যুদ্ধের সময় এ-সহজ সতী নারীদের থেকে অধিকতর আক্রমণাত্মক দেশপ্রেম আর কেউ দেখায় না; ভাবালুতার যে-প্রভাব তারা বিস্তার করে, তা দিয়ে তারা আশা করে তারা উঠবে ডাচিসের স্তরে। জনসভায় তাদের বক্তৃতার ভিত্তি হয় গতানুগতিকতা, বহুলব্যবহৃত ধরতাই বুলি, পক্ষপাতদুষ্টতা, এবং প্রথাসম্মত ভাবাবেগ, এবং প্রায়ই তারা হারিয়ে ফেলে আন্তর আন্তরিকতা। মিথ্যাচারিতা ও অতিরঞ্জনের মধ্যে তাদের ভাষা হারিয়ে ফেলে সর্ববিধ অর্থ। হেতাইরার সমগ্র জীবনটিই একটা প্রদর্শনী; তার মন্তব্যরাশির, তার তোতাপাখির মতো বুলি আবৃত্তির লক্ষ্য চিন্তা প্রকাশ করা নয়, বরং একটা প্রভাব সৃষ্টি করা। তার রক্ষকের সাথে সে অভিনয় করে প্রেমের কমেডির। কখনো কখনো সে এটাকে গ্রহণ করে গুরুত্বের সাথে। জনমতের কাছে সে অভিনয় করে শ্রদ্ধেয় ও মর্যাদাসম্পন্ন হওয়ার কমেডির, এবং পরিশেষে সে বিশ্বাস করতে থাকে যে সে নিজে হচ্ছে সদগুণের পরমোকর্ষের এক মূর্ত রূপ এবং একটি পবিত্র মূর্তি। প্রতারণা করার এক অনড় উদ্দেশ্য নিয়ন্ত্রণ করে তার অন্তর জীবনকে এবং তার ইচ্ছাকৃত মিথ্যাচারগুলোকে প্রতিভাত করে সত্য বলে।
হেতাইরার সবচেয়ে বড়ো দুর্ভাগ্য শুধু এটাই নয় যে তার স্বাধীনতা হচ্ছে সহস্র পরাশ্রিততার প্রতারণামূলক মুদ্রার নকশাখচিত পিঠ, বরং এটাও যে এ-স্বাধীনতা নিজেই নেতিবাচক। রাশেলের মতো অভিনেত্রীদের, আইসোডোরা ডাঙ্কানের মতো নর্তকীদের, যদিও তারা পুরুষদের আনুকূল্য পেয়েছিলেন, আছে এমন এক পেশা, যার জন্যে দরকার যোগ্যতা এবং এটাই তাদের যাথার্থ প্রতিপাদন করে। তারা যেকাজ করেন ও ভালোবাসেন, তার মধ্যে অর্জন করেন সুনির্দিষ্ট ইতিবাচক স্বাধীনতা। তবে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ নারীর জন্যে কোনো শিল্পকলা, কোনো পেশা, একটা উপায় মাত্র : এর চর্চার মধ্যে তারা কোনো প্রকৃত কর্মকাণ্ডে নিযুক্ত থাকে না। বিশেষ করে চলচ্চিত্রে, যাতে তারকা থাকে পরিচালকের অধীনে, তার পক্ষে কোনো উদ্ভাবনই সম্ভব নয়, কোনো সৃষ্টিশীল কাজ সম্ভব নয়। সে যা, তা ব্যবহার করে অন্য কেউ, সে নতুন কিছু সৃষ্টি করে না। তবু নারীর পক্ষে তারকা হওয়াও খুবই বিরল ঘটনা। নাগরালির ক্ষেত্রে সীমাতিক্ৰমণতার অভিমুখে কোনো রকমের পথ খোলা নেই। এখানে আবার সীমাবদ্ধতায় বন্দী নারীর সঙ্গী হয়ে ওঠে অবসাদ। নানা সম্পর্কে জোলা এটা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন :
কিন্তু তার বিলাসব্যসনের মধ্যে, এ-রাজসভার মধ্যে নানা বোধ করতো মৃত্যুর ক্লান্তি। রাতের প্রতিটি মুহূর্তে তার পাশে ছিলো পুরুষ এবং সবখানে ছিলো টাকা, এমনকি তার আলমারির দেরাজের ভেতরেও, কিন্তু এসব আর তাকে সুখী করতো না, সে বোধ করতো একটা আন্তর শূন্যতা, এমন একটা শূন্যতাবোধ যাতে সে হাই তুলতো। একই একঘেয়ে সময়ের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে আলস্যের মধ্যে মন্থরগতিতে চলতো তার জীবন… সে সময় কাটতো তুচ্ছ হাস্যকৌতুকের মধ্যে তার একমাত্র প্রত্যাশায়, পুরুষের।
মার্কিন সাহিত্যে পাওয়া যায় এ-ঘন অবসাদের বহু বর্ণনা, যা বিহ্বল করে। হলিউডকে ও পৌছানোর সাথেসাথে দখল করে ভ্রমণকারীকে। অভিনয়কারীরা এবং অতিরিক্তরাও ক্লান্ত হয়ে ওঠে সে-নারীদের মতে, যাদের পরিস্থিতির তারা অংশীদার। যেমন ঘটে ফ্রান্সে, অফিসীয় পার্টিগুলোর প্রকৃতি প্রায়ই হয় ক্লান্তিকর দায়িত্বপালন। কোনো ‘ক্ষুদে তারকা’র জীবন নিয়ন্ত্রণ করে যে-পৃষ্ঠপোষক, সে সাধারণত হয় বয়স্ক পুরুষ, যার বন্ধুরা তার বয়সের; তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারগুলো তরুণীটির কাছে অপরিচিত, তাদের আলাপচারিতা ভয়াবহ; সাধারণ বিয়ের থেকেও গভীরতর একটি ফারাক থাকে বিশ বছরের একটি শিক্ষানবিশ ও পঁয়তাল্লিশ বছরের একটি ব্যাংকব্যবসাদারের মধ্যে, যারা একত্রে কাটায় তাদের রাত্রিগুলো।
হেতাইরা যে-মোলোকের কাছে উৎসর্গ করে তার সুখ, প্রেম, স্বাধীনতা, তা হচ্ছে তার কর্মজীবন। মাত্র আদর্শ হচ্ছে সুখসমৃদ্ধির একটি স্থিত জলবায়ু, যা ঢেকে রাখে স্বামী ও সন্তানদের সাথে তার সম্পর্ককে। ‘কর্মজীবন’ সময়ের সাথে বৃদ্ধি পায়, তবে এটাও একটি সীমাবদ্ধ লক্ষ্য, যা সংহতরূপ নেয় একটি নামে। সামাজিক মানদণ্ড বেয়ে যতোই ওপর থেকে ওপরে উঠতে থাকে নামটি ততোই বৃহত্তর হতে থাকে বিজ্ঞাপনমঞ্চে ও সর্বসাধারণের মুখে। আরোহণকারিণী তার ব্যবসা চালিয়ে যেতে থাকে, তার মেজাজ অনুসারে, দূরদর্শিতা বা স্পর্ধার সাথে। এক নারী তার কর্মজীবনে আলমারিতে চমৎকার পোশাকপরিচ্ছদ ভাঁজ করে রেখে উপভোগ করে গৃহিণীর সুখ; আরেকজন, উপভোগ করে অভিযাত্রার মাদকতা। কিছু নারী নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখে নিরন্তর আক্রান্ত একটি পরিস্থিতিকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখার জন্যে, যা অনেক সময় ভেঙেচুরে পড়ে; অন্যরা অন্তহীনভাবে গড়তে থাকে তাদের খ্যাতি, আকাশ-অভিমুখি বাবেলের অট্টালিকার মতো নিরর্থকভাবে। অনেকে, যারা নাগরালির সাথে যুক্ত করে তাদের অন্যান্য কর্ম, তাদেরই মনে হয় প্রকৃত অভিযাত্রিণী : এরা হচ্ছে গুপ্তচর, মাতা হারির মতো, বা নিজ সরকারের পক্ষে গুপ্তচর। সাধারণভাবে তাদের পরিকল্পনাগুলো সূচনার দায় তাদের নয়, তারা বরং পুরুষের হাতে হাতিয়ারের মতো। তবে, মোটের ওপর, হেতাইরার মনোভাব কম-বেশি অভিযাত্রীর মনোভাবের সমগোত্রীয়; তার মতো, সে প্রায়ই একাগ্রচিত্ত ও রোমাঞ্চ-এর মাঝামাঝি; তার লক্ষ্য গতানুগতিক মূল্যবোধ, যেমন টাকা ও খ্যাতি। পুরুষের প্রতি নিবেদিত নারীর নিয়তি হচ্ছে তার মনে হানা দিতে থাকে প্রেম; তবে যে-নারী শোষণ করে পুরুষকে, সে তার নিজের প্রতি ভক্তিনিবেদনের ফলে হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে। তার খ্যাতির কারণে যদি সে বিবেচিত হয় অতিশয় মূল্যবান বলে, তবে তা একান্তভাবে আর্থিক কারণে নয়–সে খ্যাতির মধ্যে চায় তার আত্মরতিকে মহিমান্বিত করতে।
প্রৌঢ়ত্ব থেকে বার্ধক্য
দ্বিতীয় খণ্ড । ভাগ ৫ –পরিস্থিতি। পরিচ্ছেদ ৫
