অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে গেলে তার অবস্থান বিবাহিত নারীর অবস্থানের সমতুল্য। ল্য পিউবার্তেতে মারো বলেন : ‘যারা নিজেদের বিক্রি করে বেশ্যাবৃত্তিতে ও যারা নিজেদের বিক্রি করে বিয়েতে, তাদের মধ্যে পার্থক্য শুধু দামে ও চুক্তির সময়ের দৈর্ঘ্যে’। উভয়ের জন্যেই যৌনকর্ম একটা সেবামূলক কাজ; একজনকে একটি পুরুষ ভাড়া করে সারাজীবনের জন্যে; আরেকজনের আছে নানা খদ্দের, যারা প্রত্যেকবার তাকে মজুরি দেয়। একজনকে অন্যান্য পুরুষ থেকে রক্ষা করে একটি পুরুষ; আরেকজনকে তারা সবাই রক্ষা করে তাদের প্রত্যেকের স্বৈরাচার থেকে। যা-ই ঘটুক না কেননা তাদের দেহদানের বিনিময়ে প্রাপ্ত সুযোগসুবিধা সীমাবদ্ধ হয়েপড়ে বিদ্যমান প্রতিযোগিতার ফলে; স্বামীটি জানে যে সে গ্রহণ করতে পারতো ভিন্ন একটি স্ত্রী; ‘দাম্পত্য দায়িত্ব’ পালন একটা ব্যক্তিগত অনুগ্রহ নয়, এটা একটি চুক্তিপূরণ। বেশ্যাবৃত্তিতে, পুরুষের কাম চরিতার্থ হতে পারে যে-কোনো দেহে, কেননা এ-কামনা বিশেষ হলেও তা কোনো নির্দিষ্ট বস্তু চায় না। একটি পুরুষকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে স্ত্রীও পারে না হেইরাও পারে না, যদি না স্ত্রীটি বা হেইরাটি পুরুষটির ওপর তার প্রাধান্য বিস্তার করতে পারে। তাদের মধ্যে প্রধান পার্থক্য হচ্ছে বৈধ স্ত্রী, যে উৎপীড়িত হয় বিবাহিত নারী হিশেবে, সে একটি মানুষ হিশেবে সম্মান পায়। যত দিন বেশ্যা মানুষ হিশেবে তার অধিকার না পাবে, ততো দিন সে একাধারে নির্দেশ করবে নারীর সব ধরনের দাসীত্ব।
কী প্রেষণা নারীকে চালিত করে বেশ্যাবৃত্তিতে, এ-সম্পর্কে বিস্ময় বোধ করা বোকামি; আজকাল আমরা আর মেনে নিই না লোম্রোসের সে-তত্ত্ব, যা বেশ্যা ও অপরাধীদের জড়ো করে এক জায়গায় এবং উভয়ের মধ্যেই দেখতে পায় অধঃপতিতদের; হতে পারে, পরিসংখ্যান যেমন নির্দেশ করে যে বেশ্যাদের মানসিক স্তর গড়মানের থেকে কিছুটা নিচে এবং তাদের মধ্যে কিছু নিশ্চিতভাবেই দুর্বলচিত্ত, কেননা মানসিক প্রতিবন্ধী নারীরা বেছে নিতে চাইবে এমন পেশা, যাতে কোনো বিশেষ প্রশিক্ষণের দরকার পড়ে না; তবে তাদের অধিকাংশই স্বাভাবিক, কিছু আছে অত্যন্ত বুদ্ধিমান। তাদের নেই কোনো বংশগতিক দোষ, কোনো শারীরবৃত্তিক ক্রটি। সত্য হচ্ছে যে এমন একটি বিশ্বে, যেখানে দুর্দশা ও বেকারত্ব ব্যাপক, সেখানে যেপেশাই খোলা পাওয়া যায় তাতেই ঢুকতে চাইবে কিছু মানুষ; যত দিন আছে। পুলিশবাহিনী ও বেশ্যাবৃত্তি ততে দিন থাকবে পুলিশ ও বেশ্যারা, আরো বিশেষভাবে এজন্যে যে এ-পেশায় অন্য বহু পেশার থেকে আয় বেশ ভালো। পুরুষের চাহিদা যেসরবরাহ উদ্দীপ্ত করে, তাতে বিস্ময় বোধ করা নিছক ভণ্ডামো; এটা নিতান্তই এক প্রাথমিক ও সর্বজনীন আর্থনীতিক প্রক্রিয়ার ক্রিয়া। ‘পতিতাবৃত্তির সমস্ত কারণের মধ্যে’, ১৮৫৭ অব্দে তাঁর প্রতিবেদনে পারে-দুশাতেলে লিখেছেন, ‘কম মজুরির ফলে উৎপন্ন বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের থেকে অন্য কিছুই বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়’। সচ্চিন্তাশীল নীতিবানেরা বিদ্রুপের হাসি হেসে অবজ্ঞাভরে উত্তর দেন যে বেশ্যাদের কাঁদুনেকাহিনীগুলো অনভিজ্ঞ খদ্দেরদের সুবিধার জন্যে অলীক কল্পনারঞ্জিত বর্ণনামাত্র। এটা সত্য যে বেশ্যারা অনেকেই অন্য উপায়েও জীবিকা নির্বাহ করতে পারতো। তবে সে যে-পথটি বেছে নিয়েছে, তা যদি তার কাছে নিকৃষ্টতম মনে না হয়, তাহলে প্রমাণ হয় যে তার রক্তেই আছে পাপ; এটা বরং নিন্দা জ্ঞাপন করে সে-সমাজের প্রতি, যেসমাজে এ-পেশাটি এখনো সে-সব পেশার অন্যতম, যা বহু নারীর কাছে মনে হয়। ন্যূনতমভাবে অনাকর্ষণীয়। প্রায়ই জিজ্ঞেস করা হয় : কেননা সে এটা বেছে নিয়েছে? বরং প্রশ্নটি হচ্ছে : সে কেননা এটা বেছে নেয় নি?
এটা উল্লেখযোগ্য যে, একদিকে, বেশ্যাদের একটি বড়ো অংশ প্রাক্তন চাকরানি। কোনো চাকরানির ঘরের দিকে একবার তাকালেই এর কারণ বোঝা যায়। শোষিত, দাসীত্বে আবদ্ধ, যাকে মানুষ হিশেবে না দেখে দেখা হয় বস্তু হিশেবে, সব ধরনের কাজের এ-চাকরানি, শয্যাকক্ষের পরিচারিকা, ভবিষ্যতে তার নিজের ভাগ্যের কোনো উন্নতির লক্ষণই সে দেখতে পায় না; অনেক সময় তার ওপর পড়ে গৃহস্বামীর চোখ, তাকে তা মেনে নিতে হয়। এ-ধরনের গার্হস্থ্য দাসীতু ও যৌন অধীনতা থেকে সে পিছলে পড়ে এমন এক দাসত্বে, যা আগের থেকে হীন নয় এবং সে স্বপ্ন দেখে যে এটা হবে অনেক বেশি সুখের। তাছাড়া, গৃহদাসীরা থাকে তাদের বাড়ি থেকে অনেক দূরে; হিশেব করে দেখা গেছে যে প্যারিসের শতকরা ৮০ ভাগ বেশ্যাই আসে দূরাঞ্চল বা গ্রাম থেকে। পরিবারপরিজন যদি কাছাকাছি থাকে, তাহলে কোনো নারী সর্বজনীনভাবে ধিকৃত একটি পেশায় ঢুকতে গেলে বাধার সম্মুখিন হয় এবং তাকে তার মানসম্মান রক্ষা করে চলতে হয়; কিন্তু সে যখন হারিয়ে যায় কোনো মহানগরে এবং সমাজের সঙ্গে সংহতি লাভ করে না, তখন ‘নৈতিকতা’র বিমূর্ত ধারণাটি আর কোনো বাধাই হয় না।
যতো কাল মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোকেরা যৌনক্রিয়াকে বিশেষ করে কুমারীত্বকে ঘিরে রাখবে প্রচণ্ড ট্যাবুতে, ততো কাল বহু কৃষক ও শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে একে মনে হবে একটা ঔদাসীন্যের ব্যাপার। অজস্র অনুসন্ধান একমত যে বিপুল সংখ্যক তরুণী প্রথম আগন্তুকের কাছেই সতীত্বমোচনের জন্যে দান করে নিজেদের এবং তারপর যেকারো কাছে দেহদান তাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হয়। ডঃ বিজার একশো বেশ্যাকে তদন্ত করে পেয়েছেন এ-তথ্য : একজন তার কুমারীত্ব হারায় সাত বছর বয়সে, দুজন বারো বছর বয়সে, দুজন তেরো বছর বয়সে, ছ-জন চোদ্দো বছর বয়সে, সাতজন পনেরোতে, একুশজন ষোলোতে, উনিশজন সতেরোতে, সতেরোজন আঠারোতে, ছ-জন উনিশে; বাকিরা একুশ বছর বয়সের পর। তাই পাঁচ শতাংশ কুমারীত্ব হারিয়েছে বয়ঃসন্ধির আগেই। অর্ধেকের বেশি বলেছে যে তারা প্রেমের জন্যে দেহদান করেছে, কেননা তারা দেহদান করতে চেয়েছে; অন্যরা দেহদান করেছে অজ্ঞতাবশত। প্রথম রমণকারী প্রায়সই হয়ে থাকে অল্পবয়স্ক। সাধারণত সে হয়ে থাকে কোনো দোকান বা কর্মস্থলের সহকর্মী, বা কোনো বাল্যবন্ধু; তারপর পৌনপুনিকভাবে আসে সৈনিকেরা, শ্রমিকপ্রধানেরা, পরিচারকেরা, এবং ছাত্ররা; ডঃ বিজারের তালিকায় আছে দুজন আইনজীবী, একজন স্থপতি, একজন ডাক্তার, এবং একজন ঔষধবিদ। নিয়োগদাতার নিজের এ-ভূমিকা পালনের ঘটনা বরং দুর্লভ, যদিও জনপ্রিয় কিংবদন্তিতে এটা ব্যাপক; তবে প্রায়ই এ-কাজটি করে তার পুত্র বা ভ্রাতপুত্র বা তার কোনো বন্ধু। অন্য একটি সন্দর্ভে কঘেঁজ বারো থেকে সতেরো বছরের। পঁয়তাল্লিশটি তরুণীর কথা বলেছেন যাদের সতীত্বমোচন ঘটে এমন অপরিচিত ব্যক্তিদের দ্বারা, যাদের সঙ্গে তাদের আর কখনো দেখা হয় নি; তারা নিরাসক্তভাবে দেহদান করেছে, কোনো সুখ পায় নি। এসব প্রতিবেদনে প্রত্যেকের ঘটনার যেবিস্তৃত বিবরণ দেয়াহয়েছে, তাতে দেখা যায় কতো ঘন ঘন এবং কতো বিচিত্র পরিস্থিতিতে মেয়েরা ও তরুণী নারীরা দেহদান করে হঠাৎ আগন্তুকদের, নতুন পরিচিতদের, ও বয়স্ক আত্মীয়দের কাছে, এর সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে তারা থাকে অজ্ঞ বা উদাসীন।
