এটাই ব্যাখ্যা করে কেননা মা থাকে অসন্তুষ্ট, এমনকি পুত্রকে নিয়ে সে অপরিমিত গর্ব বোধ করলেও। সে শুধু একটি জীবন্ত দেহই জন্ম দেয়নি, সে একটি অতিশয় জরুরি অস্তিত্বকেও প্রতিষ্ঠিত করেছে, একথা বিশ্বাস করে সে যখন অতীত ঘটনাবলির প্রতি দৃষ্টিপাত করে, তখন সে নিজেকে ন্যায্য বলে মনে করে; তবে তার ন্যায্যতা। প্রতিপাদন কোনো বৃত্তি নয় : তার দিনগুলোকে কাজে ভরে রাখার জন্যে সে দরকার বোধ করে তার বদান্যতাপূর্ণ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার; সে বোধ করতে চায় যে তার দেবতার জন্যে সে অপরিহার্য; ভক্তকে যে-ধোঁকা দেয়া হয় এ-ক্ষেত্রে তা উন্মােচিত হয় নিষ্ঠুরতম রীতিতে : পুত্রের স্ত্রী তাকে বঞ্চিত করতে যাচ্ছে তার কাজগুলো থেকে। যে-অপরিচিত নারী তার শিশুকে ‘কেড়ে নিচ্ছে’ তার থেকে, তার প্রতি সে যে-শত্রুতা বোধ করে, তা প্রায়ই বর্ণিত হয়েছে। মা গুণ্ডাটিকে উন্নীত করেছে এক স্বর্গীয় রহস্যের উচ্চতায়, এবং সে এটা মেনে নিতে রাজি নয় যে একটা মানবিক সিদ্ধান্তের থাকতে পারে বেশি গুরুত্ব। তার চোখে মূল্যবোধগুলো ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে, সেগুলো উদ্ভূত হয় প্রকৃতিতে, অতীতকালে : সে ভুল বোঝে স্বাধীনভাবে গৃহীত একটি বাধ্যবাধকতার বিশেষ মূল্যকে। তার পুত্র জীবনের জন্যে তার কাছে ঋণী; গতকালও যে-নারী পুত্রের কাছে ছিলো অচেনা, পুত্র কী ধার ধারে তার কাছে?
প্রাপ্তবয়স্ক কন্যার প্রতি মায়ের মনোভাব অতিশয় পরস্পরবিপরীত মূল্যসম্পন্ন : পুত্রের মধ্যে সে দেখতে চায় একটি দেবতা; তার কন্যার মধ্যে সে পায় একটি ডবল। ডবল একটি সন্দেহজনক সম্রান্ত ব্যক্তি, যে হত্যা করে তার আসলটিকে, যেমন আমরা দেখতে পাই, উদাহরণস্বরূপ, পোর কাহিনীগুলোতে এবং ওয়াইল্ডের দি পিকচার অফ ডোরিয়ান গ্রেতে। তাই নারী হতে গিয়ে কন্যা মৃত্যুদণ্ডিত করে তার মাকে; এবং তবুও সে তাকে বেঁচে থাকতে দেয়। সে ধ্বংসের আভাস দেখতে পায়, না-কি কন্যার বিকাশের মধ্যে দেখে পুনরুজ্জীবন, সে-অনুসারে মায়ের আচরণ হয় বহুবিচিত্র।
বহু মা কঠোর হয় শত্রুতায়; সে মেনে নেয় না সে-অকৃতজ্ঞের দ্বারা অপসারিত হওয়া, যে তার জীবনের জন্যে ঋণী তার কাছে। সজীব কিশোরী মেয়ে, যে উদঘাটিত করে দেয় ছেনালের ছলচাতুরি, তার প্রতি ছেনালের ঈর্ষার ব্যাপারটি প্রায়ই পরিলক্ষ করা হয়েছে : প্রত্যেক নারীর মধ্যেই যে দেখতে পেয়েছে একটি করে ঘৃণ্য প্রতিদ্বন্দ্বী, সে তা-ই আবার দেখতে পাবে এমনকি নিজের কন্যার মধ্যে; সে মেয়েকে দূরে। পাঠিয়ে দেয় বা চোখের আড়ালে রাখে, বা সে তাকে সামাজিক সুযোগ লাভ থেকে বঞ্চিত করার ফন্দি খোঁজে। সে নিজে দৃষ্টান্তমূলক ও অনন্য ধরনে স্ত্রী হয়ে, মা হয়ে বোধ করেছে গর্ব, তবু সে নিজের সিংহাসনচ্যুতির বিরুদ্ধে চালায় প্রচণ্ড যুদ্ধ। সে বলতে থাকে যে তার মেয়ে নিতান্তই শিশু, তার উদ্যোগগুলোকে সে মনে করে বাল্যকালের খেলা; বিয়ের জন্যে সে খুবই ছোটো, প্রজননের জন্যে অতিশয় সুকুমার। যদি মেয়ে স্বামী, গৃহ, সন্তান লাভের জন্যে চাপ দিতে থাকে, এগুলোকে মায়ের কাছে। ভানের থেকে বেশি কিছু বলে মনে হয় না। মা কখনোই মেয়েকে সমালোচনা করতে, অবজ্ঞা করতে, তার বিপদ সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করতে ক্লান্ত হয় না। যদি এটা করতে তাকে অনুমতিও দেয়া হয়, তবুও সে তার মেয়েকে দণ্ডিত করে শাশ্বত শৈশবে : যদি তা না পারে, তাহলে অন্যজন যে-প্রাপ্তবয়স্ক জীবন সাহসের সঙ্গে দাবি করছে, সে চেষ্টা করে তা ধ্বংস করে দিতে। আমরা দেখেছি যে এ-কাজে সে প্রায়ই সফল হয় : এ-অশুভ প্রভাবের ফলে বহু তরুণী নারী থাকে বন্ধ্যা, তাদের ঘটে গর্ভপাত, সন্তান লালনপালনে বা নিজেদের সংসারের দায়িত্ব নিতে তারা ব্যর্থ হয়। দাম্পত্য জীবনকে করে তোলা হয় অসম্ভব। অসুখী, একলা, সে আশ্রয় খোঁজে তার মার সার্বভৌম বাহুতে। যদি সে প্রতিরোধ করে, তাহলে তারা মুখোমুখি হয় নিরন্তর বৈরিতায়; তার কন্যার ঔদ্ধত্যপূর্ণ স্বাধীনতা হতাশাগ্রস্ত মার মনে জাগিয়ে তোলে যে-ক্ষোভ, তার অধিকাংশ সে স্থানান্তরিত করে পুত্রবধুর ওপর।
যে-মা নিজেকে সংরক্তভাবে অভিন্ন করে তোলে নিজের কন্যার সাথে, সেও কম স্বৈরাচারী নয়; সে যা চায় তা হচ্ছে তার পরিপক্ক অভিজ্ঞতার সুবিধা নিয়ে তার। যৌবনকে আবার যাপন করতে, এভাবে নিজেকে এর থেকে বাঁচিয়ে তার অতীতকে উদ্ধার করতে। সে যে-ধরনের স্বামীর স্বপ্ন দেখেছিলো, কিন্তু কখনো পায় নি, তার সাথে খাপ খাইয়ে সে নিজে পছন্দ করবে একটি জামাতা; ছেনালিপূর্ণ, স্নেহপরায়ণ, সে সহজেই কল্পনা করবে যে জামাতা তার নিজের অন্তরের গোপন কোণে বিয়ে করছে তাকেই; কন্যার মাধ্যমে সে পূরণ করবে ধন, সাফল্য, ও খ্যাতির জন্যে তার পুরোনো কামনাগুলো। প্রায়ই চিত্রিত হয়েছে এসব নারী, যারা ব্যাকুলভাবে তাদের কন্যাদের ঠেলে দেয় নাগরালির পথে, চলচ্চিত্রে, বা নাট্যমঞ্চে; কন্যাদের পাহারা দেয়ার অজুহাতে তারা অধিকার করে নেয় কন্যাদের জীবন। আমাকে এমন। কয়েকজনের কথা বলা হয়েছে, যারা এতো দূর পর্যন্ত যায় যে তারা তাদের তরুণী কন্যাদের পাণিপ্রার্থীদের নেয় নিজেদের বিছানায়। কিন্তু কন্যার পক্ষে এ-অভিভাবকত্ব দীর্ঘকাল সহ্য করা সম্ভব হয় না; যখন সে একটি স্বামী বা একটি দায়িত্বশীল রক্ষক পেয়ে যায়, তখন সে বিদ্রোহ করে। যে-শাশুড়ি শুরু করেছিলো জামাতাকে হৃদয়ে ধারণ করে সে তখন হয়ে ওঠে বৈরী; সে মানুষের অকৃতজ্ঞতায় গোঙাতে থাকে, নিজেকে দাবি করতে থাকে শহিদ বলে; সে হয়ে ওঠে একটি বৈরী মা।
