কিন্তু আসলে প্রকৃত শুরুর প্রশ্নই ওঠে না; বিশ্বে সে এমন কোনো লক্ষ্য দেখতে পায় না মুক্ত ও কার্যকর রীতিতে যে-দিকে সে এগোতে পারে। তার কার্যকলাপ ধারণ করে বাতিকগ্রস্ত, অসমঞ্জস, ও নিষ্ফল রূপ, কেননা সে অতীতের ভুল ও ব্যর্থতাগুলোর ক্ষতিপূরণ করতে পারে শুধু প্রতীকী উপায়ে। একদিকে, যে-বয়সের নারীর কথা আমরা বিবেচনা করছি, খুব বেশি দেরি হয়ে যাওয়ার আগে সে পূরণ করার চেষ্টা করবে তার শৈশব ও কৈশোরের সাধগুলো : সে ফিরে যেতে পারে তার পিয়ানোর কাছে, শুরু করতে পারে ভাস্কর্য, লেখা, ভ্রমণ, সে স্কি-করা শিখতে শুরু করতে পারে বা শিখতে পারে বিদেশি ভাষা। সে এখন দু-বাহু মেলে স্বাগত জানায়–আবারও খুব বেশি দেরি হয়ে যাওয়ার আগে–সে-সব কিছুকে, যা থেকে আগে সে বঞ্চিত করেছে নিজেকে। যে-পতিকে সে আগে সহ্য করতে পারতো, তার প্রতি এখন সে বিরক্ত এবং কামশীতল হয়ে ওঠে তার সঙ্গে; বা, এর বিপরীতে, সে প্রকাশ করতে থাকে প্রবল আবেগ, যা সে আগে বশে রাখতে এবং তার দাবিদাওয়ায় বিহ্বল করে তোলে স্বামীকে; সে শুরু করে হস্তমৈথুন, শৈশব থেকে যার চর্চা সে ছেড়ে দিয়েছে। সমকামী প্রবণতা–ছদ্মবেশী রূপে যা বিরাজ করে সব নারীর মধ্যে এখন দেখা দেয়। সে প্রায়ই এটা নিয়োগ করে তার কন্যার প্রতি; তবে অনেক সময় এ-অনভ্যস্ত আবেগ চালিত হয় কোনো বান্ধবীর প্রতি। কাম, জীবন, ও ধর্মবিশ্বাস-এ রোঁ লাদো বলেছেন। নিচের গল্পটি, যা তাকে বিশ্বাস করে বলেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিটি :
মিসেস ক… এগোচ্ছিলেন পঞ্চাশের দিকে; পঁচিশ বছর ধরে তিনি বিবাহিত, তিনটি বড়ো সন্তান ছিলো, এবং তিনি বিশিষ্ট ছিলেন সামাজিক ও দাতব্য কর্মকাণ্ডে। লন্ডনে তার দেখা হয় তার থেকে দশ বছরের ছোটো এক মহিলার সাথে, যার ছিলো একই ধরনের আগ্রহ, মিসেস খ, যিনি তাকে নিমন্ত্রণ করেন তাঁর বাড়িতে। নিমন্ত্রণের দ্বিতীয় সন্ধ্যায় মিসেস ক হঠাৎ দেখেন তিনি সংরক্তভাবে আলিঙ্গন করে আছেন তার নিমন্ত্রণকর্মীকে; তিনি তার বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং রাতটি তার সাথে যাপন করেন, তারপর আতঙ্কিত হয়ে গৃহে ফেরেন। এ-পর্যন্ত তিনি সমকাম সম্পর্কে অজ্ঞই ছিলেন, জানতেন যে এমন জিনিশ আছে। তিনি সংরক্তভাবে ভাবতে থাকেন মিসেস খ-র কথা এবং জীবনে এই প্রথম তার স্বামীর অভ্যস্ত চুম্বন ও স্পর্শাদর তার কাছে অপ্রীতিকর লাগে। ‘সব কিছু সমাধান করার জন্যে’ তিনি আবার বান্ধবীর সাথে দেখা করতে মনস্থ করেন, এবং এতে শুধু তাঁর সংরাগ বাড়তেই থাকে; এ-পর্যন্ত যা কিছু তিনি উপভোগ করেছেন তার থেকে অনেক বেশি সুখকর ছিলো তাঁদের সম্পর্ক। তিনি পাপ করেছেন, এ-ভাবনায় পীড়া বোধ করতে থাকেন এবং তার অবস্থার ‘কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা’ আছে কি-না এবং নৈতিকভাবে তার যাথার্থ্য প্রতিপাদন করা যায় কি-না এটা জানার জন্যে তিনি দেখা করেন একজন চিকিৎসকের সাথে।
এ-ক্ষেত্রে বিষয়ী সাড়া দিয়েছে এক স্বতস্ফূর্ত প্রবর্তনার প্রতি এবং নিজে এতে বিপর্যস্ত হয়েছে গভীরভাবে। তবে প্রায়ই নারী স্বেচ্ছায় লাভ করতে চায় তার অজ্ঞাত সে-রোমাঞ্চকর ঘটনার বাস্তবিক অভিজ্ঞতা, শিগগিরই যা লাভের সামর্থ তার থাকবে না। সে কখনো কখনো অনুপস্থিত থাকে তার বাড়ি থেকে, কেননা তার মনে হয় বাড়িটা তার অযোগ্য এবং যেহেতু সে একলা থাকতে চায়, এবং কখনো কখনো অনুপস্থিত থাকেরোমাঞ্চকর ঘটনার খোঁজে। সে যদি তা পায়, তাহলে তাতে নিজেকে ছুঁড়ে দেয় উন্মুখতার সঙ্গে। এমন ঘটে স্টেকেলের এক রোগীর ক্ষেত্রে :
চল্লিশ বছরের এক নারী, বিশ বছর ধরে বিবাহিত ও যার আছে বড়ো সন্তান, সে বোধ করতে শুরু করে যে সে মূল্য পায় নি এবং সে তার জীবন অপচয় করেছে। সে নতুন কর্মকাণ্ড শুরু করে এবং, একদিকে, স্কি করার জন্য যায় পর্বতে। সেখানে তার পরিচয় হয় তিরিশ বছরের একটি পুরুষের সাথে এবং সে হয়ে ওঠে তার রক্ষিতা।
যে-নারী থাকে সুরুচি ও মানমর্যাদার কঠোর প্রথার প্রভাবের ভেতরে, সে সব সময় বিশেষ কোনো ঘটনা ঘটানোর মতো চূড়ান্ত পর্যায়ে যায় না। তবে তার স্বপ্নগুলো ভরা থাকে কামাতুর ছায়ামূর্তিতে, যেগুলোকে সে জাগ্রত অবস্থায়ও মনে মনে ভাবে; সে তার সন্তানদের প্রতি দেখায় অতি ব্যাকুল ও ইন্দ্রিয়পরায়ণ স্নেহ; সে। নিজের পুত্রের প্রতি লালন করে অজাচারী আবিষ্টতা; সে গোপনে একের পর এক যুবকের প্রেমে পড়তে থাকে; কিশোরীর মতো তার মনে হানা দিতে থাকে ধর্ষিত হওয়ার ভাবনা; বেশ্যাবৃত্তি করার উন্মত্ত বাসনাও তাকে পেয়ে বসে। তার বাসনা ও ভীতির পরস্পর বিপরীত মূল্য সৃষ্টি করে এমন উদ্বেগ, যার ফলে ঘটতে পারে মনোবিকলন : তখন সে তার অদ্ভুত আচরণ দিয়ে মর্মাহত করে আত্মীয়স্বজনদের, যা আসলে তার কাল্পনিক জীবনের প্রকাশ মাত্র।
এ-বিঘ্নিত সময়ে কাল্পনিক ও বাস্তবিকের মধ্যবর্তী সীমানা অনেক বেশি অস্পষ্ট হয়ে ওঠে বয়ঃসন্ধির কালের থেকেও। বার্ধক্যের দিকে অগ্রসরমাণ নারীর অন্যতম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বিব্যক্তিকীকরণবোধ, যা নষ্ট করে দেয় তার সমস্ত বস্তুনিষ্ঠতা। যে-সব স্বাস্থ্যবান মানুষও মৃত্যুর কাছাকাছি উপনীত হয়েছে, তারাও বলে যে তারা বোধ করেছে এক ধরনের উদ্ভট দ্বৈতানুভূতি; যখন কেউ নিজেকে বোধ করে একটি সচেতন, সক্রিয়, স্বাধীন সত্তা, তখন যে-অক্রিয় বস্তুর ওপর ক্রিয়া করতে থাকে চরম বিপর্যয়, সেটিকে মনে হয় যেনো আরেকজন; একটা গাড়ি যাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে, সে আমি নই; আয়নায় দেখা যাচ্ছে যে-বুড়ীকে, সে আমি হতে পারি না! যে-নারী ‘তার জীবনে কখনো এতো তারুণ্য অনুভব করে নি’ এবং যে নিজেকে কখনো এতো বুড়ো দেখে নি, সে তার এ-দুটি বৈশিষ্ট্যের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করতে সফল হয় না; যেনো একটা স্বপ্নের মধ্যে সময়উড়ে চলে যায় এবং সময়কালটা অতর্কিতে হামলা চালায় তার ওপর। তাই বাস্তবতা পিছু হটে ও ক্ষীণ হয়ে ওঠে, এবং একই সময়ে একে আর প্রতিভাস থেকে স্পষ্টভাবে পৃথক করা যায়। এ-অদ্ভুত বিশ্বে যেখানে সময় বয়েচলে পেছনের দিকে, যেখানে তার ডবলকে আর তার মতো দেখায় না, যেখানে পরিণতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছে তার সাথে, তাতে আস্থা পোষণ না করে বরং সে আস্থা পোষণ করে তাতে, যা স্পষ্ট তার আন্তর দৃষ্টির কাছে। তাই তার ঘটতে থাকে তুরীয়ানন্দবোধ, সে হতে থাকে অনুপ্রাণিত, বোধ করতে থাকে ক্ষিপ্ত উন্মত্ততা। এবং যেহেতু আগের যে-কোনো সময়ের থেকে এসময়ে তার প্রধান বিষয় হচ্ছে প্রেম, তাই তার পক্ষে স্বাভাবিক এ-প্রতিভাসকে আলিঙ্গন করা যে কেউ তাকে ভালোবাসে। দশজনের মধ্যে ন-জন কামোন্মাদই নারী, এবং এদের অধিকাংশই চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ বছর বয়স্ক।
