কোনো পুরুষই চূড়ান্তরূপে তাদের প্রভু নয়। কিন্তু পুরুষ পাওয়া তাদের জন্যে অতিশয় জরুরি। বারবনিতা তার ভরণপোষণের উপায় পুরোপুরি হারিয়ে ফেলে যদি পুরুষ তার প্রতি আর কামনা বোধ না করে। নতুন পেশাগ্রহণকারী জানে তার সম্পূর্ণ ভবিষ্যৎ পুরুষের হাতে; এমনকি পুরুষের সমর্থন বঞ্চিত হয়ে চিত্রতারকাও দেখতে পায় যে ম্লান হয়ে উঠছে তার মর্যাদা। এমনকি সবচেয়ে রূপসীটিও কখনো আগামী কালের জন্যে নিশ্চিত থাকতে পারে না, কেননা তার অস্ত্রগুলো যাদুধর্মী, আর যাদু অস্থিরমতি। সে দৃঢ়ভাবে বাধা তার রক্ষকের–স্বামী বা প্রেমিকের সাথে, যেমন ‘সতী’ স্ত্রী বাঁধা থাকে স্বামীর সাথে। শয্যাসঙ্গিনী হিশেবেই শুধু পুরুষটিকে তার সেবাদানে বাধ্য নয়, তাকে সহ্য করতে হয় পুরুষটির চালচলন, তার আলাপচারিতা, তার বন্ধুদের, এবং বিশেষ করে তার শ্লাঘার দাবিগুলো। মেয়েটির উঁচুখুড়ের জুতো বা সাটিনের স্কার্টের দাম শোধ করে তার পৃষ্ঠপোষক বিনিয়োগ করে একটা পুঁজি, যা থেকে সে লাভ তুলবে; শিল্পপতি, প্রযোজক তার রক্ষিতাকে মুক্তো ও পশমে ঢেকে দিয়ে তার মধ্য দিয়ে করে নিজের সম্পদ ও ক্ষমতার ঘোষণা; তবে নারীটি টাকা বানানোর একটা উপায়ই হোক বা টাকা ব্যয়ের একটা ছুতোই হোক, দাসত্বশৃঙ্খলটা একই। তার ওপর ঢেকে দেয়া উপহারগুলো শৃঙ্খল। আর এ-গাউনগুলো, এ-রত্নাবলি, যা সে পরে, সে কি আসলেই তার মালিক? অনেক সময় সম্পর্কচ্ছেদের পর পুরুষটি সেগুলো ফেরত চায়, যদিও খুবই ভদ্রভাবে।
তার আনন্দগুলো ছেড়ে না দিয়ে তার রক্ষককে ‘ধরে রাখা’র জন্যে নারীটি প্রয়োগ করবে একই কূটকৌশল, ছলচাতুরি, মিথ্যাচার, ভণ্ডামো, যেগুলো কলুষিত করে বিবাহিত জীবনকে; সে যে শুধু ভান করে দাসত্বের, তার কারণ এ-খেলাটিই দাসত্বের। যতো দিন সে টিকিয়ে রাখে তার রূপ ও সুখ্যাতি, যদি তখনকার প্রভু ঘৃণ্য হয়ে ওঠে, তাহলে সে তার স্থানে নিতে পারে আরেকটি। তবে রূপ একটা দুশ্চিন্তা, এটা একটি ঠুনকো সম্পদ; হেতাইরা একান্তভাবেই নির্ভর করে তার দেহের ওপর, সময়ের সাথে নির্মমভাবে যার দাম পড়ে যায়; বুড়ো হওয়ার বিরুদ্ধে তার সগ্রাম। ধারণ করে চরম নাটকীয় রূপ। যদি তার মহামর্যাদা থাকে, তাহলে সে তার মুখমণ্ডল ও দেহকাঠামোর ধ্বংসপ্রাপ্তির পরও টিকে থাকতে পারবে। কিন্তু খ্যাতি টিকিয়ে রাখা, যা তার সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য সম্পত্তি, তাকে অধীনস্থ করে নিকৃষ্টতম স্বেচ্ছাচারিতার : জনমতের। হলিউডের তারকাদের অধীনতা সুবিদিত। তাদের দেহ তাদের নিজেদের নয়; প্রযোজক ঠিক করে তাদের চুলের রঙ, তাদের ওজন, তাদের দেহবল্লরী, তাদের ধরন; গালের বাঁক বদল করার জন্যে তুলে ফেলা হতে পারে তাদের দাঁত। স্বল্পাহার, শরীরচর্চা, লাগসই থাকা, হয়ে ওঠে এক দৈনিক ভার। পার্টিতে যাওয়া ও ফষ্টিনষ্টি করার নাম দেয়া হয় ‘সশরীরে আত্মপ্রকাশ’; ব্যক্তিগত জীবন হয়ে ওঠে বাহ্যজীবনের একটি দিক। ফ্রান্সে কোনো লিখিত নিয়ম নেই, তবে ধূর্ত ও চতুর নারী জানে তার ‘প্রচার’ কী দাবি করে তার কাছে। যে-তারকা এসব প্রয়োজনের কাছে সুনম্য হতে অস্বীকার করে, সে ভোগ করে একটি নৃশংস বা ধীর, তবে অবধারিত, সিংহাসনচ্যুতি। জনগণের মনোরঞ্জন যে-নারীর পেশা, তার থেকে সম্ভবত কম ক্রীতদাস একটি বেশ্যা, যে দান করে তার দেহ। কোনো নারী, যে ‘আবির্ভূত’ হয়েছে এবং যাকে বিশেষ। কোনো পেশায় অভিনয়, গান, নাচে–প্রতিভাসম্পন্ন বলে গণ্য করা হয়, সে মুক্তি পায়হেতাইরার অবস্থান থেকে; সে উপভোগ করতে পারে প্রকৃত স্বাধীনতা। কিন্তু অধিকাংশই তাদের জীবনভর থাকে এক আশঙ্কাজনক অবস্থায়, তারা থাকে জনগণের ও পুরুষদের নব নবরূপে মনোরঞ্জনের অন্তহীন আবশ্যকতার নিচে।
প্রায়ই রক্ষিত নারী আত্মস্থ করে নেয় তার পরনির্ভরতা; জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে সে মেনে নেয় এর মূল্যবোধগুলো; সে অনুরাগী হয় ফ্যাশনদুরস্ত সমাজের এবং গ্রহণ করে এর রীতিনীতি; সে চায় যে তাকে মূল্যায়ন করা হোক বুর্জোয়া মানদণ্ডের ভিত্তিতে। ধনশালী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ওপর একটি পরগাছা হয়ে সে গ্রহণ করে মধ্যবিত্তের ভাবনাচিন্তা; সে ‘সৎ-চিন্তাশীল’; কিছুকাল আগে সে তার কন্যাকে পড়াতো কনভেন্টে এবং বুড়ো হওয়ার পর, যথোচিত প্রচারের মধ্যে ধর্মান্তরগ্রহণ করে, যোগ দিতো খ্রিস্টের নৈশভোজপর্ব উদযাপনে। সে থাকে রক্ষণশীলদের পক্ষে। জোলা এ-চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যটি স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন নানার নায়িকার মধ্যে :
বই ও নাটকের বিষয় সম্পর্কে নানার ছিল সুনির্দিষ্ট মত : সে চাইতো কোমল ও মানসিক উন্নতিসাধক শৈলির বই, এমন সব জিনিশ যা তাকে স্বপ্ন দেখাতো ও তার আত্মার নৈতিক উন্নতিসাধন করত… সে ক্ষুব্ধ ছিলো প্রজাতন্ত্রীদের বিরুদ্ধে। ওই শুয়োরগুলো যারা কখনো স্নান করতো না, কী তারা চেয়েছিলো? জনগণ কি সুখী ছিলো না, সম্রাট কি সব কিছু করে নি তাদের জন্যে? আস্ত শুয়োরের পাল, এই জনগণ! সে তাদের চিনতো, সে আপনাকে তাদের সম্পর্কে সব কিছু বলে দিতে পারতো…না, সত্যিই, তাদের প্রজাতন্ত্র সকলের জন্যে হতো একটা মহাবিপর্যয়। হে আমার ঈশ্বর, যতো কাল সম্ভব আমার সম্রাটকে রক্ষা করো।
