এছাড়াও পরিস্থিতি ও প্রথা অনুসারে ব্যভিচার ধারণ করে নানা বৈশিষ্ট্য। আমাদের সভ্যতায়, যেখানে টিকে আছে পিতৃতান্ত্রিক প্রথা, বৈবাহিক অবিশ্বস্ততা আজো স্বামীর থেকে স্ত্রীর জন্যে অনেক বেশি জঘন্য।
এ-কঠোরতার আদিকারণগুলো আমরা আলোচনা করেছি : স্ত্রীর ব্যভিচার পরিবারে নিয়ে আসতে পারে কোনো অজানা পুরুষের পুত্র, এবং প্রবঞ্চিত করতে পারে বৈধ উত্তরাধিকারীদের স্বামী হচ্ছে প্রভু, স্ত্রী তার সম্পত্তি। সামাজিক পরিবর্তন, জন্মনিয়ন্ত্রণ চর্চা হরণ করেছে এসব অভিপ্রায়ের বহু শক্তি। কিন্তু নারীকে পরনির্ভর অবস্থায় রাখার ধারাবাহিক বাসনা আজো স্থায়ী করে রেখেছে তাকে ঘিরে রাখা নিষেধগুলোকে। সে প্রায়ই আত্মস্থ করে ওগুলো; সে চোখ বুজে থাকে তার স্বামীর বৈবাহিক খেয়ালখুশির দিকে, যদিও তার ধর্ম, তার নৈতিকতা, তার ‘সতীত্ব’, তাকে নিষেধ করে নিজে ওই ধরনের আচরণ করতে। তার সহচররা চাপিয়ে দেয় যে-সব নিয়ন্ত্রণ–বিশেষ করে প্রাচীন ও নব বিশ্বের ছোটো ছোটো শহরগুলোতে সেগুলো তার স্বামীর জন্যে যতোটা তার থেকে অনেক বেশি কঠোর তার জন্যে; তার স্বামী অনেক বেশি বাইরে যায়, সে ভ্রমণে যায়, এবং আনুগত্য ক্ষুন্ন করলে তাকে অনেক বেশি প্রশ্রয় দেয়া হয়; নারীর ঝুঁকি থাকে বিবাহিত নারী হিশেবে তার সুনাম ও মর্যাদা হারানোর। যে-সব ছলে নারী এসব পাহারা ভণ্ডুল করতে সমর্থ হয়, তা প্রায়ই বর্ণনা করা হয়েছে; এবং আমি নিজেই জানি প্রাচীন কঠোর নীতিপরায়ণ একটি ছোটো পর্তুগিজ শহরের কথা, যেখানে তরুণী স্ত্রীরা শাশুড়ি বা ননদকে সঙ্গে না নিয়ে কখনো বাইরে যায় না; তবে ঘর ভাড়া পাওয়া যায় কেশবিন্যাসকারীর কাছে, যেখানে প্রেমিকপ্রেমিকারা স্বল্পকালের জন্যে মিলন উপভোগ করতে পারে। বড়ো নগরে স্ত্রীর কারারক্ষকদের সংখ্যা খুবই কম; তবে নতুন পরিচিতদের একটি ছোটো বৃত্তে অবৈধ সম্পর্কের সুযোগ বেশি নেই। ত্বরিত ও গোপন ব্যভিচার মানবিক ও মুক্ত সম্পর্ক সৃষ্টি করে না; বিয়ের মধ্যে সমস্ত মর্যাদা ধ্বংস করে সমাপ্তি ঘটে এর মিথ্যাচারের।
পার্থক্যটি ঘটে প্রথা ও আজকের সমাজের নির্দেশিত পুরুষ ও নারীর সামগ্রিক কামপরিস্থিতিবশত। নারীর প্রেমকে আজো গণ্য করা হয় পুরুষের প্রতি একটি সেবামূলক কাজ বলে, তাই এটা পুরুষটিকে প্রতিভাত করে নারীটির প্রভু বলে। আমরা দেখেছি, পুরুষ নিম্নস্তরের একটি নারীকে নিতে পারে সব সময়ই, কিন্তু কোনো নারী যদি তার থেকে নিম্ন সামাজিক স্তরের কোনো পুরুষের কাছে দান করে নিজেকে তাহলে তা একটা অধঃপতন, দু-ক্ষেত্রেই তার সম্মতি হচ্ছে আত্মবিলোপ, অধঃপতন। তাদের স্বামীদের অধিকারে আছে অন্য নারীরা, এটা স্ত্রীরা প্রায়ই স্বেচ্ছায় মেনে নেয়; এমনকি তারা অনেক সময় শ্লাঘাও বোধ করতে পারে : কিছু নারী অনেক সময় এতোদূর যায় যে তারা অনুকরণ করে মাদাম দ্য পপাদুরকে এবং কুটনির অভিনয়ও করে। অন্য দিকে, প্রেমিকের আলিঙ্গনে নারীটি রূপান্তরিত হয় একটি বস্তুতে, শিকারে; তার স্বামীর কাছে মনে হয় যেনো তার স্ত্রীর ওপর ভর করেছে একটি বাহ্যিক মানা, সে আর তার নয়, তার কাছে থেকে অপহরণ করে নেয়া হয়েছে স্ত্রীকে। যতো দিন নারী নিজেকে করে রাখবে দাসী এবং প্রতিফলিত করবে সে-পুরুষটিকে, যার কাছে সে ‘দান করেছে নিজেকে’, ততো দিন তাকে মেনে নিতে হবে যে তার ব্যভিচার তার স্বামীর ব্যভিচারগুলোর থেকে অনেক বেশি মারাত্মকভাবে বিপর্যয়কর।
বেশ্যারা ও হেতাইরারা
দ্বিতীয় খণ্ড । ভাগ ৫ –পরিস্থিতি। পরিচ্ছেদ ৪
বিয়ে ও বেশ্যাবৃত্তি, আমরা দেখেছি, সরাসরিভাবে পরস্পরসম্পর্কিত; বলা হয়ে থাকে যে প্রাচীন থেকে আধুনিক কাল পর্যন্ত বেশ্যাবৃত্তি পরিবারপ্রথার ওপর একটি তমিস্র ছায়ার মতো অনুসরণ করছে মানবজাতিকে। পুরুষ, দূরদর্শিতাবশত, তার স্ত্রীকে দীক্ষিত করে সতীত্রতে, কিন্তু সে নিজে সন্তুষ্ট নয় স্ত্রীর ওপর আরোপ করা ব্যবস্থায়। মতেইন একে সমর্থন করে আমাদের বলেছেন :
পারস্যের রাজারা ভোজোৎসবে তাদের স্ত্রীদের আমন্ত্রণ জানাতে অভ্যস্ত ছিলো; তবে মদ যখন তাদের সুচারুরূপে উত্তেজিত করে তুলতে এবং যখন তারা প্ররোচিত হতো কামের লাগাম ঢিলে করে দিতে, তখন স্ত্রীদের তারা পাঠিয়ে দিতো তাদের নিজেদের শয্যাকক্ষে, যাতে তারা অংশ নিতে না পারে তাদের অসংযত কামক্ষুধায়, এবং তাদের বদলে আনার ব্যবস্থা করতো অন্য নারীদের, যাদের প্রতি তারা এমন সম্মান দেখানোর প্রয়োজনবোধ করতো না।
গির্জার পিতাদের মতে, প্রাসাদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার জন্যে পয়ঃপ্রণালি দরকার। এবং প্রায়ই বলা হয় যে নারীদের একাংশকে রক্ষা এবং এর থেকেও নিকৃষ্ট বিপদ প্রতিরোধের জন্যে দরকার আরেক অংশকে বলি দেয়া। দাসপ্রথার পক্ষে মার্কিন দাসপ্রথার সমর্থকদের একটি যুক্তি ছিলো যে দক্ষিণাঞ্চলের শাদারা সবাই যেহেতু মুক্ত ছিলো দাসত্বের দায়িত্বগুলো থেকে, তাই তাদের পক্ষে সম্ভব ছিলো সর্বাধিক গণতান্ত্রিক ও পরিশীলিত সম্পর্কগুলো রক্ষা করা; একইভাবে, একগোত্র ‘নির্লজ্জ নারী’ থাকলে ‘সতীনারীদের’ প্রতি চরম বীরত্বব্যঞ্জক সম্মান দেখানো সম্ভব হয়। বেশ্যা একটি বলির পাঠা; পুরুষ তার দুশ্চরিত্রতার নির্গমন ঘটায় বেশ্যার ওপর, এবং তাকে বর্জন করে। তাকে আইনগতভাবে পুলিশের তত্ত্বাবধানেই রাখা হোক বা সে অবৈধভাবে গোপনেই কাজ করুক, তাকে গণ্য করা হয় ব্রাত্য রূপেই।
