এসব আশাভঙ্গের কথা আগেই বুঝতে পেরে অনেক নারী যখন দেখে যে তাদের কন্যারা বড়ো হচ্ছে, তখন তারা গ্রহণ করে উদাসীন মনোভাব; তবে এমন করলেও এতে তারা বিশেষ সুখ পায় না। সন্তানদের জীবনের মানোন্নয়নের জন্যে মার জন্যে দরকার পড়ে বদান্যতা ও নিরাসক্তির এক দুর্লভ সমন্বয়, যাতে সে সন্তানদের কাছে স্বৈরাচারী না হয়ে ওঠে বা সন্তানদের না করে তোলে তার যন্ত্রণাদানকারী।
এমন ঘটতে পারে যে নারীটির কোনো উত্তরাধিকারী নেই বা বংশধর লাভের জন্যে তার আগ্রহ নেই; সন্তান ও সন্ততির সাথে স্বাভাবিক বন্ধনের অভাবে সে কখনো কখনো চেষ্টা করে এর সমতুল্য কৃত্রিম সম্পর্ক সৃষ্টির। সে অল্পবয়স্কদের প্রতি দেখাতে থাকে মাতৃস্নেহ; তার প্রেম প্লাতোয়ী হোক বা না হোক, যখন সে বলে যে সে কোনো একটি অনুগ্রহভাজনকে ‘পুত্রের মতো ভালোবাসে’, তখন সে পুরোপুরি কপটতাপূর্ণ নয় : মায়ের আবেগ, সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে, কম বা বেশি কামনাতুর। এবং প্রায়ই মাতুধর্মী নারীরা মেয়ে দত্তক নেয়। এখানে আবার সম্পর্কগুলো মে-রূপ ধারণ করে, তা কম-বেশি স্পষ্টভাবে যৌন; প্লাতোয়ীভাবেই হোক আর শাঁরীরিকভাবেই হোক, অনুগ্রহভাজনের মধ্যে চাওয়া হয় একটি ডবল, অলৌকিকভাবে নবযৌবনপ্রাপ্ত।
অভিনেত্রী, নর্তকী, গায়িকা হয়ে ওঠে শিক্ষক : তারা ঢালাই করে শিক্ষার্থীদের; বুদ্ধিজীবী–তাঁর কলোম্বীয় নির্জনাবাসে মাদাম দ্য শাবিয়েরের মতো–ভাবাদর্শে। দীক্ষিত করেন তাঁর শিষ্যদের; ধর্মভক্ত চারদিকে জড়োকরে আধ্যাত্মিক কন্যাদের; নাগরালির নারী হয়ে ওঠে মাসি। তাদের ধর্মান্তরিতকরণের প্রতি তারা ব্যাকুল আগ্রহ সৃষ্টি করলেও তা কখনোই উদ্যোগগ্রহণের প্রতি আকর্ষণবশত ঘটে না; সংরক্তভাবে তারা যা চায়, তা হচ্ছে তাদের আশ্রিতাদের পুনর্জন্ম। তাদের স্বৈরাচারী বদান্যতা সৃষ্টি করে প্রায় একই বিরোধ, যা দেখা দেয় রক্তের বন্ধনে জড়িত মা ও মেয়েদের মধ্যে পৌত্রপৌত্রী দত্তক নেয়াও সম্ভব; এবং চাচাতো দাদীরাও নির্দ্বিধায় পালন করে পিতামহীর মতো ভূমিকা। তা যা-ই হোক, নারীর পক্ষে তার স্বাভাবিক ও দত্তক উত্তরাধিকারীর মধ্যে তার ক্ষীয়মান বছরগুলোর যাথার্থপ্রতিপাদন লাভ দুর্লভ : সে এই তরুণ অস্তিত্বদের সত্যিকারভাবে নিজের জীবনে পরিণত করতে ব্যর্থ হয়।
এখানে আমরা মুখোমুখি হই বৃদ্ধ নারীর করুণ ট্র্যাজেডির : সে বুঝতে পারে যে সে অপ্রয়োজনীয়; সারাজীবন ভরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নারীকে প্রায়ই সমাধান করতে হয়েছে সে কীভাবে সময় কাটাবে এ-হাস্যকর সমস্যাটি। তবে যখন সন্তানেরা বড়ো হয়ে গেছে, স্বামী একজন প্রতিষ্ঠিত মানুষ বা অন্তত স্থির হয়ে বসেছে, তখনো তাকে কোনো উপায়ে সময় কাটাতে হবে। সূচের কারুকর্ম উদ্ভাবিত হয়েছিলো তাদের ভয়ঙ্কর আলস্যকে ঢাকা দেয়ার জন্যেই; হাত নকশি করে, হাত বোনে; হাত সচল। এটা কোনো প্রকৃত কাজ নয়, কেননা উৎপাদিত পণ্যটি লক্ষ্যবস্তু নয়; এর গুরুত্ব তুচ্ছ, এবং এটা দিয়ে কী করা হবে, সেটাই অনেক সময় সমস্যা–এটা থেকে মুক্তি পাওয়া যেতে পারে, হয়তো, কোনো বন্ধুকে বা কোনো দাতব্য সংস্থায় দান করে, বা ম্যান্টলপিস বা মধ্যবর্তী টেবিলের ওপর গাদাগাদি করে রেখে। এটা আর খেলা নয় যে এর অপ্রয়োজনীয়তাই প্রকাশ করবে জীবনধারণের বিশুদ্ধ আনন্দ; এটা আদৌ পলায়নও নয়, কেননা মনটা থাকে শূন্য। এটা পাস্কালের বর্ণিত ‘উদ্ভট কৌতুক’; সূচ বা কুশিকাঁটা দিয়ে নারী বিষন্নভাবে বোনে তার দিনগুলোর শূন্যতা। জলরঙ, সঙ্গীত, বইপড়াকাজ করে একইভাবে; কর্মহীন নারী নিজেকে এসব ব্যাপারে নিয়োগ করে পৃথিবীর ওপর তার অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে না, শুধু দূর করতে চায় তার অবসাদগ্রস্ততা। কোনো কর্ম যদি ভবিষ্যৎকে উন্মুক্ত না করে, তাহলে সেটা ভেঙে পড়ে নিরর্থ সীমাবদ্ধতায়; কর্মহীন নারী বই খোলে এবং একপাশে ফেলে রাখে, পিয়াননা খোলে শুধু বন্ধ করার জন্যে, আবার শুরু করে তার নকশি তোলার কাজ, হাই তোলে এবং শেষে তুলে ধরে টেলিফোন।
বৃদ্ধ নারী সাধারণত প্রশান্ত হয় জীবনের একেবারে শেষ দিকে, যখন সে ত্যাগ করেছে লড়াই, যখন মৃত্যু ঘনিয়ে আসতে আসতে তাকে মুক্তি দেয় ভবিষ্যতের সব ভাবনা থেকে। তার স্বামী সাধারণত তার থেকে বুড়ো, এবং সে নিঃশব্দে আশ মিটিয়ে দেখে তার স্বামীর ক্রমবিনাশ–এটা তার প্রতিশোধগ্রহণ। স্বামী আগে মারা গেলে সে প্রফুল্লভাবে স্বীকার করে নেয় এ-ক্ষতি; প্রায়ই দেখা গেছে যে বৃদ্ধ বয়সে স্ত্রীর মৃত্যুতে পুরুষেরা বেশি কষ্ট পায় স্বামীর মৃত্যুতে স্ত্রীদের কষ্টের থেকে; স্বামীরা বিয়েতে বেশি লাভবান হয় স্ত্রীদের থেকে, বিশেষ করে বুড়ো বয়সে। কেননা তখন বিশ্ব কেন্দ্রীভূত হয় গৃহের সীমানার মধ্যে; বর্তমান তখন আর ভবিষ্যতের সীমান্তবর্তী নয়। এ-সময়ে স্ত্রী আধিপত্য করে দিনগুলোর ওপর এবং রক্ষা করে তাদের সহজ ছন্দোস্পন্দ। পুরুষটি যখন তার চাকুরিবাকুরি ছেড়ে দেয়, তখন সে হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়; তার স্ত্রী অন্তত তখন ঘরসংসার দেখাশোনা করে; স্ত্রীটিকে তার স্বামীর দরকার, আর সেখানে স্বামীটি নিতান্তই একটা উৎপাত।
