নারীর পরিস্থিতি ও চরিত্র
দ্বিতীয় খণ্ড । ভাগ ৫ –পরিস্থিতি। পরিচ্ছেদ ৬
এখন আমরা বুঝতে পারছি গ্রিকদের থেকে আমাদের কাল পর্যন্ত নারীর বিরুদ্ধে যতো অভিযোগ তোলা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে কেনো আছে এতো বেশি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। বাহ্যিক কিছু পরিবর্তন সত্ত্বেও নারীর অবস্থা রয়ে গেছে একই, আর এ-অবস্থাই নির্ধারণ করে তা, যাকে বলা হয় নারীর চরিত্র; সে ‘সীমাবদ্ধতায় আনন্দ পায়’, সে বিপরীত। সে সতর্ক ও ক্ষুদ্র, তার কোনো তথ্যবোধ বা যথাযথতাবাধ নেই, তার। আছে নৈতিকতার অভাব, সে ঘুণ্য উপযোগিতাবাদী, সে মিথ্যে, নাটকীয়, স্বার্থান্বেষী ইত্যাদি। এর সব কিছুতেই আছে কিছুটা সত্যতা। তবে অবশ্যই আমাদের লক্ষ্য করতে হবে যে বিচিত্র যে-সব আচরণের বিবরণ পাওয়া গেছে, সেগুলো তার হরমোন কর্তৃক নারীর ওপর আরোপিত হয় নি বা নারীর মস্তিষ্কসংগঠনে সেগুলো পূর্বনির্ধারিত নয় : তার পরিস্থিতিই সেগুলোকে রূপ দিয়েছে ছাঁচে ঢালাই করার মতো করে। এপ্রেক্ষিতেই আমরা চেষ্টা করবো নারীর পরিস্থিতির ওপর একটি সমন্বিত জরিপের। এতে ঘটবে কিছুটা পুনরাবৃত্তি, তবে তার সামগ্রিক অর্থনীতিক, সামাজিক, ও। ঐতিহাসিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চিরন্তনী নারীকে বুঝতে এটা আমাদের সাহায্য করবে।
‘নারীর জগত’কে কখনো কখনো প্রতিতুলনা করা হয় পুরুষের বিশ্বের সাথে, তবে আমাদের আবার এর ওপর জোর দিতে হবে যে নারীরা কখনোই একটি বদ্ধ ও স্বাধীন সমাজ গঠন করে নি; তারা একটি অচ্ছেদ্য অংশ সে-গোষ্ঠির, যা শাসিত হয় পুরুষদের দ্বারা এবং যাতে তাদের আছে একটি অধস্তন স্থান। নিতান্ত সাদৃশ্যবশতই তারা মিলিত একটা যান্ত্রিক সংহতিতে, কিন্তু তাদের অভাব সে-জৈব সংহতির, যার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে প্রতিটি সংহত জনগোষ্ঠি; তাদের সব সময়ই দলবদ্ধ হতে বাধ্য করা হয়–যেমন করা হতো এলিউসিসের রহস্যের কালে তেমনি আজো ক্লাবে, সালয়, সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে একটা প্রতিপক্ষীয় সেবা গড়ে তোলার জন্যে, তবে তারা সব সময়ই এটা স্থাপন করে পুরুষের বিশ্বের কাঠামোর মধ্যেই। এজন্যেই ঘটে তাদের পরিস্থিতির স্ববিরোধ : তারা অচ্ছেদ্যভাবে ও একই সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত পুরুষের বিশ্বের এবং এমন এক এলাকার, যেখান থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা হয় পুরুষের বিশ্বের বিপক্ষে; তাদের নিজেদের জগতে বন্দী হয়ে থেকে, অন্য জগত দিয়ে পরিবেষ্টিত থেকে, তারা কোথাও শান্তিতে স্থির হয়ে বসতে পারে না। তাদের। বশ্যতাকে সব সময়অবশ্যই খাপ খাওয়াতে হয় প্রত্যাখ্যান করার সাথে, তাদের প্রত্যাখ্যান করাকে খাপ খাওয়াতে হয় গ্রহণ করার সাথে, এ-ব্যাপারে তাদের মনোভাব অনেকটা তরুণী মেয়ের মনোভাবের মতো, তবে এটা রক্ষা করা অনেক বেশি কঠিন, কেননা প্রাপ্তবয়স্ক নারীর কাছে এটা নিতান্তই প্রতীকের মাধ্যমে জীবনের স্বপ্ন দেখার ব্যাপার নয়, বরং এটা বাস্তবিকভাবে যাপনের ব্যাপার।
নারী নিজেই মেনে নেয় যে সার্বিকভাবে বিশ্বটি পুরুষেরই; যারা এটিকে রূপায়িত করেছে, শাসন করেছে, এবং আজো এটির ওপর আধিপত্য করছে, তারা পুরুষ। তার দিক থেকে, সে নিজেকে এর জন্যে দায়ী মনে করে না; এটা সত্য যে সে নিকৃষ্ট ও পরনির্ভর; সে হিংস্রতার পাঠ নেয় নি, সে কখনো গোষ্ঠির অন্য সদস্যদের কাছে নিজেকে কর্তা হিশেবে দাঁড় করায় নি। তার মাংসে, তার গৃহে বন্দী থেকে মানুষের মুখাবয়বসম্পন্ন সে-দেবতাদের সামনে, যারা নির্দেশ করে লক্ষ্য ও প্রতিষ্ঠা করে মূল্যবোধ, সে নিজেকে দেখে অক্ৰিয়রূপে। এ-অর্থে সত্যতা আছে সে-প্রবাদের, যা। তাকে নির্দেশ করে ‘চিরশিশু’ বলে। শ্রমিকদের, কালো ক্রীতদাসদের, উপনিবেশের অধিবাসীদেরও–যতো দিন তারা ভীতিকর ছিলো না। বলা হয়েছে প্রাপ্তবয়স্ক শিশু; এটা বোঝাতে যে অন্য মানুষদের প্রণীত শাশ্বত সত্য ও বিধিবিধান তাদের মেনে নিতে হবে বিনাপ্রতিবাদে। নারীর ভাগ্য হচ্ছে একটা সম্মানজনক আনুগত্য। এমনকি চিন্তাভাবনায়ও তার চারদিকের বাস্তবতার ওপর তার কোনো অধিকার নেই। তার চোখে এটা অনচ্ছ।
