সাধারণ বেশ্যা ও উচ্চ-শ্রেণীর হেতাইরার মধ্যে আছে বহু মাত্ৰাভেদ। মৌলিক পার্থক্যটি এখানে যে প্রথমটি ব্যবসা চালায় সরল সাধারণত্বের মধ্যে নারী হিশেবেযার ফল হচ্ছে প্রতিযোগিতা তাকে আটকে রাখেশোচনীয় অস্তিত্বের স্তরে; আর সেখানে দ্বিতীয়টি প্রচেষ্টা চালায় নিজের স্বীকৃতি লাভের জন্যে একজন ব্যক্তি হিশেবে–এবং যদি সে সফল হয়, তাহলে সে উচ্চাভিলাষ পোষণ করতে পারে। রূপ ও মোহনীয়তা বা যৌনাবেদন এখানে আবশ্যক, তবে তা-ই যথেষ্ট নয় : নারীটিকে অবশ্যই হতে হবে বিশিষ্ট। একথা সত্য, তার গুণাবলি প্রায়ই প্রকাশিত হতে হবে কোনো পুরুষের কামনার মধ্য দিয়ে; তবে সে তখই ‘পৌছোবে’, তখনই সূচনা হবে তার কর্মজীবনের, বলতে গেলে, যখন পুরুষটি বিশ্বের মনোযোগ আকর্ষণ করবে তার যোগ্যতার প্রতি। গত শতকে তার নিজ শহরের বাড়ি, তার গাড়ি, তার মণিমুক্তো সাক্ষ্য দিতে রক্ষকের ওপর রক্ষিতা নারীর প্রভাবের এবং তাকে উন্নীত করতো দেমি-মদের স্তরে; যতো দিন পুরুষেরা তার জন্যে ধ্বংস করতে থাকতো নিজেদের ততো দিন দৃঢ়ভাবে প্রতিপন্ন হতো তার যোগ্যতা। সামাজিক ও আর্থনীতিক পরিবর্তন লোপ করেছে এ-জৌলুসপূর্ণ ধরনটি। এখন আর এমন কোনো দেমি-মদ নেই, যার মধ্যে কোনো খ্যাতি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। উচ্চাভিলাসীরা নারীরা আজকাল খ্যাতি অর্জনের প্রচেষ্টা চালায় একটা ভিন্ন রীতিতে। হেতাইরার সাম্প্রতিক প্রতিমূর্তি চিত্রতারকা। পাশে একটি স্বামী নিয়ে যা কঠোরভারে আবশ্যক হলিউডে বা একটি দায়িত্বশীল পুরুষ বন্ধু নিয়ে, সে আছে ফ্রাইনি ও ইম্পেরিয়ার ধারায়। পুরুষের স্বপ্নে সে দান করে নারী, আর পুরুষ এর মূল্য পরিশোধ করে তাকে অর্থ ও খ্যাতি দিয়ে।
বেশ্যাবৃত্তি ও শিল্পকলার মধ্যে সব সময়ই আছে এক অস্পষ্ট সম্পর্ক, এ-কারণে যে সৌন্দর্য ও কামসুখ দ্ব্যর্থবোধকভাবে সম্পর্কিত। তবে, প্রকৃতপক্ষে, সৌন্দর্য কামনা জাগায় না; তবে প্রেমের প্লাতোনীয় তত্ত্ব কামুকতার যে-সত্যতাপ্রতিপাদন প্রস্তাব করেছে, তা ভণ্ডামোপূর্ণ। ফ্রাইনি যখন অ্যাথেন্সের আরিপাগাসের বিচারকদের সামনে উন্মোচন করে তার বক্ষ এবং নিরপরাধ মুক্তি লাভ করে, তখন সে তাদের নিবিষ্টভাবে অবলোকন করতে দেয় একটি বিশুদ্ধ ভাব। অনাবৃত একটি দেহপ্রদর্শন হয়ে ওঠে এক শিল্পকলা প্রদর্শনী; মার্কিন বার্লেক ন্যাংটো হওয়াকে পরিণত করেছে নাটকে। ‘নগ্নিকা নিস্পাপ’, ঘোষণা করে সে-বুড়ো ভদ্রলোকেরা, যারা ‘শিল্পসম্মত নগ্নিকা’র নামে সংগ্রহ করে অশ্লীল ছবি। বেশ্যালয়ে বাছাইয়ের প্রথম দৃশ্যটি হচ্ছে একদল লোকের প্রদর্শনী; তা যদি একটু বেশি জটিল হয়, তাহলে এসব প্রদর্শনী খদ্দেরদের কাছে হয়ে ওঠে ‘জীবন্ত ছবি’ বা ‘শিল্পভঙ্গি’।
যে-বেশ্যা ব্যক্তিগত মূল্য অর্জন করতে চায়, সে নিজেকে অক্রিয় মাংস প্রদর্শনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে না; সে চেষ্টা করে বিশেষ প্রতিভা দেখানোর। প্রাচীন গ্রিসের। মেয়ে বাঁশরিবাদকেরা নাচগানে মুগ্ধ করতে পুরুষদের। আলজেরিয়ার আরব নারীরা দেখায় দাঁস দ্য ভাত্র (উদরনৃত্য); স্পেনের যে-মেয়েরা নাচে ও গান গায় বারিও চীনোতে, তারা নিতান্তই সুকুমারভাবে নিজেদের দান করে রসজ্ঞদের কাছে। জেলার নানা মঞ্চে আবির্ভূত হয় ‘রক্ষক’ পাওয়ার জন্যে। কিছু সঙ্গীতশালা–আগে যেমন ছিলো কিছু নৈশক্লাব–নিতান্তই বেশ্যালয়। যে-সব বৃত্তিতে নারীরা প্রদর্শনীয়, সেগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে নাগরালির জন্যে। প্রশ্নাতীতভাবে আছে অনেক মেয়েট্যাক্সি নর্তকীরা, ফ্যান নর্তকীরা, ডিকয় মেয়েরা, দেয়ালে টাঙানোর ছবির মেয়েরা, মডেলরা, গায়িকারা, অভিনেত্রীরা–যারা পৃথক রাখে প্রেমের জীবন ও পেশা; পেশায় যতো বেশি দরকার পড়ে কৌশল ও সৃষ্টিশীলতা, তখন তাকেই লক্ষ্য বলে গণ্য করা যায়; কিন্তু যে-নারী জনসাধারণের কাছে উপস্থিত হয় জীবিকার জন্যে প্রায়ই সে তার রূপকে অধিকতর অন্তরঙ্গভাবে ব্যবসায় খাটানোর প্ররোচনা বোধ করে। উল্টোভাবে, বারবনিতা তার আসল ব্যবসা ঢাকার জন্যে চায় একটা বৃত্তি রাখতে। কলেতের লি, এক বন্ধু যাকে সম্বোধন করেছে ‘প্রিয় শিল্পী’, তার মতো কমই আছে যে উত্তর দিতে পারে : ‘শিল্পী? সত্যিই, আমার প্রেমিকেরা চরম অবিবেচক!’ আমরা দেখেছি যে হেতাইরার খ্যাতিই তাকে দেয় বিপণনযোগ্য দাম, এবং আজকাল মঞ্চে বা পর্দায়ই এমন একটা ‘নাম’ করা যায়, যা হয়ে উঠবে ব্যবসার পুঁজি।
সিন্ডেরেলা সব সময় মনোহর রাজকুমারের স্বপ্ন দেখে না; স্বামী বা প্রেমিক যা-ই হোক, নারী ভয় পায় যে তারা পরিণত হতে পারে স্বৈরাচারীতে; সে অনেক বেশি পছন্দ করে এটা স্বপ্ন দেখতে যে বিশাল প্রেক্ষাগারের দরোজার পাশে লাগানো আছে তার সহাস্য মুখচ্ছবি। তবে প্রায় অধিকাংশ সময়ই সে তার উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করতে পারে পুরুষের ‘রক্ষণ’-এর মাধ্যমে; এবং পুরুষেরাই–স্বামী, প্রেমিক, প্রণয়প্রার্থীরা তাকে বিজয়মুকুটেশোভিৎ করে তাদের অর্থ বা খ্যাতির অংশী করে। বিভিন্ন ব্যক্তি, বা জনতাকে খুশি করার এ-আবশ্যকতাই ‘তারকা’কে সম্পর্কিত করে। হেতাইরার সঙ্গে। তারা সমাজে পালন করে সমতুল্য ভূমিকা।
