প্রলোভন ও মন্ত্রণা বেশ নিষ্ফল বলে প্রমাণিত হয়, তখন একয়ে অধ্যবসায়ী নারীর বাকি থাকে একটি সম্পদ : অর্থাৎ, সেবার জন্যে টাকা দেয়া। মধ্যযুগে জনপ্রিয় কানিভেত নামের ছোটো ছুরিকার গল্পে চিত্রিত হয়েআছে এসব চির-অতৃপ্ত রাক্ষসিনীদের ভাগ্য : এক যুবতী নারী তার অনুগ্রহ বিতরণের বিনিময়ে তার প্রত্যেক প্রেমিকের কাছে থেকে নিতো একটি করে ছোটো কানিভেত, এবং ওগুলো জমাতো তার হাড়িপাতিল রাখার আলমারিতে। এমন একদিন আসে যখন পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে তার আলমারি; তবে তখন থেকে প্রত্যেক রাতের প্রেমের শেষে তার প্রেমিকেরা সগর্বে উপহাররূপে নিতে থাকে একটি করে ছুরিকা। শিগগিরই আলমারি খালি হয়েযায়; সব কানিভেত হস্তান্তরিত হয়ে গেছে, এবং তাই তাকে কিনতে হয় নতুন কানিভেত। কিছু নারী এ-পরিস্থিতিকে দেখে সিনিকীয় দৃষ্টিতে : একদা তাদের দিন ছিলো, এখন তাদের সময় এসেছে ‘কানিভেত দেয়ার’। বারবনিতার কাছে টাকা যেভূমিকা পালন করে, এ-নারীদের চোখে টাকা পালন করে তার বিপরীত ভূমিকা, তবে এ-ভূমিকাও সমান পবিত্রকর : এটা পুরুষটিকে রূপান্তরিত করে হাতিয়ারে এবং নারীটিকে দেয় সে-কামস্বাধীনতা, যা সে যৌবনের গরিমায় একদা প্রত্যাখ্যান করেছে।
যেদিন থেকে নারী বৃদ্ধ হতে সম্মত হয়, তখন বদলে যায় তার পরিস্থিতি। এসময় পর্যন্তও সে ছিলো এক তরুণী, যে সংগ্রামে একাগ্র ছিলো সে-দুর্ভাগ্যের বিরুদ্ধে, যা তাকে বিকৃত ও কদাকার করে তুলছিলোবিস্ময়করভাবে; এখন সে হয়ে উঠেছে এক ভিন্ন সত্তা, অলৈঙ্গিক তবে সম্পূর্ণ : বৃদ্ধ নারী। মনে করা যেতে পারে তার ‘বিপজ্জনক বয়স’-এর সংকট কেটে গেছে। তবে এটা মনে করা ঠিক হবে না যে এর পর থেকে তার জীবন হবে সহজ। যখন সে সময়ের বিপর্যয়কতার বিরুদ্ধে সগ্রাম ত্যাগ করে, তখন শুরু হয় আরেক লড়াই : তাকে একটি জায়গা রাখতে হবে পৃথিবীতে।
জীবনের হেমন্ত ও শীতকালে নারী মুক্তি পায় তার শৃঙ্খল থেকে; তার ওপর চেপে থাকা বোঝা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে সে সুযোগ নেয় তার বয়সের; তার স্বামীকে সে এখন জানে ভালোভাবেই, তার থেকে আর ভয় নেই, সে এড়িয়ে যায় স্বামীর আলিঙ্গন, স্বামীর পাশে সে গুছিয়ে তোলে তার নিজের জীবন–বন্ধুত্ব, ঔদাসীন্য, বা বৈরিতার মধ্যে। যদি তার থেকে তার স্বামীর শরীরক্ষয় দ্রুত হতে থাকে, তাহলে সে নেয় তাদের যৌথ কর্মকাণ্ডের দায়িত্ব। সে ফ্যাশন করা এবং ‘লোকে কী বলবে’টাকেও অস্বীকার করতে পারে; সে মুক্ত সামাজিক দায়ভার, স্বল্পাহার ও রূপচর্চা থেকে। তার সন্তানদের কথা বলতে গেলে, তারা এতোটা বড়ো হয়েছে যে তাকে ছাড়াই চলতে পারে, তারা বিয়ে করছে, বাড়ি ছেড়ে যাচ্ছে। দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়ে সে অবশেষে মুক্তি পায়। দুর্ভাগ্যবশত, প্রতিটি নারীর গল্পে ফিরে আসে সে-ঘটনা, যার সত্যতা আমরা দেখতে পেয়েছি নারীর ইতিহাসব্যাপী। সে তখনই পায় এ-স্বাধীনতা যখন এটা তার কোনো কাজে লাগে না। এ পৌনপুনিকতা কোনোমতেই আকস্মিকতাবশত নয় : পিতৃতান্ত্রিক সমাজ নারীর সমস্ত কাজকে দিয়েছে সেবামূলক কাজের বৈশিষ্ট্য, এবং নারী তখনই মুক্ত হয় ক্রীতদাসত্ব থেকে, যখন সে হারিয়ে ফেলে সমস্ত কার্যকারিতা। পঞ্চাশের কাছাকাছি সে থাকে তার সমস্ত শক্তিসম্পন্ন; সে বোধ করে যে সে অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ; অর্থাৎ যে-বয়সে পুরুষ অর্জন করে উচ্চতম অবস্থান, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ; নারীর কথা বলতে গেলে, তখন তাকে দেয়া হয় অবসর। তাকে শেখানো হয়েছে শুধু নিজেকে কারো প্রতি নিয়োজিত রাখতে, এবং এখন আর কেউ তার আত্মনিয়োজন চায় না। অপ্রয়োজনীয়, অযথার্থ, সে তাকিয়ে থাকে সে-দীর্ঘ, সম্ভাবনাহীন বছরগুলোর দিকে, যে-সময়টা তাকে বেঁচে থাকতে হবে, এবং সে বিড়বিড় করতে থাকে : ‘আমাকে কারো দরকার নেই!’
সে সঙ্গে সঙ্গে বিনা প্রতিবাদে এসব ব্যাপার মেনে নেয় না। অনেক সময় নিদারুণ যন্ত্রণার মধ্যে সে আঁকড়ে ধরে স্বামীকে; আগের থেকে অনেক বেশি কর্তৃত্বের সাথে সেবাযত্নে স্বামীর শ্বাসরোধ করে তোলে; তবে বিবাহিত জীবনের নিত্যনৈমিত্তিকতা সুপ্রতিষ্ঠিত; হয়তো সে জানে যে অনেক আগেই সে স্বামীর কাছে অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছে, বা স্বামীকে তার উদ্যোগগুলোর যোগ্য মনে হয় না। তাদের একত্রজীবন রক্ষা করে চলা একলা বুড়ো হওয়ার মতোই এক নৈমিত্তিক কঠিন কাজ। আশাপ্রদভাবে সে যা করতে পারে, তা হচ্ছে সে মনোযোগ দিতে পারে সন্তানদের প্রতি; তাদের ছাঁচ এখনো ঢালাই হয় নি; এখনো তাদের সামনে খোলা আছে বিশ্ব, ভবিষ্যৎ; সে সানন্দে ঝাঁপিয়ে পড়বে তাদের পেছনে। যে-নারী আকস্মিকভাবে বেশ দেরিতে সন্তান প্রসব করেছে, তার আছে একটি বিশেষ সুবিধা : সে তখনো এক তরুণী মা যখন অন্য নারীরা দাদী-নানী। নারী তার জীবনের চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ বছর বয়সের মধ্যে সাধারণত দেখতে পায় যে তার সন্তানেরা হয়ে উঠছে প্রাপ্তবয়স্ক। ঠিক যখন সন্তানেরা মুক্ত হয়ে যেতে থাকে তার থেকে, তখন সে সংরক্তভাবে উদ্যোগ নেয় সন্তানদের মধ্যে বেঁচে থাকার।
তার পরিত্রাণের জন্যে সে নির্ভর করতে চায় পুত্র না কন্যার ওপর, সে-অনুসারে তার মনোভাব হয়ে থাকে বিভিন্ন; সাধারণত সে তার সবচেয়ে সযত্নলালিত আশাগুলো স্থাপন করে আগেরটির ওপর। তার অতীতের অতলতা থেকে অবশেষে পুত্রের মধ্যে দেখা সে-পুরুষটি, যার মহিমান্বিত আবির্ভাব দেখার জন্যে সে একদা তাকিয়ে। থেকেছে দূরদিগন্তের দিকে; নবজাত পুত্রের প্রথম কান্না থেকেই সে অপেক্ষা করে আছে সে-দিনের জন্যে, যে-দিন পুত্র তার ওপর বর্ষণ করবে সমস্ত ধনরত্ন, যা পুত্রটির পিতা তার ওপর বর্ষণ করতে পারে নি। এর মাঝে সে পুত্রকে চড়থাপ্পড় মেরেছে ও শোধন করেছে, তবে এসব ভুলে গেছে; এই যে পুরুষটি, যাকে সে বহন করেছে তার হৃদয়তলে, সে এরই মাঝে হয়ে উঠেছে সেই নরদেবতাদের একজন, যারা শাসন করে বিশ্ব এবং নিয়ন্ত্রণ করে নারীর নিয়তি; এখন সে তাকে স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছে মাতৃত্বের পরিপূর্ণ মহিমায়। পুত্রটি তাকে রক্ষা করবে তার স্বামীর আধিপত্য থেকে, তার যে-সব প্রেমিক ছিলো ও ছিলো না, তাদের ওপর চরিতার্থ করবে প্রতিশোধ; সে হবে তার। মুক্তিদাতা, তার ত্রাতা। পুত্রের সঙ্গে সে পুনঃরায় শুরু করে সেই তরুণীর প্রলুব্ধকর ও আঁকালো আচরণ, যে তার চোখ মেলে রেখেছিলো মনোহর রাজকুমারের জন্যে; যখন সে হাঁটে পুত্রের পাশে, মার্জিত, এখনো আকর্ষণীয়, তার মনে হয় তাকে দেখাচ্ছে। পুত্রের বড়ো বোনের মতো; সে পুলক বোধ করে, যদি তার পুত্র–নিজেকে মার্কিন ছায়াছবির নায়কদের আদলে গড়ে তুলে- তার সাথে ঠাট্টামশকরা করে ও রসিকতা করে তাকে জ্বালায়, সহাস্যে ও সম্মানের সাথে। সগর্ব বিনম্রতায় সে মেনে নেয় এপুরুষটির, যে একদা ছিল তার শিশু, তার পৌরুষের শ্রেষ্ঠত্ব।
