এ-হৃদয়ানুভূতিগুলোকে কতোটা অজাচারী বলে গণ্য করা যায়? সন্দেহ নেই যখন সে আত্মতৃপ্তির সাথে নিজেকে কল্পনা করে পুত্রের বাহুবন্ধনে, তখন বড়ো বোন নামটি হয়ে ওঠে দ্ব্যর্থবোধক কল্পনার একটা সংযত বর্ম; সে যখন নিদ্রিত, সে যখন অসতর্ক, সে যখন স্বপ্নপ্রয়াণে, অনেক সময় সে অত্যাধিক্যই করে; তবে আমি ইতিমধ্যেই। বলেছি যে স্বপ্ন ও উদ্ভট কল্পনাগুলো কোনোক্রমেই কোনো বাস্তবিক কর্মের সংগোপন বাসনার অবিকার্য প্রকাশ নয়। অনেক সময় ওগুলো নিজে নিজেই সম্পূর্ণ, ওগুলো এমন বাসনার পরিতৃপ্তি, যা কাল্পনিক তৃপ্তির বেশি কিছু দাবি করে না। যখন কোনো মা কম-বেশি ছদ্মবেশি রীতিতে পুত্রের মধ্যে প্রেমিককে দেখতে পাওয়ার খেলা খেলে, তখন তা নিতান্তই খেলা। কাম শব্দটি সত্যিকার অর্থে যা বোঝায়, এ-সম্পর্কের মধ্যে তার বিশেষ কোনো স্থান নেই।
তবে এ-দুজন গঠন করে একটি যুগল; মা তার নারীত্বের গভীরতা থেকে সম্ভাষণ জানায় তার পুত্রের মধ্যে নিহিত সার্বভৌম পুরুষকে; প্রণয়িনী নারীর সমস্ত ঐকান্তিকতা নিয়ে সে নিজেকে তুলে দেয় পুত্রের হাতে, এবং, এ-উপহারের বিনিময়ে, সে প্রত্যাশা করে সে একটি আসন পাবে বিধাতার ডান পাশে। এই সশরীরে স্বর্গে প্রবেশের জন্যে প্রণয়িনী নারী আবেদন জানায় তার প্রেমিকের স্বাধীন ক্রিয়ার কাছে; সে অকুতোভয়ে একটি ঝুঁকি নেয়, এবং তার পুরস্কার নিহিত থাকে প্রেমিকের ব্যগ্র দাবিদাওয়ার মধ্যে। অন্য দিকে, মা বোধ করে যে শুধু জন্মদানের মাধ্যমেই সে অর্জন করেছে অলঙ্ঘ্য অধিকার; পুত্রকে তার জীব হিশেবে, তার সম্পত্তি হিশেবে গণ্য করার জন্যে তার প্রতি পুত্রের ঋণ স্বীকারের জন্যে সে অপেক্ষা করে না। প্রণয়িনী নারীর থেকে তার দাবিদাওয়া কম, কেননা তার মধ্যে প্রশান্ত আন্তরিকতাহীনতা বেশি; অর্থাৎ, তার আত্ম-অধিকারত্যাগ অনেক কম উদ্বেগগ্রস্ত; একটি রক্তমাংসের সত্তা তৈরি করে সে নিজের বলে দখল করে একটি অস্তিত্বের মালিকানা : সে আত্মসাৎ করে এর কাজ, এর কর্ম, এর উত্তৰ্ষ। তার পেটের ফলটিকে উন্নীত করে সে নিজেকে উন্নীত করে আকাশমণ্ডলে।
প্রতিনিধিত্ব করে জীবনধারণ সব সময়ই একটা আশঙ্কাজনক কৌশল। যেমন আশা করা হয়েছিলো, সব কিছু তেমন নাও ঘটতে পারে। অধিকাংশ সময়ই পুত্রটি হয় অপদার্থ, একটা গুণ্ডা, একটা ব্যর্থ মানুষ, একটা গবা, একটা অকৃতজ্ঞ। পুত্রটি হবে কোন বীরের প্রতিমূর্তি, সে-সম্পর্কে মায়ের নিজস্ব ধারণা আছে। যে-মা তার শিশুর মধ্যে আন্তরিকভাবে শ্রদ্ধা পোষণ করে মানুষের প্রতি, যে এমনকি পুত্রের ব্যর্থতার মধ্যেও মেনে নেয় তার স্বাধীনতা, যে পুত্রের সঙ্গে মেনে নেয় সাফল্য অর্জনের সমস্ত বাধাবিপত্তিও, তার থেকে আর কিছুই বেশি দুর্লভ নয়। আমরা খুবই মুখখামুখি হই সে-সব মায়ের, যারা সমকক্ষ হতে বা এমনকি ছাড়িয়ে যেতে চেষ্টা করে সেই অতিপ্রশংসিত স্পাটানকে যে সানন্দে নিজের পুত্রকে সমর্পণ করতো জয় অথবা মৃত্যুর কাছে; মনে হতো যেনো পৃথিবীতে পুত্রের কাজ হচ্ছে এসব অর্জন করে তার মার অস্তিত্বের যাথার্থ্য প্রতিপাদন করা, তাদের উভয়ের লাভের জন্যে, মার কাছে যা মূল্যবান বলে মনে হয়। মা চায় শিশু-দেবতাটির কর্মোদ্যোগগুলো হবে তার নিজের ভাবাদর্শের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এতে তার সাফল্য হবে সুনিশ্চিত। প্রতিটি নারীই জন্ম দিতে চায় একটি বীর, একটি প্রতিভা; তবে সব প্রকৃত বীর ও প্রতিভাদের মারাই প্রথমে অভিযোগ করেছে যে তাদের পুত্ররা তাদের মনে খুবই কষ্ট দিয়েছে। সতা হচ্ছে যে পুরুষ অধিকাংশ সময় তার মার ইচ্ছের বিরুদ্ধেই জয় করে সে-সব ট্রোফি, তার মা যা পাওয়ার স্বপ্ন দেখেছে ব্যক্তিগত আভরণরূপে এবং যখন তার পুত্র সেগুলো রাখে তার পদতলে সেগুলোকে সে চিনতেও পারে না। নীতিগতভাবে যদিও সে তার পুত্রের উদ্যোগগুলো অনুমোদন করে, তবুও সে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় এমন এক বিরোধিতায়, যা প্রণয়িনী নারীর বিরোধিতার প্রতিসম, যা পীড়ন করে প্রণয়িনী নারীকে। নিজের এবং তার মায়ের জীবনের যাথার্থ্য প্রতিপাদনের জন্যে তাকে এগোতে হয় সামনের দিকে, তার জীবনের সীমাতিক্রমণ করতে হয় কোনো উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের দিকে; এবং সেটা অর্জনের জন্যে বিপদের মুখোমুখি তাকে ঝুঁকি নিয়ে হয় তার স্বাস্থ্যের। কিন্তু যখন সে নিতান্ত জীবনধারণ করা থেকে গুরুত্ব দেয় কিছু লক্ষ্যের ওপর, তখন সে তার মার উপহারের মূল্য সম্পর্কে প্রশ্ন তুলে ধরে। মা এতে আহত হয়; পুরুষের ওপর শুধু তখনই সে সার্বভৌম, যখন তার জন্ম দেয়া এ-মাংস পুত্রের জন্যে হয় পরম শুভ। তা ধ্বংস করার কোনোঅধিকার নেই পুত্রের, যা সে উৎপাদন করেছে প্রসববেদনার মধ্য দিয়ে। ‘তুমি নিজেকে ক্ষয় করে ফেলছো, তুমি অসুখে পড়বে, কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে,’ সে ক্রমাগত পুত্রের কানে ঢোকাতে চেষ্টা করে।
অবশ্য সে ভালোভাবেই জানে যে শুধু বেঁচে থাকাই যথেষ্ট নয়, তাহলে প্রজনন ব্যাপারটিই হতো অনর্থক। তার সন্তান নিষ্কর্মা, ক্লীব, হলে সে-ই প্রথম আপত্তি জানায়। তার মন স্থির থাকে না। যখন পুত্র যুদ্ধে যায়, সে চায় যে তার ছেলে জীবিত ফিরে আসবে। তবে পদকপচিত হয়ে। সে চায় পুত্র সফল হবে কর্মজীবনে, তবে ভয় পায় যদি ছেলে বেশি কাজ করে। ছেলে যা-ই করে, মা সব সময়ই উদ্বিগ্ন থাকে, সে অসহায়ভাবে তাকিয়েথাকে একটি কর্মজীবনের দিকে, যা তার পুত্রের, যে-কাজের ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সে ভয় পায় পুত্র হয়তো পথভ্রষ্ট হবে, হয়তো বিফল হবে, হয়তো সফল হওয়ার চেষ্টায় তার দেহ ক্ষয় করে ফেলবে। যদি পুত্রের ওপর তার আস্থাও থাকে, তাহলেও বয়স ও লিঙ্গের ভিন্নতা বাধা দেয় মা ও ছেলের মধ্যে কোনো প্রকৃত সহযোগিতা সৃষ্টিতে; পুত্রের কাজের বিষয়ে তার কোনো জ্ঞান নেই; তার কাছে কোনো সহযোগিতা চাওয়া হয় না।
