তবে এতোটা সাহসে বাস্তবতার দেয়াল ডিঙ্গোনোর সামর্থ্য সকলের থাকে না। এমনকি স্বপ্নেও সমস্ত মানবিক প্রেমবঞ্চিত হয়ে বহু নারী সাহায্যের জন্যে নির্ভর করে বিধাতার ওপর; ঠিক ঋতুস্রাবনিবৃত্তির সময়টিতেই ছেনাল, নাগরালির নারী, চরিত্রভ্রষ্টা হয়ে ওঠে ধর্মপরায়ণ; নিয়তি সম্পর্কে অস্পষ্ট ধারণা, রহস্য, এবং স্বীকৃতি না পাওয়ার ফলে যখন শুরু হয় নারীর হেমন্তকাল, তখন সে ধর্মের মধ্যে লাভ করে একটা মননগত একীভবন। ধর্মভক্ত মনে করে যে তার নষ্ট জীবনটা ছিলো তাকে নিয়ে বিধাতার এক পরীক্ষা; দুর্দশা থেকে তার আত্মা লাভ করেছে সে-সব অসাধারণ গুণ, যার ফলে সে যোগ্য হয়ে উঠেছে করুণাময় বিধাতার বিশেষ পরিদর্শন লাভের; সে অবলীলায় বিশ্বাস করে যে সে পায় স্বর্গীয় অনুপ্রেরণা, বা এমনকি বিধাতা তার ওপর অর্পণ করেছে এক জরুরী দায়িত্বভার।
কম-বেশি পুরোপুরিভাবে বাস্তববোধ হারিয়ে ফেলার ফলে এ-সংকটের সময় নারী গ্রহণ করে সব ধরনের পরামর্শ, তাই কোনো স্বীকারোক্তিগ্রহণকারী এমন অবস্থানে থাকে যে সে নারীটির আত্মার ওপর ফেলতে পারে শক্তিশালী প্রভাব। উপরন্তু, প্রবল উৎসাহে সে মেনে নেবে অতিশয় প্রশ্নসাপেক্ষ বিশেষজ্ঞদের; সে একটি পূর্বনির্ধারিত শিকার হয়ে ওঠে ধর্মগোত্রগুলোর, মৃত-আত্মার-বাণীপ্রাপকদের, দৈবজ্ঞদের, বিশ্বাসে ব্যাধিনিরাময়কারীদের, যে-কোনো ও প্রতিটি শার্লাটানের। এর কারণ হচ্ছে বাস্তব বিশ্বের সাথে সংস্পর্শ হারিয়ে সে শুধু বিচারবিবেচনার সব শক্তিই হারিয়ে ফেলে নি, বরং ব্যগ্র হয়ে উঠেছে একটা চূড়ান্ত সত্যের জন্য : তাকে অবশ্যই পেতে হবে একটা প্রতিষেধক, একটা সূত্র, একটা চাবি, যা হঠাৎ রক্ষা করবে তাকে যেমন রক্ষা করবে মহাবিশ্বকে। যে-যুক্তি তার বিশেষ ক্ষেত্রে সুস্পষ্টভাবে অপ্রযোজ্য, সেটিকে সে আগের থেকে অনেক বেশি ঘৃণাভরে অবজ্ঞা করে; শুধু যে-সব প্রমাণ বিশেষভাবে তারই জন্যে তৈরি করা হয়েছে, সেগুলো তার কাছে মনে হয় বিশ্বাসযোগ্য : তাকে ঘিরে পুষ্পিত হতে থাকে গুপ্তবাণীলাভ, অনুপ্রেরণা, বার্তা, এমনকি অলৌকিক ঘটনা। তার। আবিষ্কারগুলো অনেক সময় তাকে কর্মে প্রণোদিত করে : সে ঝাপিয়ে পড়ে ব্যবসায়, কর্মোদ্যোগ, দুঃসাহসিক কর্মে, তাকে যা করার পরামর্শ দিয়েছে কোনো উপদেশক বা তার আন্তর কণ্ঠস্বর। নিজেকে সমস্ত ধ্রুব সত্য ও প্রজ্ঞার আধার বলে গণ্য করে সে সন্তোষ বোধ করে অন্যান্য সব ব্যাপারে।
সক্রিয়ই হোক বা হোক ধ্যানমগ্ন, তার মনোভাবের মধ্যে জড়িত থাকে অতিশয় ব্যাকুল পরমানন্দ। ঋতুস্রাবনিবৃত্তির সংকট নারীর জীবনকে নিষ্ঠুরভাবে দু-টুকরো করে ফেলে; এর ফলে ঘটে যে অবসান, তাই নারীকে দেয় একটা ‘নতুন জীবন’-এর প্রতিভাস; তার সামনে উন্মুক্ত হয় আরেকটি কাল, তাই সে এর ভেতরে ঢোকে এক ধর্মান্তরিতের উদ্দীপনা নিয়ে; সে বিশ্বাস স্থাপন করে প্রেমে, পুণ্যজীবনে, শিল্পকলায়, মানবতায়; এসব জিনিশের মধ্যে সে নিজেকে লুপ্ত করে ও অতিশায়িত করে। নিজেকে। সে মরে গিয়েছিলো এবং সেখান থেকে ফিরে এসেছে, সে বিশ্বকে দেখে এমন এক দৃষ্টিতে, যা ভেদ করেছে অতিসুদূরের গুপ্তসত্য, এবং সে মনে করে যে সে স্বপ্নাতীত শীর্ষলোকে আরোহণ করতে যাচ্ছে।
কিন্তু বিশ্ব বদলায় নি; চুড়োগুলো রয়ে গেছে অগম্য; যে সব বার্তা পাওয়া গেছে। সেগুলোকে যতোই উজ্জ্বল মনে হোক–সেগুলোর পাঠোদ্ধার দুরূহ; অন্তর্গত উদ্ভাসনগুলো নিষ্প্রভ হয়ে ওঠে; আয়নার সামনে দাঁরায় এমন এক নারী, সব কিছু সত্ত্বেও গতকালের থেকে যার একদিন বয়স বেড়েছে। পরমানন্দের মুহূর্তগুলোর পর দেখা দেয় বিষাদগ্রস্ততার বেদনাদায়ক প্রহরগুলো। এ-প্রাণীসত্তাটি প্রকাশ করে এতাললয়, কেননা নারী-হরমোন হ্রাসের ক্ষতিপূরণের জন্যে অতিশয় সক্রিয় হয়ে ওঠে হরমোনক্ষরক গ্রন্থিটি; তবে সর্বোপরি মনস্থাত্ত্বিক অবস্থাই নিয়ন্ত্রণ করে মেজাজের এপর্যায়ক্রমিক পরিবর্তন। কেননা নারীর অস্থিরতা, তার প্রতিভাসগুলো, তার উদ্দীপনা, এসব হচ্ছে যা ঘটেছে সে কর্তৃত্বশীল চরম সর্বনাশের বিরুদ্ধে নিতান্তই আত্মরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া। আবার তীব্র মনোকষ্ট জমা হয় নারীর কণ্ঠনালিতে, মৃত্যু যাকে নেয়ার আগেই যার জীবন শেষ হয়ে গেছে। হতাশা জয়ের চেষ্টার বদলে, প্রায়ই সে ধরা দেয় এর মাদকতার কাছে সে নিরন্তর প্যানর প্যানর করতে থাকে তার ভুলগুলো, খেদগুলো, কটুবাক্যগুলো; সে কল্পনা করে তার আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা তার। বিরুদ্ধে করে চলছে কুটিল ষড়যন্ত্র; যদি তার জীবনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত থাকে সমবয়সী কোনো বোন বা বান্ধবী, তাহলে তারা দুজনে মিলে পুঞ্জীভূত করে তোেল যন্ত্রণাভোগের ব্যানোহ। তবে বিশেষ করে সে রুগ্নভাবে তার স্বামীকে ঈর্ষা করতে শুরু করে, এবং এ-ঈর্ষা সে চালিত করে তার বন্ধুদের প্রতি, তার বোনদের প্রতি, তার ব্যবসার প্রতি; সঠিক বা ভুলভাবে সে তার দুঃখকষ্টের জন্যে দায়ী করতে থাকে কোনো একটি প্রতিদ্বন্দ্বীকে। পঞ্চাশ থেকে পঞ্চান্না বছর বয়সের মধ্যে অজস্র ঘটে বিকারগ্রস্ত ঈর্ষাকাতরতার ঘটনা।
যে-নারী বুড়ো হওয়া সম্পর্কে মনস্থির করে উঠতে পারে না, তার রজোনিবৃত্তির বিপদগুলো চলতে থাকে। অনেক সময় আমৃত্যু; যদি তার শারীরিক সৌন্দর্য খাটানো ছাড়া আর কোনো সম্পদ না থাকে, তাহলে সে পদে পদে লড়াই করতে থাকবে। ওগুলো বজায় রাখার জন্যে; যদি তার যৌন কামনাগুলো প্রাণবন্ত থাকে, যা আদৌ বিরল নয়, তাহলে সে যুদ্ধ করবে পাগলের মতো। কোন বয়সে নারী আর তার মাংসের জ্বালা বোধ করে না, জিজ্ঞেস করা হলে রাজকুমারী মেটারনিক উত্তর দিয়েছিলেন : ‘আমি জানি না, আমার বয়স মাত্র পঁয়ষট্টি’। বিয়ে, তেইনের মতে যা ‘টুকিটাকি জিনিশের’ বেশি কিছু নারীকে দিতে পারে না, সেটা ক্রমাগত হয়ে উঠতে থাকে এক অকার্যকর প্রতিষেধক, নারী যতোই বুড়ো হতে থাকে; তার যৌবনের সংবাধের, শীতলতার ক্ষতি তাকে প্রায়ই পূরণ করতে হয় পরিণত অবস্থায়; পরিশেষে সে যখন কামনার জ্বর বোধ করতে শুরু করে, তার অনেক আগে থেকেই তার স্বামী বিনা প্রতিবাদে সয়ে যেতে শুরু করেছে তার উদাসীনতা এবং মানিয়ে নিয়েছে নিজেকে। ঘনিষ্ঠতা ও কালপ্রবাহের ফলে যৌনাবেদন হারিয়ে ফেলে স্ত্রীর পক্ষে দাম্পত্য শিখা আবার জ্বালানোর আর কোনো সুযোগই থাকে না। ক্লিষ্ট, তার ‘জীবনযাপনে’ বদ্ধপরিকর, প্রেমিক ধরার ব্যাপারে–যদি একটা সুযোগ পাওয়া যায়হাস পায় তার বিবেকের অস্বস্তি; তাদের ধরতেই হবে : এটা এক পুরুষ-মৃগয়া। সে প্রয়োগ করে হাজারো ছলাকলা : নিজেকে দান করার ভান করে সে চাপিয়ে দেয় নিজেকে; বিনয়, বন্ধুত্ব, কৃতজ্ঞতাবোধকে সে পরিণত করে ফাঁদে। তারুণ্যদীপ্ত মাংসের সজীবতা ভালো লাগে বলেই শুধু সে যুবকদের আক্রমণ করে না : তাদের থেকে সে প্রত্যাশা করতে পারে শুধু সে-নিরাসক্ত প্রীতি, যা অনেক সময় কিশোর বোধ করে মাতৃতুল্য রক্ষিতার প্রতি। সে নিজে হয়ে উঠেছে আক্রমণাত্মক; এবং যুবকের সুদর্শন রূপ যতোটা সুখী করে বৃদ্ধাদের, তেমনি তাদের বশ্যতাও অনেক সময় তাদের ততোটাই সুখী করে; মাদাম দ্য স্তেল যখন ছিলেন চল্লিশোত্তর, তিনি পছন্দ করতেন অর্বাচীন যুবকদের,যারা বিহ্বল বোধ করতো তার মর্যাদায়। এবং যাই ঘটুক না কেননা, একটি ভীরু নবিশ ধরা অনেক সহজ।
