নারীর ব্যক্তিগত জীবন-ইতিহাস–কেননা সে আজো বদ্ধ তার নারীধর্মী ভূমিকায় পুরুষের থেকে অনেক বেশি মাত্রায় নির্ভর করে তার শারীরবৃত্তিক নিয়তির ওপর; এবং এ-নিয়তির বক্ররেখা অনেক বেশি বিষম, অধিকতর অধারাবাহিক পুরুষের নিয়তির বক্ররেখার থেকে। নারীর জীবনের প্রতিটি পর্ব সমরূপ ও একঘেয়ে; তবে স্তর থেকে স্তরান্তরে যাওয়ার ক্রান্তিকালগুলো বিপজ্জনকভাবে আকস্মিক; এগুলো দেখা দেয় সংকটরূপে–বয়ঃসন্ধি, কামদীক্ষা, ঋতুবন্ধ–পুরুষের মধ্যে যা ঘটে, তার থেকে এগুলো অনেক বেশি চূড়ান্তধর্মী। পুরুষ যেখানে ধীরেধীরে বৃদ্ধ হয়, সেখানে নারী হঠাৎ বঞ্চিত হয় তার নারীত্ব থেকে; সমাজের ও তার নিজের দৃষ্টিতে যা প্রতিপন্ন করে তার অস্তিত্বের যাথার্থ ও তার সুখলাভের সুযোগ, সে-কামাবেদনশীলতা ও উর্বরতা সে হারায় আপেক্ষিকভাবে তরুণ বয়সেই। ভবিষ্যত্বীন, তখনো তার সামনে বেঁচে থাকার জন্যে পড়ে থাকে তার প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের প্রায় অর্ধেকটা।
‘বিপজ্জনক বয়স’টা লক্ষণীয় হয়ে ওঠে কিছু জৈবিক বিশৃঙ্খলার মধ্যে, তবে এগুলোকে যা গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে, তা হচ্ছে এগুলোর প্রতীকী তাৎপর্য। জীবন বদল-এর সংকট অনেক কম তীব্রভাবে অনুভব করে সে-সব নারী, যারা তাদের সব কিছু বাজি ধরে নি নারীত্বের ওপর; যারা গুরুভার কাজে নিয়োজিত–ঘরে বা বাইরে তারা এ-মাসিক ভার লোপ পাওয়াকে স্বস্তির সাথে স্বাগত জানায়; কৃষক নারী, শ্রমজীবীর স্ত্রী, যারা ধারাবাহিকভাবে থাকে নতুন গর্ভধারণের ভীতির নিচে, তারা সুখবোধ করে, যখন অবশেষে তাদের আর বিপদের ঝুঁকি থাকে না।
পরিণামের অঙ্গচ্ছেদের অনেক আগে থেকেই নারীর ভেতরে হানা দিতে থাকে বুড়ো হওয়ার ভয়। প্রৌঢ় পুরুষ ব্যস্ত থাকে প্রেমের থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কর্মোদ্যোগে; এ-সময়ে তার কামের ব্যগ্রতা অনেক কম থাকে যৌবনের থেকে; এবং যেহেতু তার মধ্যে থাকে না বস্তুর অক্রিয় বৈশিষ্ট্যগুলো, তাই তার মুখমণ্ডল ও শরীরের বদলে তার আকর্ষণীয়তা নষ্ট হয় না। এর বিপরীতে, সাধারণত পঁয়ত্রিশ বছরের। দিকে, অবশেষে যখন জয়করা হয়েছে সব সঙ্কোচ, তখন নারীর মধ্যে অর্জিত হয় কামের পূর্ণবিকাশ। তখনই তার কামাবেগগুলো হয় তীব্রতম এবং সে প্রবলতমভাবে কামনা করে সেগুলোর পরিতৃপ্তি। কী হবে তার, যদি তার পুরুষটির ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকে? সে উদ্বেগের সাথে নিজেকে জিজ্ঞেস করে এ-প্রশ্নটিই, যখন অসহায়ভাবে সে দেখতে থাকে অবক্ষয়গ্রস্ত হচ্ছে সে-মাংসল বস্তুটি, যার সাথে সে অভিন্ন করে তুলেছে নিজেকে। সে শুরু করে একটা যুদ্ধ। তবে কখনোই চুলের কলপ, ত্বকচর্চা, রূপাস্ত্রোপচার কিছুতেই তার মুমূর্ষ যৌবনকে প্রলম্বিত করার বেশি কিছু করতে পারে না। তবে সে অন্তত তার আয়নাটিকে ফাঁকি দিতে পারে। কিন্তু যখন প্রথম আভাস দেখা দেয়নিয়তিনির্ধারিত ও অনিবর্তনীয় সে-প্রক্রিয়ার, যা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেবে বয়ঃসন্ধির কালে নির্মিত সৌধটি, সে বোধ করে মৃত্যুর আপন করাল স্পর্শ।
কারো কারো মনে হতে পারে যে-নারী তার যৌবন ও রূপে বোধ করে অতিআকুল পরমানন্দ, সে-ই হবে সবচেয়ে বিপর্যস্ত; তবে আদৌ তা নয় : আত্মরতিবতী তার দেহ সম্পর্কে এতো ভাবিত থাকে যে তার পক্ষে তার দেহের অবধারিত অবক্ষয়ের ব্যাপারটি আগেই না-জানার এবং পিছু হটার জন্যে প্রস্তুতি না-নেয়ার কথা নয়। এটা সত্য তার অঙ্গহানিতে সে কষ্ট পাবে, তবে অন্তত সে অতর্কিতে ধরা পড়বে, এবং সে অবিলম্বেই নিজেকে মানিয়ে নেবে। যে-নারী ছিলো আত্মবিস্মৃত, একান্তভাবে নিয়োজিত, আত্মোৎসর্গকারী, সে বরং অনেক বেশি বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে এ-আকস্মিক গুপ্তকথা প্রকাশ পাওয়ায় : ‘যাপনের জন্যে আমার ছিল মাত্র একটি জীবন; ভেবো দ্যাখো কী ছিলো আমার ভাগ্য, আর এখন তাকিয়ে দ্যাখো আমার দিকে!’ বিস্ময়ে সবাই দেখতে পায় তার মধ্যে ঘটছে এক আমূল পরিবর্তন : যা ঘটেছে তা হচ্ছে, যে-বৃত্তি তাকে আশ্রয় দিয়েছিলে, সেটা থেকে উৎখাত হয়ে, তার পরিকল্পনাগুলো বিপর্যস্ত হয়ে, নিরুপায়ভাবে সে হঠাৎ নিজের মুখখামুখি দেখতে পায় নিজেকে। যে-মাইলফলকে হঠাৎ হোঁচট খেয়ে সে পড়ে গেছে, তার মনে হয় সেটি পেরিয়ে তার সুদিনগুলোর পর বেঁচে থাকা ছাড়া তার জন্যে করার মতো আর কিছু রইলো না; তার দেহ কোনো প্রতিশ্রুতি দেবে না; যে-সব স্বপ্ন, যে-সব আকুল আকাঙ্খ অপূর্ণ রয়ে গেছে, সেগুলো চিরকাল অপূর্ণ রয়ে যাবে। এ-পরিপ্রেক্ষিতে সে বিচার করে অতীতকে; পাতার এক দিক থেকে অন্য দিকে টানতে হবে একটি রেখা, তার হিশেব মেলাতে হবে; সে মেলায় তার বইগুলো। এবং জীবন তার ওপর চাপিয়ে দিয়েছে যে-সংকীর্ণ সীমাবদ্ধতা, তাতে সে মর্মহত হয়।
শৈশব ও বয়ঃসন্ধিকালের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পুনর্জীবিত হয়ে ওঠে, নারী ফিরে ফিরে স্মরণ করে তার যৌবনের গল্পগুলো, এবং মা-বাবা, তার ভাইবোনের জন্যে যে ভাবাবেগগুলো ঘুমিয়ে ছিলো দীর্ঘকাল ধরে, সেগুলো এখন আবার জেগে ওঠে। অনেক সময় সে নিজেকে সমর্পণ করে স্বপ্নাতুর ও অক্রিয় বিষন্নতার কাছে। তবে প্রায়ই সে হঠাৎ ব্যগ্র হয়ে ওঠে তার হারানো অস্তিত্ব রক্ষার জন্যে। সে বেশ ঘটা করে প্রদর্শন করতে থাকে তার এ-ব্যক্তিত্ব, যা সে তার ভাগ্যের হীনতার সঙ্গে তুলনা করে এইমাত্র আবিষ্কার করেছে; সে ঘোষণা করে এর গুণাবলি, সে উদ্ধতভাবে সুবিচার দাবি করে। অভিজ্ঞতায় পরিপক্ক হয়ে, সে বোধ করে যে অবশেষে সে যোগ্য হয়ে উঠেছে বিখ্যাত হওয়ার; সে আবার কাজে নামবে। এবং সর্বপ্রথম, সকরুণ ব্যগ্রতায় সে ফেরাতে চায় সময়ের প্রবাহ। মাতৃধর্মী নারী দাবি করবে সে এখনো সন্তানধারণে সক্ষম : সে সংরক্তভাবে চেষ্টা করে আবার জীবন সৃষ্টির। ইন্দ্রিয়াতুর নারী প্রয়াস। চালাবে আরেকটি প্রেমিককে ফাঁদে ফেলতে। ছেনাল এ-সময় আগের থেকে অনেক বেশি চেষ্টা করবে অন্যদের খুশি করার। তারা ঘোষণা করে যে এতো তারুণ্য তারা আগে আর কখনো বোধ করে নি। তারা অন্যদের বোঝাতে চেষ্টা করে যে সময়ের প্রবাহ আসলেই তাদের স্পর্শ করতে পারে নি; তারা ‘তরুণী সাজতে’ শুরু করে, তারা শিশুসুলভ হাবভাব ধরে। বার্ধক্যের দিকে অগ্রসরমাণ নারী বেশ জানে যদি সে আর কামসামগ্রি না থাকে, তা শুধু এজন্যে নয় যে পুরুষদের দেয়ার মতো তার মাংসের আর টাটকা অপরিমেয় সম্পদ নেই; বরং এজন্যেও যে তার অতীত, তার অভিজ্ঞতা তাকে, ইচ্ছেয় বা অনিচ্ছেয়, পরিণত করেছে একটি ব্যক্তিতে; সে নিজের জন্যে সংগ্রাম করেছে, ভালোবেসেছে, ইচ্ছে পোষণ করেছে, উপভোগ করেছে। এ-স্বাধীনতা ভীতিপ্রদ; সে এটা অস্বীকার করতে চায়; সে তার নারীত্বকে অতিরঞ্জিত করে তোলে, সে নিজেকে সাজায়, সে সুগন্ধি ব্যবহার করে, সে নিজেকে করে তুলতে চায় মনোমমাহিনী, রূপসী, বিশুদ্ধ সীমাবদ্ধতা। সে পুরুষদের সাথে শিশুসুলভ আধােআধােভাবে কথা বলে এবং তাকায় সরল অনুরাগের দৃষ্টিতে, এবং সে ছোটো মেয়েটির মতো অনর্থক বকবক করতে থাকে; কথা বলার বদলে সে কিচিরমিচির করে, সে করতালি দেয়, সে হাসিতে ফেটে পড়ে। এক ধরনের আন্তরিকতার সাথেই সে অভিনয় করে এ-কমেডির। তার নতুন আগ্রহগুলো, পুরানো নিত্যনৈমিত্তকতা থেকে তার মুক্তি পাওয়ার ও নতুনভাবে শুরু করার বাসনা তাকে এমন অনুভূতি দেয় যেনো সে আবার শুরু করছে জীবন।
