তবে সাধারণভাবে পেশাগত কাজের সময় নারী থাকে ‘শীতল’। ঘৃণাভরে, তাদের অনেকে তাদের সমগ্র খদ্দেরপালের প্রতি নিরাসক্তি ছাড়া আর কিছু বোধ করে না। ‘আহা, পুরুষ কী রকম বেকুব! নারীদের যা ইচ্ছে হয় তাতেই পুরুষের মাথা ভরাট তোলা নারীদের পক্ষে কত সহজ!’ লিখেছেন মারি-তেরেস। কিন্তু অনেকেই পুরুষের প্রতি পোষণ করে তিক্ত ক্ষোভ; একদিকে, তাদের বমি পায় পুরুষের অস্বাভাবিক রুচি বা অনাচার-এ। পুরুষ তাদের কলুষিত রুচি, যা তারা স্ত্রীদের বা উপপত্নীদের কাছে স্বীকার করতে সাহস করে না, তা চরিতার্থ করার জন্যেই বেশ্যালয়ে যাক, বা। বেশ্যালয়ে যাওয়ার ফলেই মুহূর্তের ঝোঁকে তারা অনাচারের নতুন ফন্দি আঁটুক, সত্য হচ্ছে যে বহু পুরুষ চায় যে নারীরা অংশ নিক বিচিত্র বিকৃতিতে। মারি-তেরেস অভিযোগ করেছেন যে ফরাশি পুরুষদের, বিশেষ করে, আছে চির-অতৃপ্ত কল্পনাপ্রতিভা। বেশ্যার সহানুভূতিশীল চিকিৎসকের কাছে বলবে যে ‘সব পুরুষই কম বা বেশি কলুষিত’।
আমার এক বন্ধু বজো হাসপাতালে দীর্ঘ সময় ধরে আলাপ করেছে এক তরুণী বেশ্যার সাথে; সে ছিলো খুবই বুদ্ধিমান, সে কাজ শুরু করেছিলো চাকরানি হিশেবে, এবং থাকতো একটি দালালের সাথে, যার প্রতি সেপোষণ করতে অনুরাগ। ‘প্রত্যেক পুরুষই নষ্ট,’ সে বলেছে, ‘শুধু আমারটি ছাড়া। এজন্যেই আমি তাকে ভালোবাসি। তার মধ্যে কখনো কোনো পাপের চিহ্ন দেখা গেলে আমি তাকে ছেড়ে দেবো। খদ্দের প্রথমবার সব সময় যা-তা করার সাহস করে না, সে স্বাভাবিক থাকে; কিন্তু যখন সে আবার আসে, তখন সে এমন সব কাজ করতে চায়… তুমি বলছো যে তোমার স্বামীর কোনো দোষ নেই, কিন্তু তুমি একদিন দেখতে পাবে। তার আছে সব দোষই’। এসব দোষের জন্যে সে অপছন্দ করতো তার খদ্দেরদের। আমার আরেক বন্ধু ফ্রেসনেতে ১৯৪৩ অব্দে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে একটি বেশ্যার সাথে। ওই মেয়েটি বলে যে তার। খদ্দেরদের শতকরা নব্বই ভাগই নষ্ট, শতকরা পঞ্চাশ ভাগ পায়ুকামী।
এসব নারী তাদের খদ্দেরদের প্রতি যে-বৈরিতা বোধ করে, তাতে প্রায়ই থাকে শ্রেণীগত ক্ষোভের ব্যাপার। হেলেন ডয়েটশ বিস্তৃতভাবে বর্ণনা করেছেন রূপসী আন্নার ইতিহাস, যে সাধারণত ছিলো ভদ্র, কিন্তু মাঝেমাঝে ক্রোধে হয়ে উঠতো উন্মত্ত, বিশেষ করে কর্মকর্তাদের ওপর, যার ফলে তাকে চিকিৎসার জন্যে আনা হয় একটি মানসিক হাসপাতালে। সংক্ষেপে, তার গৃহজীবন এতো অসুখী ছিলো যে চমৎকার সুযোগ সত্ত্বেও সে কখনোই বিয়ে করতে রাজি হয় নি। সে বেশ খাপ খাইয়ে নিয়েছিলো তার বেশ্যার জীবনের সাথে, তবে যক্ষ্মার জন্যে তাকে পাঠানো হয় হাসপাতালে। সে চিকিৎসকদের ঘৃণা করতো, যেমন ঘৃণা করতে সমস্ত সম্রান্ত ব্যক্তিদের। ‘কেনো নয়?’ সে বলতো। ‘আমরা কি অন্য যে-কারো থেকে ভালোভাবে জানি না যে এসব লোক কতো সহজেই ছুঁড়ে ফেলে তাদের দ্রতা, আত্মসংযম, ও প্রতিপত্তির মুখোশ এবং পশুদের মতো আচরণ করে?’ এ-মনোভাব ছাড়া সে ছিলো মানসিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ। আরেকজন তরুণী বেশ্যা, জুলিয়া, পনেরো বছর বয়স থেকেই যে ছিলো কাম-উচ্ছল, সে শুধু তাদের প্রতিই ছিলো কোমল, মধুর, ও উপকারী, যাদের সে মনে করতো দুর্বল, বা দরিদ্র এবং অসহায়। ‘সে অন্যদের মনে করতো নীতিবিগর্হিত পশু, যাদের প্রাপ্য কঠোর শাস্তি’।
অধিকাংশ বেশ্যাই নৈতিকভাবে খাপ খাইয়ে নেয়া তাদের জীবনধারার সাথে। এমন নয় যে তারা জন্মত বা উত্তরাধিকারসূত্রে অনৈতিক, তবে যৌক্তিকভাবেই তারা সে-সমাজের সাথে নিজেদের সংহত মনে করে, যেখানে তাদের সেবার চাহিদা আছে। তারা বেশ ভালোভাবেই জানে যে পুলিশ সার্জেন্টের নৈতিক উন্নতিসাধক শব্দবহুল গলাবাজিভরা বক্তৃতা আর বেশ্যালয়ের বাইরে তাদের খদ্দেরদের ঘোষিত মহৎ ভাবাবেগগুলো তাদের বিশেষ ভয় দেখাতে পারে না। মারি-তেরেস ব্যাখ্যা করেছেন যে তাঁকে টাকা দেয়া হোক বা না হোক, তাঁকে একই রকমে বেশ্যাই বলা হয়, তবে যদি টাকা দেয়া হয়, তখন তাকে বলা হয় একটা অতিচতুর বেশ্যা; যখন তিনি টাকা চান, তখন লোকটি ভান করে যে সে তাকে ওই ধরনের মেয়ে মনে করে নি।
তাদের নৈতিক বা মনস্তাত্ত্বিক পরিস্থিতি যে বেশ্যাদের ভাগ্যকে দুর্বহ করে তোলে, তা নয়। তাদের পার্থিব অবস্থাই অধিকাংশ সময় শোচনীয়। তাদের দালাল ও বাড়িওয়ালিদের দ্বারা শশাষিত হয়ে তারা বাস করে একটা নিরাপত্তাহীন অবস্থার মধ্যে, এবং তাদের তিন-চতুর্থাংশই থাকে কপর্দকহীন। যে-চিকিৎসকেরা হাজার হাজার বেশ্যা পরীক্ষা করেছেন, তাঁদের মতে জীবনের পাঁচ বছরের মধ্যেই প্রায় পঁচাত্তর শতাংশ আক্রান্ত হয়উপদংশে। অনভিজ্ঞ অল্পবয়স্করা, উদাহরণস্বরূপ, ভয়াবহভাবে সংক্রমণগ্রাহী; পঁচিশ শতাংশকে অস্ত্রোপচার করতে হয় গনরিয়াঘটিত জটিলতার জন্যে। বিশজনের মধ্যে একজনের আছে যক্ষ্মা; ষাট শতাংশ হয়ে ওঠে অতিপানাসক্ত বা মাদকাসক্ত; চল্লিশ শতাংশ মারা যায় চল্লিশ বছর বয়সের আগেই। আরো বলা দরকার যে, পূর্বসতর্কতা সত্ত্বেও, যখন তখন তারা গর্ভবতী হয়ে পড়ে এবং তারা নিজেরা নিজেদের অস্ত্রোপচার করে, সাধারণত খুবই খারাপ পরিবেশে। সাধারণ বেশ্যাবৃত্তি একটা শোচনীয় বৃত্তি, যাতে যৌন ও আর্থিকভাবে শোষিত হয়ে, পুলিশের স্বেচ্ছাচারের শিকার হয়ে, অপমানজনক চিকিৎসামূলক পরিদর্শনের নিচে থেকে, খদ্দেরদের খেয়ালখুশির খাদ্য হয়ে, অবধারিত সংক্রমণ ও ব্যাধি, দুর্দশায় আক্রান্ত হয়ে নারী প্রকৃত অর্থেই হীন হয়ে নেমে যায় বস্তুর স্তরে।
