কোনো নারী অন্য নারীদের সাথে যে-বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখে ও নতুন বন্ধুত্ব তৈরি করে, তা খুবই মূল্যবান তার কাছে, কিন্তু সেগুলো পুরুষদের মধ্যে সম্পর্কের থেকে প্রকৃতিতে খুবই ভিন্ন। পুরুষেরা তাদের ব্যক্তিগত আগ্রহ আছে, এমন ভাবনাচিন্তা ও পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে যোগাযোগ করে ব্যক্তি হিশেবে, আর তখন নারীরা বন্দী থাকে তাদের সাধারণ নারীধর্মী ভাগ্যের মধ্যে এবং পরস্পরের সাথে সাবদ্ধ থাকে এক ধরনের অন্তর্নিহিত দুষ্কর্মে সহযোগিতার মধ্যে। এবং তারা তাদের মধ্যে সবার আগে যা খোঁজে, তা হচ্ছে তাদের সবার জন্যে অভিন্ন যে-বিশ্ব, তার দৃঢ়ঘোষণা। তারা। মতামত ও সাধারণ চিন্তাভাবনা সম্বন্ধে আলোচনা করে না, কিন্তু পরস্পরকে বিশ্বাস করে তারা বিনিময় করে গোপন কথা ও কাঙ্খিত ফললাভের প্রণালি; তারা সংঘবদ্ধ হয় এক ধরনের একটি প্রতি-বিশ্ব সৃষ্টির জন্য, যার মূল্যবোধগুলো গুরুত্বে ছাড়িয়ে যাবে পুরুষের মূল্যবোধগুলোকে। দলবদ্ধভাবে তারা শক্তি পায় তাদের শেকল ছুঁড়ে ফেলার; পরস্পরের কাছে নিজেদের কামশীতলতা স্বীকার করে তারা অস্বীকার করে পুরুষের কামাধিপত্যকে, আর ব্যঙ্গ করে পুরুষের কামনাকে বা তাদের আনাড়িত্বকে; এবং শ্লেষের সাথে তারা সন্দেহ প্রকাশ করে তাদের স্বামীদের এবং সাধারণভাবে সমস্ত পুরুষের নৈতিক ও মননগত শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে।
তারা তুলনা করে তাদের অভিজ্ঞতার; গর্ভধারণ, প্রসব, তাদের নিজেদের ও তাদের সন্তানদের অসুখবিসুখ, এবং গৃহস্থালির সেবাযত্ন হয়ে ওঠে মানবোপাখ্যানের অপরিহার্য ঘটনাবলি। তাদের কাজ কোনো কৌশলদক্ষতা নয়; রান্নার প্রণালি ও এধরনের ব্যাপারগুলো একজনের কাছে থেকে আরেকজনে নিয়ে তারা একে ভূষিত করে মৌখিক ঐতিহ্যধারার এক গুপ্ত বিজ্ঞানের মর্যাদায়। কখনোবা তারা নৈতিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে। তারা কী নিয়ে কথা বলে নারীদের সাময়িকীগুলোর চিঠিপত্রের স্তম্ভগুলো তার ভালো উদাহরণ; শুধু পুরুষদের জন্যে আছে একটা ‘নিঃসঙ্গ হৃদয়’ স্তম্ভ, এটা ভাবাই যায় না; পুরুষেরা মিলিত হয় বিশ্বে, যা তাদেরই বিশ্ব, আর সেখানে নারীদের সংজ্ঞায়িত করতে হয়, পরিমাপ করতে হয়, ও পরীক্ষা করে দেখতে হয় তাদের বিশেষ এলাকা; তাদের চিঠিপত্রের বিষয় হচ্ছে রূপচর্চা সম্পর্কে পরামর্শ, রন্ধনপ্রণালি, সূচিকর্মের নির্দেশ; এবং তারা চায় উপদেশ; তাদের অনর্থক বকবকির ও নিজেকে প্রদর্শনের প্রবৃত্তির ভেতর দিয়ে কখনো কখনো প্রকাশ পায় প্রকৃত উদ্বেগ।
তবে অনেক স্ত্রী আছে, যারা অস্তিত্বধারণের অবলম্বন হিশেবে শুধু নৈতিক কর্তৃত্বেই সন্তুষ্ট নয়; তাদের জীবনে আছে প্রেমোন্মাদনার এক গভীর প্রয়োজন। তারা তাদের স্বামীদের যদি ঠকাতেও না চায় আবার ছাড়তেও না চায়, তখন তারা সে একই উপায় অবলম্বন করে, যা অবলম্বন করে রক্তমাংসের পুরুষের ভয়ে ভীত তরুণী : তারা কাল্পনিক সংরাগের কাছে সমর্পণ করে নিজেদের। স্টেকেল এরও দিয়েছেন নানা উদাহরণ। ভালো অবস্থানে আছে, এমন এক সম্রান্ত নারী প্রেমে পড়ে এক অপেরা গায়কের। সে তাকে ফুল ও চিঠি পাঠায়, তার ছবি কেনে, তার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু যখন সে সুযোগ পায় তার সাথে দেখা করার, তখন সে দেখা করতে যায় না; সে তাকে শারীরিকভাবে চায় না, সে চায় স্ত্রী হিশেবে বিশ্বস্ত থেকে শুধু তাকে ভালোবাসতে। আরেক নারী ভালোবাসতো এক বিখ্যাত অভিনেতাকে এবং তার ছবিতে ও পত্রিকায় প্রকাশিত তার সম্পর্কিত বিবরণে সে ভরে ফেলেছিলো তার ঘর। যখন অভিনেতাটি মারা যায়, নারীটি এক বছর ধরে শোক পালন করে।
রুডলফ ভ্যালিন্টিনোর মৃত্যুর সময় কতো অশ্রু ঝরেছে, তা আমাদের বেশ মনে আছে। বিবাহিত নারীরা ও বালিকারা পুজো করে সিনেমার নায়কদের। একলা আনন্দ লাভের বা দাম্পত্য সঙ্গমের উদ্ভট কল্পনার সময় মনে জাগিয়ে রাখা হয় তাদের ছবি। এবং তারা জাগিয়ে তুলতে পারে কোনো শৈশবস্মৃতি, তাতে তারা ভূমিকা পালন করতে পারে পিতামহের, ভাইয়ের, শিক্ষকের, বা এমন অন্য কারো।
এবং এঙ্গেলস্ বলেন :
একপতিপত্নীক বিয়ে স্থায়ী হয়ে যাওয়ার পর, দেখা দেয় দুটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সামাজিক চরিত্র : স্ত্রীর প্রেমিক ও ব্যভিচারী স্ত্রীর স্বামী… একপতিপত্নীক বিয়ে ও বেশ্যাবৃত্তির সাথে, ব্যভিচার হয়ে ওঠে একটি অবধারিত সামাজিক সংস্থা, নিষিদ্ধ, কঠোরভাবে দন্ডিত, কিন্তু দমন অসম্ভব।
যদি দাম্পত্য শৃঙ্গার স্ত্রীটির ইন্দ্রিয় পরিতৃপ্তি না ঘটিয়ে জাগিয়ে তোলে তার ঔৎসুক্য, তাহলে খুবই স্বাভাবিক যে সে তার পাঠ সমাপ্ত করবে অন্য কোনো শয্যায়। যদি তার স্বামী সফল হয় তার কাম জাগিয়ে তুলতে, তাহলে সে অন্য কারো সাথে। সম্ভোগ করতে চাইবে একই সুখ, কেননা স্বামীর জন্যে তার কোনো বিশেষ ধরনের প্রীতি নেই।
এমন হতে পারে যে তরুণী যেমন স্বপ্ন দেখে একটি ত্রাতার, যে এসে তাকে হরণ করে নেবে তার পরিবার থেকে, তেমনি স্ত্রীও প্রতীক্ষা করে সে-প্রেমিকের, যে তাকে উদ্ধার করবে বৈবাহিক জোয়াল থেকে। একটি প্রায়স-ব্যবহৃত বিষয় হচ্ছে যখন উপপত্নী বলতে শুরু করে বিয়ের কথা, তখন শীতল হয়ে ওঠে ও বিদায় নেয় ব্যাকুল প্রেমিক; নারীটি প্রায়ই আহত বোধ করে প্রেমিকের এ-সাবধান আচরণে, এবং তাদের সম্পর্ক বিকৃত হয়ে ওঠে বিক্ষোভে ও শত্রুতায়। যখন কোনো অবৈধ কামসম্পর্ক স্থিতি লাভ করে, তাহলে প্রায়ই পরিশেষে রূপ নেয় একটি পরিচিত, দাম্পত্য চরিত্রে; এতে আবার পাওয়া যাবে বিয়ের সমস্ত পাপগুলো : অবসাদ, ঈর্ষা, হিশেবনিকেশ, প্রতারণা প্রভৃতি। আর নারীটি আবার স্বপ্ন দেখতে থাকবে একটি পুরুষের, যে তাকে উদ্ধার করবে এ-নিত্যনৈমিত্তিক কর্ম থেকে।
