হেতাইরা শব্দটি আমি ব্যবহার করি সে-সব নারীদের বোঝনোর জন্যে, যারা শুধু দেহ নয়, বরং তাদের সমগ্র ব্যক্তিত্ব নিয়োগ করে শোষণের পুঁজি হিশেবে। হেতাইরা বিশ্বকে প্রকাশ করে না, সে মানবিক সীমাতিক্ৰমণতার কোনো সরণি উন্মুক্ত করে না; এর বিপরীতে, সে নিজের লাভের জন্যে সম্মোহিত করতে চায় বিশ্বকে। অনুরাগীদের কাছে সম্ভোগের জন্যে নিজেকে দান করে, সে ত্যাজ্য করে না তার সে–অক্রিয়নারীত্বকে, যা তাকে উৎসর্গিত করে পুরুষের কাছে : সে একে সমৃদ্ধ করে এক ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতায়, যা তাকে সমর্থ করে পুরুষদের তার রূপের ফাঁদে ধরতে ও তাদের ওপর ফায়দা লুটতে; সে নিজের সঙ্গে তাদের গ্রাস করে সীমাবদ্ধতায়।
যদি সে এ-পথ ধরে, তাহলে নারী সফল হয় কিছুটা স্বাধীনতা অর্জনে। বহু পুরুষের কাছে নিজেকে ভাড়া দিয়ে সে বিশেষ কারো অধীনে থাকে না; সে জমায় যে-টাকা ও যে-নাম ‘বিক্রি করে’, যেমন কেউ বিক্রি করে পণ্যসামগ্রী, তা তার। আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। প্রাচীন গ্রিসের নারীদের মধ্যে যারা সর্বাধিক স্বাধীনতা ভোগ করতো, তারা মাতৃকাও ছিলো না সাধারণ বেশ্যাও ছিলো না, তারা ছিলো হেতাইরা। রেনেসাঁসের বারবনিতারা ও জাপানের গেইশারা তাদের কালের অন্য নারীদের থেকে অনেক বেশি স্বাধীনতা ভোগ করতো। যে-ফরাশি নারীর স্বাধীনতাকে আমাদের কাছে পুরুষের স্বাধীনতার সমতুল্য বলে সবচেয়ে বেশি মনে হয়, তিনি সম্ভবত সতেরো শতকের বুদ্ধিমান ও রূপসী নারী নিনো দ্য ক্ল। স্ববিরোধীরূপে, যেনারীরা তাদের নারীত্বকে চূড়ান্তরূপে ব্যবহার করে, তারা এমন একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করে নিজেদের জন্যে, যা প্রায় পুরুষের পরিস্থিতির সমতুল্য; তারা শুরু করে সে-লিঙ্গ দিয়ে, যা তাদের কর্মরূপে সমর্পণ করে পুরুষদের কাছে, তারপর তারা হয়ে ওঠে কর্তা। তারা শুধু পুরুষদের মতো নিজেদের জীবিকাই অর্জন করে না, তারা বিরাজ করে এমন এক গোষ্ঠির ভেতরে, যা প্রায়-একান্তভাবে পুরুষের; তারা আচরণে ও আলাপচারিতায় স্বাধীন, তারা অর্জন করতে পারে–নিনো দ্য ক্লর মতো–বিরলতম বুদ্ধিবৃত্তিগত মুক্তি। সবচেয়ে সম্মানিতরা প্রায়ই পরিবৃত থাকে শিল্পী ও লেখকদের দিয়ে, যারা ক্লান্তি বোধ করে ‘সতী’ নারীতে।
পুরুষদের কিংবদন্তি চরম মনোমমাহন প্রতিমূর্তি লাভ করে হেতাইরায়; দেহে ও চেতনায় সে সকলের অপ্রাপণীয়, সে প্রতিমা, অনুপ্রেরণা, শিল্পকলার দেবী; চিত্রকর ও ভাস্কররা তাকে চাইবে মডেলরূপে; সে স্বপ্নযোগাবে কবিদের মনে; তার ভেতরের বুদ্ধিজীবীটি সদ্ব্যবহার করবে নারীর ‘বোধি’র সম্পদগুলো। সমতকার থেকে তার পক্ষে বুদ্ধিমান হওয়া সহজ, কেননা তার ভণ্ডামো কম। তাদের মধ্যে যারা প্রতিভায় শ্রেষ্ঠ, তারা শুধু পুরুষদের বিশ্বস্ত মন্ত্রণাদাতা ইজেরিয়ার ভূমিকায়ই সন্তুষ্ট থাকবে না; তারা চাইবে তাদের অক্রিয় গুণগুলোকে কর্মে রূপান্তরিত করতে। সার্বভৌম কর্তারূপে বিশ্বে বেরিয়ে এসে, তারা লেখে কবিতা ও গদ্য, ছবি আঁকে, সঙ্গীত সৃষ্টি করে। এভাবে ইতালীয় বারবনিতাদের মধ্যে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন ইম্পেরিয়া। নারীর পক্ষে পুরুষকে হাতিয়ার হিশেবে ব্যবহার করা এবং পুরুষটির সহায়তায় তার পক্ষে পুরুষের কাজ সম্পন্ন করাও সম্ভব; ক্ষমতাশালী পুরুষদের প্রিয় রক্ষিতারা, তাদের শক্তিমান প্রেমিকদের মাধ্যমে, সব সময়ই অংশ নিয়েছে বিশ্বশাসনে।
এ-ধরনের নারীমুক্তি কার্যকর হতে পারে কামের স্তরেও। পুরুষের থেকে সে পায় যে-অর্থ ও অন্যান্য সুবিধা, তা দিয়ে সে ক্ষতিপূরণ করতে পারে তার নারীধর্মী। হীনম্মন্যতা গূঢ়ৈষার; টাকার আছে একটি পবিত্রকর ভূমিকা; এটা অবসান ঘটায় দুলিঙ্গের যুদ্ধের। বহু নারী, যারা পেশাদার নয়, তারা যখন তাদের প্রেমিকদের কাছে থেকে চেক ও উপহার লাভের জন্যে চাপ দেয়, তারা এটা শুধু ধনসম্পত্তির লোভে করে না; কেননা পুরুষটিকে অর্থ ব্যয়ে বাধ্য করা এবং তার জন্যেও ব্যয় করা, আমরা দেখতে পাবো–হচ্ছে তাকে একটি হাতিয়ারে রূপান্তরিত করা। এভাবে নারীটি এড়িয়ে যায় তার নারী হওয়ার ব্যাপারটি। পুরুষটি হয়তো ভাবতে পারে যে নারীটি ‘আছে’ তার, তবে এ-যৌন অধিকারকরণ একটি প্রতিভাস; বরং অধিকতর দৃঢ় আর্থিক ক্ষেত্রে নারীটির অধিকারেই আছে পুরুষটি। তৃপ্ত হয়েছে নারীটির গর্ব। সে নিজেকে সমর্পণ করতে পারে প্রেমিকের আলিঙ্গনে; এমন কোনো ইচ্ছের কাছে সে ধরা দিচ্ছে না, যা তার নিজের নয়; তার সুখ কোনো অর্থেই তার ওপর ‘হানা’ যাবে; বরং এটাকে মনে হবে একটি অতিরিক্ত সুবিধা; সে ‘নীত’ হবে না, কেননা এর জন্যে তাকে দাম দেয়াহয়েছে।
বারবনিতা, অবশ্য, সুখ্যাত কামশীতল বলে। তার হৃদয় ও তার কামের অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারা তার জন্যে উপকারী, কেননা সে যদি ভাবাবেগী বা কামনাপরায়ণ হয়, তাহলে তার ঝুঁকি থাকে একটা পুরুষের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার, যে তাকে শোষণ করবে বা তার ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করবে বা তাকে দুঃখযন্ত্রণা দেবে। যে-সব আলিঙ্গন সে গ্রহণ করে। বিশেষ করে তার কর্মজীবনের শুরুতে সেগুলোর অনেকগুলোই অবমাননাকর; পুরুষের ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে তার বিদ্রোহ প্রকাশ পায় তার কামশীতলতায়। হেতাইরারা, মাতৃকাদের মতো, যথেচ্ছ নির্ভর করে ‘ছলচাতুরী’র ওপর, এর ফলে তারা ভাওতাবাজের মতো আচরণ করে। পুরুষদের প্রতি এ-ঘৃণা, এ-বিরাগ সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে শোষক-শশাষিতের খেলায় জয় সম্পর্কে এ-নারীরা আদৌ নিশ্চিত নয়। এবং, প্রকৃতপক্ষে, পরনির্ভরতা এখনো তাদের বিপুলসংখ্যক সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাগ্য।
