সাহিত্য ‘জুলো’কে পরিণত করেছে একটি সুপরিচিত চরিত্রে। সে বেশ্যার জীবনে পালন করে রক্ষকের ভূমিকা। কাপড়চোপড় কেনার জন্যে সে টাকা অগ্রিম দেয়, তারপর নারীটিকে রক্ষা করে অন্য নারীদের প্রতিযোগিতা থেকে, পুলিশের থেকেঅনেক সময় সে নিজেই পুলিশ–এবং তার খদ্দেরদের থেকে, যারা খুবই সুখ পায় নারীটির প্রাপ্য টাকা শোধ না করতে এবং তাদের অনেকে পরিতৃপ্তি পেতে চায় তার ওপর তাদের ধর্ষকাম চরিতার্থ করে। কয়েক বছর আগে মাদ্রিদের ফ্যাশিবাদী শৌখিন বিত্তবান যুবসম্প্রদায় মজা পেতে শীতের রাতে বেশ্যাদের নদীতে ছুঁড়ে ফেলে : ফ্রান্সে অনেক সময় ছাত্ররা প্রমোদের উদ্দেশ্যে মেয়েদের নিয়ে যায়পল্লীগ্রামে এবং সেখানে তাদের ফেলে রেখে আসে, ন্যাংটো। টাকা পাওয়ার নিশ্চয়তার জন্যে এবং পীড়ন এড়ানোর জন্যে বেশ্যাদের একটি পুরুষ দরকার পড়ে। পুরুষটি তাদের নৈতিক সমর্থনও দেয়। বেশ্যাটি প্রায়ই থাকে তার সাথে প্রেমে জড়িত; এবং প্রেমের মাধ্যমেই সে এসেছে এ-কাজে, বা প্রেম দিয়েই সে তার কাজের যাথার্থ প্রতিপাদন করে। তার পরিবেশে পুরুষ নারীর থেকে বিপুলভাবে শ্রেষ্ঠ, এবং এ-বিচ্ছিন্ন প্রতিবেশে গড়ে ওঠে এক ধরনের প্রেম-ধর্ম, এটাই ব্যাখ্যা করে কোনো কোনো বেশ্যার সংরাগপূর্ণ। আত্মবলিদানকে। এ-ধরনের মেয়ে তার পুরুষটির বল ও হিংস্রতার মধ্যে দেখতে পায় তার পৌরুষের লক্ষণ এবং অবলীলায় আত্মসমর্পণ করে তার কাছে। তার সাথে থেকে সে বোধ করে ঈর্ষা ও যন্ত্রণা, তবে পায় প্রেমিকার সুখও।
তবে বেশ্যা অনেক সময় তার পুরুষটির প্রতি বোধ করে শত্রুতা ও বিরক্তি; তবে ভয়ে সে থাকে তার পুরুষটির অধীনে, কেননা পুরুষটি তার ওপর প্রভাব বিস্তার করে রাখে। তাই অনেক সময় তার খদ্দেরদের মধ্যে থেকে একটি প্রেমিক নিয়ে সে সান্ত্বনা দেয় নিজেকে। মারি-তেরেস লিখেছেন;
তাদের জুলোরা ছাড়াও সব মেয়েরই ছিলো প্রেমিক; এবং আমারও। সে ছিলো নাবিক, খুবই চমৎকার মানুষ। যদিও সে ছিলো একটি ভালো প্রেমিক, তবু আমি তার সাথে জড়িয়ে পড়তে পারি নি, তবে আমরা ভালোবন্ধু ছিলাম। সে প্রায়ই আমার সাথে ওপরতলায় আসতো, সঙ্গম নয় শুধু কথা। বলার জন্যে; সে বলতো যে আমার ওখান থেকে বেরিয়ে পড়া উচিত, ওটা আমার উপযুক্ত স্থান নয়।
তারা প্রায়ই আকৃষ্ট হয় নারীদের প্রতি। বহু বেশ্যাই সমকামী। আমরা দেখেছি যে মেয়েদের জীবনের শুরুতে প্রায়ই ঘটে সমকামিতার অভিজ্ঞতা এবং অনেকে বসবাস করতে থাকে কোনো বান্ধবীর সাথে। আন্না রিউলিংয়ের মতে জর্মনির প্রায় বিশ শতাংশ বেশ্যা সমকামী। ফাইর্ড জানিয়েছেন কারাগারে তরুণী নারী-বন্দীরা বিনিময় করে অশ্লীলবৃত্তিক চিঠিপত্র, যেগুলোর স্বরগ্রাম খুবই সংরাগপূর্ণ এবং তাতে স্বাক্ষর থাকে ‘আজীবনতোমার’। এসব চিঠি ‘প্রেম-ভাবে-ভাবিত’ বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের চিঠির মতো; পরেরগুলো অনেক কম অভিজ্ঞ, অধিকতর ভীরু; আগেরগুলো অনিয়ন্ত্রিত তাদের আবেগে, যেমন শব্দে তেমনি কর্মে।
মারি-তেরেসের জীবনে–যিনি এতে দীক্ষিত হয়েছিলেন একটি নারীর দ্বারা আমরা দেখতে পাই ঘৃণ্য খদ্দের ও স্বৈরাচারী দালালের থেকে কতোটা বিশেষ সুবিধাজনক ভূমিকা পালন করে বান্ধবী:
জুলো একটি মেয়েকে নিয়ে এলো, একটা গরিব গৃহস্থঘরের মেয়ে, যার পায়ে এমনকি জুতোও ছিলো না। তার দরকারি সব জিনিশপত্র কেনা হলো একটা পুরোনো জিনিশের দোকান থেকে, এবং তারপর সে আমার সাথে কাজ করতে এলো। সে খুবই প্রীতিকর ছিলো, উপরন্তু, সে যেহেতু নারীদের ভালোবাসতো, তাই আমাদের দুজনের মধ্যে বেশ ভাব হলো। সেবিকাটির কাছে আমি যা-কিছু শিখেছিলাম, সে তার কিছু আমার মনে পড়িয়ে দিলো। আমরা প্রায়ই মজা করতাম এবং, কাজের বদলে, সিনেমায় যেতাম। আমাদের মাঝে তাকে পেয়ে আমি খুশি হয়েছিলাম।
যে-‘সতী’ নারী বাস করে নারীদের দ্বারা পরিবৃত হয়ে, তার পুরুষ প্রেমিকটি যেভূমিকা পালন করে, বেশ্যার বান্ধবীও পালন করে প্রায়ই একই ভূমিকা : সে প্রমোদের সঙ্গী, সে এমন একটি মানুষ যার সাথে সম্পর্কগুলো অবাধ ও নিরাসক্ত, তাই অনেকটা স্বেচ্ছাকৃত। পুরুষে ক্লান্ত হয়ে, তাদের ওপর বিরক্ত হয়ে বা নিতান্তই নিছক একটু ভিন্নতার জন্যে বেশ্যা বিনোদন ও সুখ খোঁজে নারীর বাহুতে। তা যা-ই হোক, যে-দুষ্কর্মে সহযোগিতার কথা আমি বলেছি, যা সরাসরি সম্মিলিত করে নারীদের, তা অন্য কোনোখানের থেকে এখানে বিরাজ করে অনেক বেশি সবলভাবে। মানবজাতির অর্ধেকের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক যেহেতু ব্যবসার ধরনের এবং সমাজ যেহেতু সামগ্রিকভাবে তাদের গণ্য করে ব্রাত্যরূপে, বেশ্যাদের নিজেদের মধ্যে থাকে একটা দৃঢ় সংহতি; তারা প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে, ঈর্ষাবোধ করতে পারে, পরস্পরকে অপমান করতে পারে, মারামারি করতে পারে; তবে একটা প্রতি-বিশ্ব তৈরির জন্যে তারা সুগভীরভাবে বোধ করে পরস্পরের প্রয়োজন, যে-বিশ্বে তারা ফিরে পায় তাদের মানবিক মর্যাদা। সহযোদ্ধাই বিশ্বাসভাজন ও সাক্ষী হিশেবে শ্রেয়।
বেশ্যা ও তার খদ্দেরদের মধ্যে সম্পর্ক বিষয়ে মতামত বহুবিচিত্র এবং সন্দেহ নেই যে আছে নানা ভিন্নতা। প্রায়ই জোর দিয়ে বলা হয় যে স্বেচ্ছাকৃত প্রীতির নিদর্শন হিশেবে বেশ্যা শুধু তার প্রেমিকের জন্যেই সংরক্ষিত রাখে মুখচুম্বন, এবং সে প্রেমের আলিঙ্গন ও পেশাগত আলিঙ্গনকে দুটি ভিন্ন জিনিশ বলেই গণ্য করে। পুরুষেরা যেসব সাক্ষ্যপ্রমাণ দেয়, সেগুলো সন্দেহজনক, কেননা তাদের অহমিকার ফলে তারা। সহজেই বোকা বনে মেয়েটির আনন্দ উপভোগের ভান দিয়ে। বলা দরকার যে ব্যাপারটি যখন দ্রুত ও ক্লান্তিকরভাবে এক খদ্দের থেকে আরেক খদ্দেরে যাওয়ার, বা একজন পরিচিত খদ্দেরের সাথে বারবার সম্পর্কের, তখন সব কিছুই ভিন্ন। মারিতেরেস সাধারণত তার ব্যবসা চালাতেন উদাসীনভাবে, তবে তার মনে পড়ে যে কিছু কিছু রাত ছিলো আনন্দদায়ক। এটা অজানা নয় যে কোনো কোনো মেয়ে টাকা নিতে অস্বীকার করে তার সে-খদ্দেরের থেকে, যে তাকে সুখ দিয়েছে, এবং অনেক সময়, খদ্দেরটি যদি অর্থসংকটে পড়ে, তখন মেয়েটি তাকে উদ্ধার করে টাকা দিয়ে।
